আজ সোমবার, জুলাই ২০, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের একদিনের মাথায় বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে মারা গেছেন প্রধান আসামি আসাদুজ্জামান আসাদ (৩০)। আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার আগেই হাজতখানার বাথরুমে লুঙ্গির ফাঁসে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের দাবি, পুরো ঘটনাই সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে। হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তার গলায় ফাঁসের দাগ ছাড়া শরীরের অন্য কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন পাননি এবং তাকে হাসপাতালে আনার আগেই মৃত্যু হয়েছে বলে ঘোষণা করেন।

নিহত আসাদ (৩০) বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার জোড়গাছা মধ্য উত্তরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা জোড়গাছা মধ্যপাড়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আরবি বিষয়ের প্রভাষক মাওলানা মতিউর রহমান। তার মা-ও একই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন।

গত ২৯ জুন সারিয়াকান্দিতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক আব্দুল মান্নান মোল্লাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার প্রধান আসামি ছিলেন তিনি। আজ রোববার তাকে আদালতে হাজির করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করার কথা ছিল।

পুলিশ জানায়, গতকাল শনিবার দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে আসাদকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। পরে ডিবি কার্যালয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। একই সঙ্গে নওগাঁ জেলার নাইম ও সুমন নামে আরও দুই সহযোগীর নাম প্রকাশ করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেন, চালককে শ্বাসরোধ করে হত্যার সময় তিনি ভুক্তভোগীর মাথা শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছিলেন। এরপর তারা একসঙ্গে ঘটনাস্থলেই ইয়াবা সেবনের পর ছিনিয়ে নেওয়া সিএনজিটি বিক্রির উদ্দেশ্যে একটি গোপন জায়গায় লুকিয়ে ফেলেন।

তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল শনিবারই ডিবির একটি চৌকস দল তাকে সঙ্গে নিয়ে নওগাঁ জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালায়। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অন্য দুই আসামি পালিয়ে যাওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। অভিযান শেষে রাতে তাকে আবার ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। রাতের খাবার খেয়ে তিনি হাজতখানায় ঘুমিয়ে পড়েন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আজ রোববার সকাল ১০টার দিকে আসাদ হাজতখানার বাথরুমে প্রবেশ করেন। সেখানে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তিনি আর বাইরে বের হচ্ছেন না। এতে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের মনে সন্দেহ জাগলে তারা বাথরুমে প্রবেশ করে দেখেন, নিজের পরনের লুঙ্গি ছিঁড়ে ভেন্টিলেটরের মোটা লোহার রডের সঙ্গে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে আছেন তিনি। পুলিশ সদস্যরা দ্রুত তাকে নামিয়ে উদ্ধার করেন এবং সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল বলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের নথিভুক্ত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে রোগীকে জরুরি বিভাগে আনা হলে তার শরীরে জীবনের কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি। নাড়ির স্পন্দন বা রক্তচাপ রেকর্ড করা সম্ভব হয়নি, শ্বাস-প্রশ্বাস সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল এবং শরীরের স্বাভাবিক রিফ্লেক্স অনুপস্থিত ছিল। দুই চোখের মণি স্থির ও প্রসারিত অবস্থায় ছিল, যেখানে আলো ফেললেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকের নোটে আরও উল্লেখ করা হয়, গলার চারপাশে শ্বাসরোধজনিত স্পষ্ট দাগ ছিল। তবে শরীরের অন্য কোথাও দৃশ্যমান আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ইসিজি পরীক্ষায় হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ (ফ্ল্যাট লাইন) দেখা গেলে সকাল ১০টা ৫৮ মিনিটে তাকে ‘ব্রট ডেড’ (আনার আগেই মৃত্যু) ঘোষণা করা হয়।

মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রাশেদুল ইসলাম রনি বলেন, হাসপাতালে আনার পর রোগীর গলায় একটি স্পষ্ট ফাঁসের দাগ পাওয়া গেছে। তবে শরীরের অন্য কোথাও কোনো ধরনের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান বলেন, আসাদ বাথরুমে প্রবেশ করে নিজের লুঙ্গি দিয়ে ভেন্টিলেটরের রডে ফাঁস লাগান। সিসিটিভিতে পুরো বিষয়টি পুলিশ পর্যবেক্ষণ করেছে।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ইনচার্জ ইকবাল বাহার বলেন, হাজতখানার সিসিটিভি ফুটেজ সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে। পরে ময়নাতদন্তের আইনি প্রক্রিয়ার জন্য মরদেহ শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে অটোরিকশা চালক হত্যা মামলার বাকি দুই আসামিকে গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশ সূত্রে আরও জানা যায়, গত ২৯ জুন বগুড়ার বৌবাজার এলাকা থেকে তিন ব্যক্তি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে সারিয়াকান্দিতে যান। পরে একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে চালক আব্দুল মান্নান মোল্লাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে অটোরিকশাটি ছিনতাই করা হয়। পরদিন সকালে উপজেলার কৈ-খালি বিলসংলগ্ন দড়িপাড়া এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় গত ১ জুলাই সারিয়াকান্দি থানায় দণ্ডবিধির ৩৯৪, ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

Exit mobile version