আজ বুধবার, অক্টোবর ৭, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

‘আমার ছেলের করা ভুলের জন্য আমি ক্ষমা চাই। দয়া করে তাকে ক্ষমা করে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন’, অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে ছেলের প্রাণভিক্ষা চাইছিলেন রসমানিক্কাম যোগালক্ষ্মী। কারণ তার ২৪ বছর বয়সী ছেলে আনোজন শিবরাসা, সৌদি আরবে, মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি। ইসলাম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে দেশটির একটি আপিল আদালত।

ঘটনার শুরু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে করা একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। এরপরই তার বিরুদ্ধে মামলা করে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

শ্রীলঙ্কায় একটি হিন্দু তীর্থযাত্রাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের জের ধরে আনোজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

জুনের শেষ দিকে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে থাকা একটি কুকুরকে এক তরুণ মুসলিম ব্যক্তি লাথি মারছেন, এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে অনলাইনে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ধর্মীয় বিতর্ক শুরু হয়।

এরই মধ্যে এক ব্যক্তি হিন্দু ধর্মের একটি দেবতাকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। এর জবাবে, আনোজন, তামিল ভাষায়, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননা করে একটি মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরে আনোজন দ্রুত সেই মন্তব্য মুছে ফেলেন এবং একটি ভিডিও প্রকাশ করে ক্ষমা চান। কিন্তু তার করা মন্তব্যের স্ক্রিনশট নিয়ে তা তার কর্মস্থল ও সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। এরপর জুলাই মাসে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

পরে সৌদি কর্মকর্তারা তার ব্যক্তিগত ডিভাইস জব্দ করেন এবং তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোও মুছে দেন।

আনোজনের ভাই হামসিদান শিবরাসা বিবিসি সিংহালাকে বলেন, ‘সৌদি আরবের মানুষ এ বিষয়ে কিছুই জানত না। শ্রীলঙ্কার কিছু মানুষই আমার ভাই যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতো, সেখানে ই-মেইল পাঠিয়েছিল। কারা এটি করেছে, তাদের নামও আমি বলতে চাই না।’

হামসিদানের ভাষ্য, আনোজন যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, তারা বিষয়টি সৌদি কর্তৃপক্ষকে জানালে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

ঘটনাটি শ্রীলঙ্কাজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটির বিভিন্ন স্থানে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আনোজনকে ক্ষমা করার দাবিতে আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে একাধিক রাজনৈতিক দল ও সরকারি সংস্থা তার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে।

তবে, গত ২৮ সেপ্টেম্বরের পর থেকে আনোজনের শারীরিক অবস্থা কিংবা বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিবারের কাছে আর কোনো তথ্য নেই। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলার কারণে পরিবারকে এ বিষয়ে আর কোনো বক্তব্য না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শ্রীলঙ্কা সরকার।

সৌদি কর্তৃপক্ষ আনোজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো সময়সূচি প্রকাশ করেনি। ফলে কখন তার সাজা কার্যকর হতে পারে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়। সৌদি আরবে আগে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে পরিবার বা সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে আগাম ‘না’ জানিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে এবং পরে স্বজনদের বিষয়টি জানানো হয়েছে।

প্রথমে, সৌদি আরবের আল-আহসা ফৌজদারি আদালত, আনোজনকে, ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ৩ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল জরিমানা করে।

সাজা কমানোর আবেদন করে আনোজনের পক্ষে আপিল করা হলেও তা খারিজ হয়ে যায় বলে জানান শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ।

এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর, মামলা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যায়। সৌদি প্রসিকিউটররা, আনোজনের বিরুদ্ধে দেশটির সাইবার অপরাধ আইনের পরিবর্তে, শরিয়াহ আইনে, মামলা পরিচালনার আবেদন করেন। আপিল আদালত, সেই আবেদন মঞ্জুর করে। এর ফলে আনোজনের সাজা পাঁচ বছরের কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ডে উন্নীত হয়।

ক্ষমার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা

শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আনোজনকে সহায়তা করতে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর, প্রেসিডেন্ট আনুরা কুমারা দিসানায়েকের সঙ্গে প্রেসিডেন্সিয়াল সেক্রেটারিয়েটে দেখা করেন আনোজনের পরিবারের সদস্যরা। প্রেসিডেন্ট তাদের আশ্বস্ত করেন, আনোজনের জন্য সাধারণ ক্ষমা আদায়ে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে, সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহারের নির্দেশ দেন তিনি।

আনোজনের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন ধর্মের নেতারাও একজোট হয়েছেন। রামান্না নিকায় ও অমরাপুরা মহা নিকায়ের জ্যেষ্ঠ বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এবং হিন্দু ধর্মীয় নেতারা প্রেসিডেন্সিয়াল সেক্রেটারিয়েটে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। এতে দ্রুত রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়।

এছাড়া আনোজনের স্থানীয় আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করতে চলতি সপ্তাহে সৌদি আরব যাচ্ছেন শ্রীলঙ্কার চার সদস্যের একটি আইনজীবী দল।

দলের অন্যতম সদস্য প্রেসিডেন্টস কাউন্সেল উপুল কুমারাপ্পেরুমা বিবিসি সিংহালাকে বলেন, ‘সৌদি আরবে আনোজনের মামলা দু’টি আইন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। আমরা সেখানে গিয়ে ওই দুই প্রতিষ্ঠানের আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করবো এবং মামলাটি নিয়ে আলোচনা করবো এবং পরবর্তী সময়ে কী করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাবো।’

পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

এদিকে দেশে থাকা পরিবারের সঙ্গে আনোজনের যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ২৮ সেপ্টেম্বর হামসিদান বলেন, ‘আমার ভাই দুই দিন ধরে ফোন করেনি। আমরা দূতাবাসকে বিষয়টি জানিয়েছি এবং কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে আমাদের জানাতে বলেছি। তারা বলেছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। কিন্তু এখনো কোনো উত্তর পাইনি, আমরা অপেক্ষা করছি।’

সৌদি আরবের কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের সাধারণত ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। কারাগার কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমেই তাদের ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নিয়ে মৃত্যুদণ্ডের নজির

সৌদি আরবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যের কারণে কঠোর সাজা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে, সৌদি আরবের অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ আল-গামদিকে একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা মন্তব্যের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

সেসময় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি পরিচালক ফিলিপ লুথার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের মত প্রকাশের অভিযোগ ছাড়া আর কোনো অপরাধে অভিযুক্ত ‘না’ হওয়া এবং দুইটি বেনামি টুইটার অ্যাকাউন্টে মোট মাত্র ১০ জন অনুসারী থাকা আল-গামদিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া অযৌক্তিক।

পরে আল-গামদির মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় বলে জানায় সৌদি আরবে মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করা স্বাধীন বেসরকারি সংস্থা আলকিউএসটি।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বলছে, সৌদি আরবে ১ কোটিরও বেশি বিদেশি শ্রমিক রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ভাষাগত বাধা এবং পর্যাপ্ত আইনি সহায়তার অভাবের কারণে দেশটির আইনি ব্যবস্থায় কম মজুরির অভিবাসী শ্রমিকরা আলাদা ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকেন।

সৌদি আরবে আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দেওয়া সাজা তুলনামূলকভাবে বিরল। মাদকসংক্রান্ত অপরাধ বা হত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা এর তুলনায় বেশি।

Exit mobile version