সমর্থকদের দাবি, কফি এনিমা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে, লিভার পরিষ্কার রাখতে, শরীর থেকে টক্সিন বের করতে এবং এমনকি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতেও সাহায্য করে। কেউ কেউ আবার ক্যানসারের চিকিৎসায় এর উপকারিতার কথাও প্রচার করেন। তবে এসব দাবির সঙ্গে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের যথেষ্ট ফারাক রয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কফি এনিমার কার্যকারিতার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ খুবই সীমিত। বরং বিভিন্ন চিকিৎসা প্রতিবেদনে এ পদ্ধতির সঙ্গে পেটব্যথা, মলদ্বারে জ্বালাপোড়া, রক্তপাত, অন্ত্রে প্রদাহ ও সংক্রমণের মতো জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিরল ক্ষেত্রে গুরুতর এমনকি প্রাণঘাতী ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
কফি এনিমা কী?
কফি এনিমা হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে কফি ও পানির মিশ্রণ মলদ্বারের মাধ্যমে বৃহদান্ত্রে প্রবেশ করানো হয়। সাধারণত এটিকে কোলন পরিষ্কার বা শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ বের করার একটি উপায় হিসেবে প্রচার করা হয়।
এই পদ্ধতির সঙ্গে পরবর্তীতে জার্মান-আমেরিকান চিকিৎসক ম্যাক্স গারসনের নাম বিশেষভাবে যুক্ত হয়ে যায়। তার প্রচারিত ‘গারসন থেরাপি’র অংশ হিসেবে কফি এনিমা ব্যবহারের কথা বলা হতো। এই থেরাপিতে উদ্ভিদভিত্তিক খাবার, ফল ও সবজির রস এবং কফি এনিমার মাধ্যমে শরীরকে ‘ডিটক্স’ করার ধারণা দেওয়া হয়েছিল।
তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে কফি এনিমার মাধ্যমে শরীরকে ডিটক্স করা বা রোগ নিরাময়ের দাবির পক্ষে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
কেন জনপ্রিয় হচ্ছে?
কফি এনিমার সমর্থকেরা মনে করেন, এতে শরীরে পিত্তরসের প্রবাহ বাড়তে পারে এবং গ্লুটাথায়ন নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে। গ্লুটাথায়ন শরীরের স্বাভাবিক বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই কফি এনিমাকে অনেক সময় ‘ডিটক্স থেরাপি’ হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু শরীরে গ্লুটাথায়নের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকলেই কফি এনিমা শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেয়, এমনটা প্রমাণিত নয়।
শরীরের বর্জ্য ও বিপাকীয় উপজাত অপসারণে লিভার, কিডনি, ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্র স্বাভাবিকভাবেই কাজ করে। সুস্থ মানুষের শরীরকে কফি এনিমার মাধ্যমে আলাদাভাবে ‘পরিষ্কার’ করার প্রয়োজন রয়েছে, এমন কোনো প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নির্দেশনা নেই।
কোষ্ঠকাঠিন্যে কি উপকার করে?
কফি এনিমার পক্ষে সবচেয়ে প্রচলিত দাবিগুলোর একটি হলো, এটি কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে দ্রুত স্বস্তি দিতে পারে। এনিমার মাধ্যমে বৃহদান্ত্রে তরল প্রবেশ করানো হলে মলত্যাগে সাময়িকভাবে সহায়তা হতে পারে।
তবে সাধারণ এনিমার এই সম্ভাব্য প্রভাবকে কফি এনিমার বিশেষ কোনো চিকিৎসাগত সুবিধা হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বরং কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসায় কফি এনিমা কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রথম সারির পদ্ধতি নয়।
ক্যানসার বা ‘লিভার ডিটক্স’-এর দাবি কতটা সত্য?
কফি এনিমাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে এর ‘ডিটক্স’ এবং ক্যানসার-সংক্রান্ত দাবিকে কেন্দ্র করে।
লিভার পরিষ্কার করা, শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো কিংবা ক্যানসারের চিকিৎসায় সহায়তা করার মতো দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ক্লিনিক্যাল প্রমাণ নেই।
অর্থাৎ, কফি এনিমা ব্যবহার করলেই লিভার ‘পরিষ্কার’ হবে বা শরীরের টক্সিন বেরিয়ে যাবে, এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
ঝুঁকি কতটা?
‘প্রাকৃতিক’ বা ‘বিকল্প’ চিকিৎসা হওয়ায় অনেকেই কফি এনিমাকে নিরাপদ মনে করেন। কিন্তু কোনো পদ্ধতি প্রাকৃতিক হলেই তা ঝুঁকিমুক্ত নয়।
চিকিৎসা প্রতিবেদনে কফি এনিমার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে পেটব্যথা, মলদ্বারে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া, রক্তপাত, অন্ত্রের প্রদাহ এবং কোলাইটিস। অতিরিক্ত বা ভুলভাবে এনিমা ব্যবহারের ফলে শরীরের পানি ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে।
এ ছাড়া দূষিত সরঞ্জাম বা ভুল পদ্ধতিতে ব্যবহারের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। গুরুতর সংক্রমণ বা সেপসিসের মতো জটিলতার ঘটনাও চিকিৎসা সাহিত্যে বর্ণিত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
যাদের আগে থেকেই গুরুতর কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে। তাই এটিকে সাধারণ ঘরোয়া উপায় হিসেবে ব্যবহার করা নিরাপদ মনে করার কারণ নেই।
কোষ্ঠকাঠিন্য হলে কী করবেন?
কোষ্ঠকাঠিন্যের ক্ষেত্রে প্রথমেই এর কারণ বোঝা জরুরি। পর্যাপ্ত পানি পান, খাবারে আঁশ বাড়ানো এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম অনেকের ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাও নেওয়া যায়।
তবে দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকা, মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা, অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া কিংবা হঠাৎ মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কফি এনিমা নয়
কফি এনিমার মাধ্যমে লিভার ডিটক্স, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি বা ক্যানসার চিকিৎসায় কার্যকারিতার দাবিগুলো এখনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিপরীতে, এর সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়ে চিকিৎসা সাহিত্যে একাধিক সতর্কতার তথ্য রয়েছে।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিকল্প চিকিৎসার প্রচারে আকৃষ্ট হয়ে নিজে নিজে কফি এনিমা করা ঠিক নয়। বিশেষ করে কোনো রোগের চিকিৎসা হিসেবে এটি ব্যবহার করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ‘ডিটক্স’ শব্দটির আকর্ষণীয় প্রচারের চেয়ে প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শরীরকে ‘পরিষ্কার’ করার নামে এমন কোনো পদ্ধতি বেছে নেওয়া উচিত নয়, যার উপকারিতা নিশ্চিত নয় কিন্তু ঝুঁকি থাকার প্রমাণ রয়েছে।


