জুলাই জাতীয় সনদে গৃহীত সাংবিধানিক সংস্কার এবং গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ১১ দলীয় ঐক্য।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ অবস্থান জানান ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শীর্ষনেতা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংস্কার এবং গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের পক্ষে ১১ দলীয় ঐক্য। তবে গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার বাস্তবায়নের বিকল্প হিসেবে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ তারা গ্রহণ করবেন না।
তিনি বলেন, একই তফসিলে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও কাঠামো নিয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছিল। তার দাবি, জনগণ শুধু সংস্কারের বিষয়বস্তুর প্রতি সম্মতি দেয়নি; বরং তা বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠানকেও অনুমোদন দিয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের এই নেতা বলেন, জনগণের ভোটে দেওয়া সাংবিধানিক ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে কোনো বিকল্প প্রক্রিয়াকে জনগণের রায়ের সমতুল্য বিবেচনা করা যায় না। জনগণের ভোট কোনো রাজনৈতিক দলের সুবিধা-অসুবিধা কিংবা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সংখ্যালঘিষ্ঠতার ভিত্তিতে গ্রহণ বা বর্জনের বিষয় নয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতীয় সংসদ একটি সংবিধানসৃষ্ট প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে জনগণের প্রত্যক্ষ অনুমোদনের ভিত্তিতে নির্ধারিত সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ার ক্ষমতার উৎস জনগণের সরাসরি ভোট। তাই সংসদ সদস্য হিসেবে পাওয়া ক্ষমতা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে গণভোটের মাধ্যমে অর্পিত ক্ষমতা এক নয়।
তিনি বলেন, একই ব্যক্তি সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হতে পারেন। তবে দুই প্রতিষ্ঠানের আইনগত পরিচয়, ক্ষমতার উৎস ও দায়িত্ব ভিন্ন। সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিনিধি সংসদের অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ করেন; আর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার ভিত্তিতে নির্ধারিত সংস্কার ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেন।
সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংসদের সংশোধনী ক্ষমতা সীমাহীন নয় বলেও দাবি করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংরক্ষণের নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষমতা তৈরি হয় না।
তার ভাষ্য, প্রশ্ন শুধু সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে কি না, তা নয়; বরং যে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেই ক্ষমতার উৎস কী এবং জনগণ কোন প্রক্রিয়ায় সেই ম্যান্ডেট দিয়েছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ও ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, একই ব্যক্তির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিকেন্দ্রীকরণের মতো বিষয় রয়েছে বলে জানান তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, এসব সংস্কারের অনেকগুলো রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সাধারণ সংসদীয় সংশোধনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন করা হলে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে ছয়টি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো-
১. গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা।
২. জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত এবং গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা।
৩. গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ প্রত্যাহার করা।
৪. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় শপথ নিয়ে পরিষদকে কার্যকর করা।
৫. জনগণের সম্মতি ও গণভোটের ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশ্লিষ্ট পরিবর্তনের উদ্যোগ থেকে বিরত থাকা।
৬. জনগণের প্রত্যাশা, গণভোটের রায় ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের আইনগত ভিত্তি নিয়েও বক্তব্য দেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে ‘আইন’-এর সংজ্ঞার উল্লেখ করে দাবি করেন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, প্রজ্ঞাপনসহ অন্যান্য আইনগত দলিল, যেগুলোর বাংলাদেশের আইনে কার্যকারিতা রয়েছে, সেগুলোও আইনের আওতাভুক্ত।
তার দাবি, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর দেওয়া রাষ্ট্রপতির আদেশকে আইনগত ভিত্তিহীন বলা হলেও সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের সংজ্ঞা অনুযায়ী ওই আদেশের আইনগত কার্যকারিতা রয়েছে। এটিকেই তিনি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আইনি ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ এখনো কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে। সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ দেওয়া, পরিষদের অধিবেশন ডাকা এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী প্রক্রিয়াটি কার্যকর করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ থেকে সরকার ও সরকারি দল ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে সাম্প্রতিক লংমার্চে গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার। দীর্ঘ লংমার্চের কারণে কারও ভোগান্তি হয়ে থাকলে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।
শেষে জনগণের রায়কে সম্মান করা, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার মর্যাদা রক্ষা এবং জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ম্যান্ডেট অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।



