
দেশের অন্যতম শিল্প-বাণিজ্য কেন্দ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ জেলা নারায়ণগঞ্জে আইন-শৃঙ্খলার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মুন্সির বদলি আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে সরব হয়ে উঠেছে সর্বস্তরের মানুষ। ব্যবসায়ী, শিক্ষক, আইনজীবী,সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি,সুশীল ও সচেতন সমাজ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, স্বল্প সময়ে দৃশ্যমান সাফল্য আসা এই কর্মকর্তাকে এখনই সরিয়ে দিলে হাতে নেওয়া উদ্যোগগুলো মুখ থুবড়ে পড়বে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক গেজেটে এসপি মিজানুর রহমান মুন্সির বদলির তথ্য প্রকাশের পর থেকেই দিনে দিনে জেলাজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বদলি আদেশ শোনার পর থেকেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একযোগে দাবি জানান, জনস্বার্থে তাকে নারায়ণগঞ্জেই বহাল রাখা হোক।
নারায়ণগঞ্জ জেলার আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকির দায়িত্বে পেয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয় ও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। জেলাবাসী তার কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন, আইন-শৃঙ্খলার অগ্রগতি অক্ষুণ্ন রাখতে বর্তমান পুলিশ সুপারকে আরও দীর্ঘ সময় দায়িত্বে রাখার ব্যবস্থা করতে।
স্থানীয় নেতারা জানান, মাত্র কয়েক মাস আগে দায়িত্ব নেওয়া আগের পুলিশ সুপারকে তিন মাসের মাথায় বদলি করা হয়েছিল। এরপর দায়িত্ব নেন মো. মিজানুর রহমান মুন্সি। বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাকে সরিয়ে দেওয়ার আদেশ আসায় জেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে তাদের অভিমত।
একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, নারায়ণগঞ্জের মতো জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার জেলাকে বুঝতে একজন নতুন কর্মকর্তার তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। এর মধ্যে বদলি হলে কোনো পরিকল্পনাই পূর্ণতা পায় না। স্থিতিশীলতা ছাড়া অপরাধ দমন সম্ভব নয়।
জেলাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, এসপি মিজানুর রহমান মুন্সির নেতৃত্বে গত কয়েক মাসে নারায়ণগঞ্জের নিরাপত্তা চিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে সর্বক্ষেত্রে।
বিট পুলিশিং জোরদারে প্রতিটি ইউনিয়নে নিয়মিত যোগাযোগ ও নজরদারি রাখছেন।
চিরুনি অভিযান চলমান রেখে জেলার প্রবেশপথ, বাসস্ট্যান্ড, নদীবন্দর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চিহ্নিত মাদক স্পটগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রেখেছেন।
কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী অভিযানে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রেখে গত ছয় মাসে মাদক ও কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট গ্রেপ্তার বৃদ্ধি পেয়েছে।
সচেতনতা কার্যক্রমে ব্যাপক প্রশংসা করিয়েছেন বর্তমান পুলিশ সুপার। স্কুল-কলেজে মতবিনিময়, ঝুঁকিপূর্ণ তরুণদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তকরণ করে।
রাত-দিন টহল বৃদ্ধি, সিসিটিভি সম্প্রসারণ ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট
নাগরিকদের দাবি, এসব কারণে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্য সহিংসতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। সন্ধ্যার পর নারী ও শিক্ষার্থীদের চলাচলেও স্বস্তি ফিরেছে। যানজট নিরসনেও সমন্বিত উদ্যোগের প্রশংসা করছেন শহরবাসী।
একজন প্রবীণ শিক্ষক বলেন, এত অল্প সময়ে তাকে সরিয়ে দিলে স্কুল-কলেজকেন্দ্রিক সচেতনতা ও যুবসমাজকে ইতিবাচক ধারায় ফেরানোর কাজগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। নারায়ণগঞ্জকে শান্তিপূর্ণ মডেল জেলা হিসেবে গড়তে তাকে আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন।
জেলার ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের যাতায়াতের কারণে নারায়ণগঞ্জের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ঘন ঘন বদলির কারণে নীতি ও পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা জানান, শিল্প-বাণিজ্য নির্ভর এই জেলায় আইন-শৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা ছাড়া বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। তারা মনে করেন, একজন দায়িত্ববান কর্মকর্তার নেতৃত্বে সমন্বিত উদ্যোগ সফল হলে তা সারাদেশের জন্য রোলমডেল হতে পারে।
জেলার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, পঞ্চায়েত কমিটি ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, নারায়ণগঞ্জের সার্বিক শান্তি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কোটি মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এসপি মো. মিজানুর রহমান মুন্সির বদলি আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক।
তারা আরও বলেন, কোনো পুলিশ সুপারকে অন্তত দুই বছর মেয়াদ দিলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব। তা না হলে উন্নয়নের বদলে বাধা তৈরি হবে।
জেলাবাসীর প্রত্যাশা, জনকল্যাণের স্বার্থে সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং হাতে নেওয়া কর্মসূচিগুলো পূর্ণ বাস্তবায়নের সুযোগ দিয়ে নারায়ণগঞ্জকে দেশের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তার উদাহরণ হিসেবে গড়ে তোলার পথ সুগম করবেন।

