ই-টিন (e-TIN) নিবন্ধন থাকলেই আয়কর রিটার্ন জমা না দেয়ার কারণে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন ‘তথ্যে’ বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে সবার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই অঙ্কের জরিমানা প্রযোজ্য নয়। করদাতার পূর্ববর্তী আয় নিরূপণ, প্রযোজ্য আইনগত বিধান ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারিত হয়। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন আয়কর কাঠামোয় করমুক্ত আয়ের সীমা ও করের বিভিন্ন স্ল্যাবেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তাই কারা রিটার্ন জমা দিতে বাধ্য, রিটার্ন না দিলে কত টাকা জরিমানা হতে পারে এবং নতুন কর কাঠামোয় করমুক্ত আয়ের সীমা নিয়ে বিস্তারিত জানা জরুরি।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন। তবে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত রয়েছে।
যেসব করদাতার ক্ষেত্রে পূর্বে কখনও আয় নিরূপণ বা অ্যাসেসমেন্ট হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা ৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ, এই জরিমানা সবার ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরোপ করা হয় না।
আর যেসব করদাতার আয় ইতোপূর্বে নিরূপণ হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা- এই দুইয়ের মধ্যে যেটি বেশি, সেই অনুযায়ী জরিমানা নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া ন্যূনতম জরিমানা ১ হাজার টাকা। রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানার বিধানও রয়েছে।
কারা আয়কর রিটার্ন জমা দিতে বাধ্য?
শুধু ই-টিন আছে বা আয় করমুক্ত সীমার নিচে- এমন কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শ্রেণির করদাতাদের রিটার্ন জমা দেয়া বাধ্যতামূলক।
তাদের মধ্যে রয়েছেন-
১. যাদের বার্ষিক মোট আয় সরকারের নির্ধারিত করমুক্ত সীমার বেশি।
২. ফার্মের অংশীদার এবং কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী।
৩. সরকারি চাকরিজীবীসহ আইন দ্বারা নির্দিষ্ট বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির ব্যক্তি।
৪. ব্যাংক ঋণ বা ক্রেডিট কার্ড নেয়া, জমি বা সম্পত্তি নিবন্ধন এবং নির্দিষ্ট কিছু সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যাদের আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বা স্লিপ দাখিল করতে হয়।
ই-টিন আছে, কিন্তু আয় নেই বা রিটার্ন জমা দেননি- করণীয় কী?
বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে বা ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনেকে অতীতে ই-টিন নিয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বর্তমানে আয়হীন অথবা তাদের আয় করযোগ্য সীমা অতিক্রম করে না। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
শুধু আয় কমে যাওয়া বা বর্তমানে কর দিতে না হওয়া মানেই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রযোজ্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে টিআইএন বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর অফিসে আবেদন করা যেতে পারে। তবে আবেদন অনুমোদনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের ওপর নির্ভরশীল।
নিজের নামে কোনও বকেয়া রিটার্ন বা নোটিশ রয়েছে কি না, তা জানতে এনবিআরের অফিশিয়াল ই-রিটার্ন পোর্টাল etaxnbr.gov.bd-এ লগইন করে স্ট্যাটাস যাচাই করা যেতে পারে।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যে আতঙ্কিত না হয়ে নিজের কর পরিস্থিতি ও আইনগত বাধ্যবাধকতা যাচাই করা জরুরি। প্রয়োজনে সময়মতো রিটার্ন দাখিল করতে হবে অথবা সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
নতুন আয়কর স্ল্যাব ও করমুক্ত আয়ের সীমা: কার কত কর দিতে হবে?
আয়কর রিটার্ন দাখিলের জরিমানার পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন আয়কর কাঠামো নিয়েও করদাতাদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোয় সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি করের বিভিন্ন স্ল্যাবেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে নির্ধারিত অর্থবছর থেকে করদাতাদের করের হিসাবেও পরিবর্তন আসবে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, বিভিন্ন শ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা এবং সাধারণ করদাতাদের জন্য প্রযোজ্য করের হার নিচে তুলে ধরা হলো।
নতুন করমুক্ত আয়ের সীমা কত?
নতুন আয়কর কাঠামো অনুযায়ী, বিভিন্ন শ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা নিম্নরূপ-
সাধারণ করদাতা (পুরুষ): আগের ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা।
নারী ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণ নাগরিক: আগের ৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা: করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাইযোদ্ধা: করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
সাধারণ করদাতাদের জন্য নতুন কর স্ল্যাব ও হার
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, সাধারণ পুরুষ করদাতাদের আয়ের ওপর ধাপে ধাপে যে হারে কর দিতে হবে, তা হলো-
১. প্রথম ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত: ০ শতাংশ বা সম্পূর্ণ করমুক্ত।
২. পরবর্তী ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত: ১০ শতাংশ।
৩. এর পরবর্তী ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত: ১৫ শতাংশ।
৪. এর পরবর্তী ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত: ২০ শতাংশ।
৫. এর পরবর্তী ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত: ২৫ শতাংশ।
৬. অবশিষ্ট আয়ের ওপর: ৩০ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় কী পরিবর্তন এসেছে?
২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সে সময় প্রথম ১ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হতো। তবে নতুন কাঠামোয় করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে এবং ৫ শতাংশের কর স্ল্যাবটি পুরোপুরি তুলে দেয়া হয়েছে।
এর ফলে সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়বে। পাশাপাশি প্রাথমিক কর স্ল্যাবে পরিবর্তনের কারণে করদাতাদের করের বোঝা কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
করদাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
ই-টিন থাকা, আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকা এবং আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা- এই তিনটি বিষয় এক নয়। একইভাবে রিটার্ন জমা না দিলেই প্রত্যেককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে, এমন ধারণাও সঠিক নয়। জরিমানার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও করদাতার পরিস্থিতি বিবেচ্য।
অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন কর কাঠামো অনুযায়ী করমুক্ত আয়ের সীমা ও করের হার সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা প্রয়োজন। তাই নিজের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা, বকেয়া অবস্থা এবং প্রযোজ্য করের হার যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়াই করদাতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



