
নিজস্ব প্রতিবেদক:সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাঁশদহা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের আইচপাড়া গ্রামে মসজিদসংলগ্ন জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি), আদালতে মামলা, হামলা, ভাঙচুর ও হুমকির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিসের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। উভয় পক্ষই প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ সমাধান দাবি করেছে।
গত ২ আগস্ট সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন আইচপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আল ইকরামুল হাসান। তিনি অভিযোগ করেন, তার বাবা শফিকুল ইসলামের সঙ্গে একই গ্রামের আবুল খায়ের, মো. পল্টুসহ কয়েকজনের দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। এ ঘটনায় গত ২৭ জুন সাতক্ষীরা সদর থানায় জিডি (নং-১৮২৪) করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও দাবি করেন, গত ১৩ জুলাই শফিকুল ইসলামের ওপর হামলা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে সাতক্ষীরা অতিরিক্ত সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা (নং-৮৮৫/২০২৬) দায়ের করা হয়। আদালতের নির্দেশে মামলাটি সদর থানায় ৪৮/৩৩১ নম্বরে নথিভুক্ত হয়। তার দাবি, মামলার কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পরিবারটিকে হুমকি দিচ্ছেন, মসজিদের প্রাচীর ভেঙে তাদের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং মসজিদের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে। এসব বিষয়ে প্রশাসনের তদন্ত দাবি করেন তিনি।
এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকালে আইচপাড়া গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে শফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তার ওপর হামলা হয়েছে। তার ভাষ্য, হামলায় তিনি আহত হন এবং মাথায় সেলাই দিতে হয়। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিপক্ষ তার প্রায় ৩০ হাজার টাকার মাছ নষ্ট করেছে, ৫০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের বাঁশ কেটে নিয়ে গেছে এবং কলাগাছসহ প্রায় ৪০টি গাছ কেটে ফেলেছে।
শফিকুল ইসলাম বলেন, স্থানীয়ভাবে একাধিকবার মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। তিনি দাবি করেন, “আমার ভাগ্নিরা কাগজপত্র দেখে মীমাংসার উদ্যোগ নিয়েছিল। আমি বলেছি, প্রশাসন, গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সালিসের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত হবে, আমি তা মেনে নেব। আমি কোনো সংঘাত চাই না।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আবুল খায়ের, পল্টু ও মোহাম্মদ লিপুসহ কয়েকজন তাকে ও তার পরিবারকে হুমকি দিচ্ছেন। বাজারে যাওয়া বা নিজ জমিতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে দাবি করেন। আদালতের পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারেরও দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে সরেজমিনে কথা হয় শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজের ইসলাম ও ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ লিপুর সঙ্গে। তিনি শফিকুল ইসলামের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শফিকুল ইসলামের বাবা হজরত সরদার জীবদ্দশায় ৮ শতক জমি মসজিদের জন্য দান করেন। পরে তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী আরও সাড়ে ৩ শতক জমি মসজিদের নামে দান করেন। এসব জমির রেজিস্ট্রি, নামজারি, খাজনা পরিশোধ ও অন্যান্য কাগজপত্র মসজিদ কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মোহাম্মদ লিপুর ভাষ্য, জমি নিয়ে একাধিকবার সালিস বৈঠক হয়েছে। সেখানে শফিকুল ইসলামকে তার দাবির পক্ষে কাগজপত্র দেখাতে বলা হলেও তিনি তা উপস্থাপন করতে পারেননি। পরে স্থানীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মসজিদের সীমানা নির্ধারণ করে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। তিনি দাবি করেন, তাদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো ভিত্তিহীন। একই সঙ্গে সম্প্রতি মসজিদের প্রাচীর ভাঙচুরের ঘটনায়ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।
সরেজমিনে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, বিরোধটি দীর্ঘদিনের। একাধিকবার সালিসের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। তাদের মতে, আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের উদ্যোগে জমির সব কাগজপত্র যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হলে এলাকায় শান্তি ফিরতে পারে।
এ বিষয়ে উভয় পক্ষই প্রশাসনের হস্তক্ষেপে জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।

