
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত ১১ বছরে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। বছরে গড়ে লাভ সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে সংস্থাটি সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে সোয়া লাখ কোটি টাকার ওপরে। তবে এমন লাভের সুফল পায় না জনগণ।
প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পণ্যের বাজার দামের সঙ্গে দেশে দাম নিয়ন্ত্রণ করে। এই দাম বৃদ্ধির ফর্মুলা এবং বিপিসির আর্থিক হিসাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আপত্তি রয়েছে। তাদের মতে, লাভের অংশ থেকে বিশেষ তহবিল করলেই যুদ্ধ বা মহামারিকালীন বিশেষ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত দাম বৃদ্ধির দিকে যেতে হয় না।
দেশের অর্থনীতি এবং জনজীবনের অন্যতম ‘লাইফ লাইন’ ডিজেল-পেট্রোলের মূল্য বাড়লে পণ্যমূল্য, যাতায়াত, বিদ্যুৎ, কৃষিসহ সবকিছুর উৎপাদন খরচ বা দাম বেড়ে যায়। গত শনিবার রাতেও ১৭ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয় ডিজেল-অকটেনের। এতে এই পেট্রোলিয়াম পণ্যগুলোর দাম দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার সার্বিক বিষয় মাথায় নিয়ে ভেবে এ খাতে বিশেষ করে ডিজেলের দাম সহনীয় মাত্রায় রাখা গেলে জনজীবনে স্বস্তি বিরাজ করত। মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে থাকত।
দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে বিপিসি জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় গত মাসে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ওপরে লোকসান হয়েছে। প্রতি লিটার ডিজেল ১৫৫ টাকায় কিনে ১০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। ১২০ ও ১১৬ টাকার অকটেন ও পেট্রোলে লিটারপ্রতি ২৪ টাকা আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। সব মিলিয়ে মার্চ মাসে লোকসান হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা। চলিত মাসেও সমপরিমাণ লোকসান হয়েছে। দাম বৃদ্ধির পর ডিজেলের দাম হয়েছে ১২০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকা। এই বৃদ্ধির কারণে চলতি মাসে সংস্থাটির বাড়তি আয় হবে ৭৮০ কোটি টাকা। এর পরও লোকসান হবে বলে জানিয়েছেন বিপিসির কর্মকর্তারা। এ ছাড়া প্রতি লিটার তেলে ১১-১২ টাকা শুল্ক ও কর দিতে হয়।
সূত্রমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। এ ছাড়া সংস্থাটি ডিজেল, পেট্রোল ছাড়া অন্য সব পণ্যই লাভে বিক্রি করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত লাভ করেছে চার হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ট্যাক্স-ভ্যাট, লভ্যাংশ ১০ হাজার কোটি টাকার ওপরে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে।
এ ছাড়া একটি বড় অংশ বিভিন্ন ব্যাংকে জমা রেখে সুদের মুনাফা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বোনাস হিসেবে ভাগ করে নিয়েছে। তিন বিতরণ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার বছরের মোট লাভের দুই-তৃতীয়াংশই সুদ থেকে আয় করে। এসব কোম্পানির কর্মীরা বছরে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত লাভের বোনাস নেওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এ ছাড়া শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বহুতল ভবন বানানো হচ্ছে। এসব অযাচিত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলেই অস্থিতিশীল সময়ে দাম না বাড়িয়েও বা সহনীয় পর্যায়ে বৃদ্ধি করে প্রতিষ্ঠান চলতে পারত বলে মনে করেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র আরও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম পড়তির দিকে। তাই এখন দাম না বাড়ালেও চলত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দিন আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৮৮ ডলার। মার্চে দাম হ্রাস-বৃদ্ধির মধ্যে ছিল। এপ্রিলের প্রথম ১৭ দিন দাম ২০৭ ডলারে ছিল। শনিবার দাম কিছুটা কমে ১৬৪ ডলারে নেমেছে।
কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম সমকালকে বলেন, প্রথমত বিপিসির আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার মানসম্মত নিরীক্ষার প্রস্তাব দিলেও তা করা হয়নি। একদিকে লোকসান দেখায়, অন্যদিকে কর্মীরা লাখ লাখ টাকা বোনাস নেয়। ভোক্তাদের চাপে দুটি পণ্য এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের অধীনে আনলেও এখন ডিজেল, অকটেনের মূল্য নির্ধারণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বিপিসি। যার লাভ-ক্ষতির প্রকৃত চিত্র তারা প্রকাশ করে না। ফলে এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তিনি বলেন, দাম বাড়িয়ে ডিজেলে হয়তো ৭০০-৮০০ কোটি টাকা বেশি আয় করবে। কিন্তু এর প্রভাবে পরিবহন ভাড়া, পণ্যমূল্যসহ জীবনযাত্রার যে ব্যয় বাড়বে, তা কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
তবে গত রোববার সচিবালয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হলেও এটি বর্তমানে বিশ্ববাজার থেকে কেনা মূল্যের চেয়ে অনেক কম। আমরা একটা যুদ্ধকালীন অবস্থার মধ্যে আছি। সারাবিশ্ব তাদের জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে। এমনকি আমেরিকাও পাঁচ ডলার বাড়িয়ে দিয়েছে।
