
স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার।দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতাদের মধ্যে পরিচিত মুখ বিভিন্ন কারণে। বিশেষ করে প্রায় সময়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টক শোতে থাকেন তিনি, কলাম লিখেন জাতীয় দৈনিকে। ২০১১ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে লড়লেও ভোটের মাত্র ৭ ঘণ্টা আগে গোসল ছাড়াই কোরবানী দেওয়া হয় তাঁকে। ১৯৫৩ সালের ১৯ অক্টোবর শাহআলম খন্দকার ও রোকেয়া খন্দকারের পরিবারে জন্ম নেন তৈমূর। ইতোমধ্যে বাবা ও মা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ভাই বোনদের মধ্যে তৈমূর আলম খন্দকার সবার বড় ছেলে। তৈমূরের বাবা শাহআলম খন্দকার ছিলেন বিলুপ্ত গ্রীন্ডলেজ ব্যাংক এর বাংলাদেশ ও নারায়ণগঞ্জ শাখার ম্যানেজার। ইস্ট পাকিস্তান গ্রীন্ডলেজ ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন। শাহআলমের বাবা তোরাব আলী খন্দকার ছিলেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার রূপসী এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তির একজন। নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ফাস্ট ক্লাস পান তৈমূর। ৬৯ সালে তোলারাম কলেজে ডিগ্রীতে ভর্তি হয়ে এ কলেজে পড়াশোনা কালে সংগঠক হিসেবে নিজেকে জাহির করেন। মাসদাইরে প্রভাতী কল্যাণ সংস্থা, মুসলিম একাডেমী করার পাশাপাশি দিনমজুরদের বিভিন্ন সংগঠনও শুরু করেন। ঠেলাগাড়ি, ভ্যান গাড়ী, রিকশা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে কাজ শুরু করেন তৈমূর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পরীক্ষা পিছিয়ে যায়। ৭৪ সালে ডিগ্রী পরীক্ষায় সেকেন্ড ক্লাস পান তৈমূর। পরে তৈমূর ভর্তি হন নারায়ণগঞ্জ ল কলেজে। এ কলেজ থেকে ৭৬ সালে ল পাশ করে ৭৮ সালে নারায়ণগঞ্জ আইনজীবি সমিতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৮২ সালে ঢাকার মগবাজার এলাকার হালিমা ফারজানার সঙ্গে বিয়ে হয় তৈমূর আলম খন্দকারের। ৮৪ সালে তৈমূর চলে যান ইংল্যান্ডে। সেখানে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়াশোনা করে ৩পার্টের মধ্যে পার্ট ১ ও ২ শেষ করেন। ৮৫ সালে দাদা তোরাব আলী মাস্টার মারা গেলে তৈমূর দেশে ফিরে আসলে আর বিলেতে যাওয়া হয়নি। তৈমূর আলম খন্দকারের ২ মেয়ে। বড় মেয়ে ব্যারিস্টার মার ই য়াম খন্দকার বিবাহিত। তিনি এখন বাবা তৈমূর আলম খন্দকারের সঙ্গেই কাজ করেন। ১৯৯৬ সালে তৈমূর নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান হওয়ার ইচ্ছা পোষন করলেও শামীম ওসমানের কারনে তা হয়ে ওঠেনি। পরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। ওই সময়ে শহরের চাষাঢ়ায় অবস্থিত শহীদ জিয়া হল মিলনায়তনের নাম পরিবর্তন করে মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তন করে আওয়ামী লীগ, যার তীব্র বিরোধীতা করেন তৈমূর। একই সময়ে সাবেক এমপি আবুল কালাম নিস্ক্রিয় হলে তৈমূরকে সে সময়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সভাপতি পদ দেওয়া হয়। শহরের শায়েস্তা খান সড়কে তৈমুরের চেম্বার থাকলেও শামীম ওসমানের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে এক পর্যায়ে ১৯৯৭ সালে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে ঢাকায় থেকে হাইকোর্টে আইন পেশা চালিয়ে যান তিনি। ওই সময়ে একটি রাজনৈতিক মামলায় হাইকোর্ট থেকে গ্রেপ্তার হয়ে রাজনীতিতে আলোচনায় ওঠে আসেন। ১৯৯৯ সালে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির একটি মিছিলে গুলি করে আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী। ওই মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন তিনি। ঢাকায় অবস্থান করাকালীন ২০০১ সালের ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলা ঘটনায় তৈমূর আলমকে আসামী করা হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি-জামাত জোট সরকার তৈমূর আলম খন্দকারকে বিআরটিসির চেয়ারম্যান বানায়। এর আগে তিনি ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল। ২০০৩ সালে তৈমূরকে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের পর বিএনপির বর্তমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হলে প্রথমবারের মত তার আইনজীবি হিসেবে আইনী লড়াই চালিয়ে যান তৈমূর। পরে ওই বছরের ১৮ এপ্রিল যৌথবাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে ৮টি মামলা করে যার মধ্যে একটি মামলায় ১২ বছরের জেল হয়। ২০০৯ সালের মে মাসে মুক্তি পান তৈমূর। ওই বছরের জুন মাসে তৈমূরকে আহবায়ক করে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়। বছরের শেষের দিকে ২৫ নভেম্বর সম্মেলনের মাধ্যমে তৈমূর হন জেলা বিএনপির সভাপতি। একই সঙ্গে তাকে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ আইন বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা ১৮দলীয় ঐক্য জোটের আহবায়ক করা হয়। এছাড়াও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আইনি লড়াই সহ ২০২০ সালে হাইকোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে আইনজীবীদের নিয়ে বিক্ষোভও করেন তৈমূর আলম খন্দকার। ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হয়েছিলেন তৈমূর। বিএনপি প্রথম দিকে তাকে সমর্থন দিলেও ভোটের মাত্র ৭ ঘণ্টা আগে দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে তিনি নির্বাচন থেকে সরে আসেন। এদিকে প্রধান বিচারপতির অনুমোদনক্রমে গত ৬ মে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের সভাপতিত্বে আপীল বিভাগের বিচারপতি মোঃ আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মোঃ রেজাউল হক, বিচারপতি এস, এম, এমদাদুল হক, বিচারপতি এ, কে, এম, আসাদুজ্জামান এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের সমন্বয়ে এনরোলমেন্ট কমিটি পূণর্গঠন করা হয়।বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, আপীল বিভাগের সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্তি (এনরোলমেন্ট) সংক্রান্ত কমিটিতে যুক্ত হয়েছেন অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার। এর মধ্যে দিয়ে তার নামের পাশে এখন থেকে ডাবল স্টার যুক্ত থাকবে। এনরোলমেন্ট কমিটির গত ১১ নভেম্বরের সভায় প্রত্যেক সদস্যের স্বতন্ত্র মতামতের ভিত্তিতে নিম্ন তালিকাভুক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীগণকে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, আপীল বিভাগের সিনিয়র এডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯ সদস্যের কমিটিতে ৪ নম্বরে ড. তৈমুর আলম খন্দকারকে রাখা হয়েছে। এদিকে বিএনপির রাজনীতিতে ফেরা প্রসঙ্গে আক্ষেপের সুরে তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া নেতাদের বলেছিলেন, আমার তৈমুর কোথায়? তোমরা তাকে কেন বহিষ্কার করলা? তার কি দলে অবদান নেই? দলের চেয়ারপার্সনের এমন বক্তব্যের পরে তো আমি বহিষ্কার থাকার কথা না। আমি বিএনপি ও জনগণের সাথে ছিলাম, এখনও আছি।