বছরে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। এর মধ্যে বিপিসি আমদানি করে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন। এর বাইরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেদের প্রয়োজনে ফার্নেস অয়েল আমদানি করে। সম্প্রতি বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানি, পরিশোধন ও বিক্রির অনুমতি দিয়েছে সরকার। বিপিসি অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানি করে ১৫ লাখ টন। বাকিটুকু পরিশোধিত জ্বালানি তেল।
সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ডিজেল, যা মোট সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। তবে লাভ বেশি আসে অকটেন, পেট্রোল আর জেড ফুয়েল বিক্রি করে। জিটুজি পদ্ধতি আর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানির কাছ থেকে চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি তেল কেনে বিপিসি।
২০২২-২৩ অর্থবছরে জ্বালানি তেলের ৫৮ শতাংশ পরিবহনে, ১৮ শতাংশ বিদ্যুতে, ১৫ শতাংশ কৃষিতে, ৬ শতাংশ শিল্পে, ১ শতাংশ গৃহস্থালিতে এবং অন্য খাতে ২ শতাংশ ব্যবহার করা হয়।
বিপিসির বিপুল মুনাফা
বিপিসির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, টানা ছয় বছর লোকসানের পর ২০১৪-১৫ সালে মুনাফা করে। গত এক বছরে বিপিসি ৫১ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তেল বিক্রি করে চার হাজার ২১২ কোটি টাকা লাভ হয় সংস্থাটির। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সাত হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চার হাজার ৫৫১ কোটি টাকা লাভ করে বিপিসি। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মুনাফা করে ছয় হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সংস্থাটির লাভ কমে তিন হাজার ৮৪৬ কোটি টাকায় নেমে আসে। করোনা মহামারির সময় বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমা শুরু করে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিপিসির লাভ হয় পাঁচ হাজার ৬৫ কোটি টাকা।
মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ কমায় ২০২০-২১ অর্থবছরে সংস্থাটির মুনাফা আসে ৯ হাজার ৯২ কোটি টাকা। মহামারির পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার চড়তে থাকে। এতে ২০২১-২২ অর্থবছরে দুই হাজার ৭০৫ কোটি টাকা লোকসান করে সংস্থাটি। লোকসানের কথা বলে ২০২২ সালের আগস্টে দেশে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড প্রায় ৪৭ শতাংশ বাড়ানো হয়। তবে ওই অর্থবছরে (২০২২-২৩) চার হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা মুনাফা করেছে বিপিসি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লাভের পরিমাণ তিন হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। সর্বশেষ অর্থবছরে লাভ হয়েছে চার হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
২০২২ সালের জুনে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম পৌঁছায় ১২২ দশমিক ৭১ মার্কিন ডলারে। এরপর তেলের দাম কমতে শুরু করে। তবে লোকসানের কথা বলে সে বছরের আগস্টে দেশের বাজারে তেলের দাম রেকর্ড ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়। সমালোচনার মুখে আগস্টেই তেলের দাম নামমাত্র (লিটারে পাঁচ টাকা) কমানো হয়।
লাভের টাকা নিচ্ছে সরকারও
ভ্যাট, ট্যাক্স, লভ্যাংশ, উদ্বৃত্ত মিলিয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা সরকারি তহবিলে জমা দিয়েছে বিপিসি। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিপিসি লোকসান করলেও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দিয়েছে ১৫ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৪ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৯ হাজার ৫৯০ কোটি, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯ হাজার ৯৭ কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছয় হাজার ২১৯ কোটি টাকা এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে পাঁচ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। গত দুই অর্থবছরে (২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫) রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার প্রকৃত হিসাব পাওয়া যায়নি। সূত্রমতে, দুই অর্থবছরে এর পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকার ওপরে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, যেহেতু জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির একটি স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা রয়েছে। তাই বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে দেশে দাম বাড়তেই পারে। কিন্তু এই ফর্মুলাতেই ত্রুটি রয়েছে। ভ্যাট-ট্যাক্স ও লাভ ধরে এই সূত্র ঠিক করা হয়েছে। ফলে যে দামই ধরা হোক না কেন, তাতে বিপিসির লাভ থাকেই। এ ছাড়া অনেক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি বছরে গড়ে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লাভ করছে। এই উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে আপৎকালীন তহবিল করে তা থেকে অস্থিতিশীল সময়ে দামে ভর্তুকির সুযোগ রাখলে জনগণের ওপর বাড়তি চাপ পড়ত না। তা না করে এই লাভের অর্থ অন্য খাতে হস্তান্তর করা হয়, যা অনৈতিক।

