রাজধানীর আমিনবাজারে চীনা বিনিয়োগে বর্জ্য থেকে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের আগস্টে এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। তবে প্রকল্পের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সরকার কিনবে ২৫ টাকায়। চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের প্রকল্পে সরকার তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ কিনছে।
দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নতুন নয়। এক দশকের বেশি সময় ধরে নেওয়া এ ধরনের প্রকল্পের কোনোটিই উৎপাদনে যেতে পারেনি। এমন বাস্তবতায় গত জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইলের প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।
দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় সাধারণত ১২-১৪ টাকা এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুতের গড় ব্যয় ২২-২৪ টাকার মতো। আন্তর্জাতিকভাবে বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম প্রকল্পভেদে ভিন্ন হলেও ভারতের সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রকল্পে তা ইউনিটপ্রতি ৬-৮ রুপির মধ্যে; বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮-১১ টাকা। চীনে প্রতি ইউনিট বর্জ্য বিদ্যুৎ সরকার কেনে (বেঞ্চমার্ক ট্যারিফ) শূন্য দশমিক ৬৫ ইউয়ানে, যা ১১-১২ টাকা।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ট্যারিফ দিয়ে বর্জ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা বাদ পড়ে যায়। এখানে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মূল বিষয়। বিদ্যুৎ বাইপ্রডাক্ট। তাই দামটা বেশি মনে হলেও পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তুলনা করলে তা সহনীয়।
আমিনবাজারে বড় বিনিয়োগ
আমিনবাজার প্রকল্পে চীনের সিএমইসি গ্রুপ বিনিয়োগ করবে। প্রতিদিন তিন হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। ২৫ বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকাঠামো রেখে ২০২৮ সালের আগস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আগের হিসাব অনুযায়ী ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। সরকারের সরাসরি বিনিয়োগ না থাকলেও উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনতে হবে দীর্ঘ মেয়াদে।
কেন্দ্রটি নির্মাণে আওয়ামী লীগ সরকার দরপত্র আহ্বান করে। তাতে ১৭টি কোম্পানি অংশ নেয়, কাজ পায় চীনা কোম্পানি সিএমইসি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে চুক্তি হয়েছিল। বিদ্যুৎ আসার কথা ছিল ২০২৫ সালে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছিল ২১ সেন্ট, যা তখনকার মুদ্রার দামে ২১.২৯৫ টাকা পড়ে। এখন তা ২৫ টাকা ।
বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য সিএমইসি বাংলাদেশের জয়েন্ট স্টকে একটি কোম্পানি নিবন্ধনও করেছে, এর নাম ডব্লিউটিই পাওয়ার প্লান্ট নর্থ ঢাকা প্রাইভেট লিমিটেড।
এ প্রকল্পের বিরোধিতা করছে বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিডব্লিউজিইডি), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিসহ কয়েকটি সংগঠন। তাদের অভিযোগ, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে এবং বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক বেশি।
সংগঠনগুলোর মতে, কেন্দ্রটি ৮৫ শতাংশ সক্ষমতায় চললে ইউনিটপ্রতি দাম পড়বে ২৬ টাকা ৭৯ পয়সা। সক্ষমতা ৪০ শতাংশে নেমে এলে তা ৪৭ টাকা এবং ২০ শতাংশে নামলে ৭৫ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কম সক্ষমতায় চললে বছরে প্রায় ৫৮ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলার বা ৭০০ কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জের ঝুঁকিও রয়েছে।
এ ছাড়া ডিএনসিসিকে প্রতিদিন ৩ হাজার টন বর্জ্য সরবরাহের শর্ত দেওয়া হয়েছে। ঘাটতি হলে প্রতি টন বর্জ্যের জন্য ৫০ ডলার জরিমানার বিধান রয়েছে। পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, এতে বর্জ্য কমানোর বদলে নির্দিষ্ট পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদনের চাপ তৈরি হতে পারে।
পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, বর্জ্য পোড়ানোর কারণে ডাইঅক্সিন, ফিউরান, ভারী ধাতু ও সূক্ষ্ম কণার মতো দূষিত পদার্থ তৈরি হতে পারে। তাদের হিসাবে, আমিনবাজার প্রকল্প পূর্ণ সক্ষমতায় চললে বছরে প্রায় ৪ লাখ ১১ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হতে পারে। তাদের প্রস্তাব, মিশ্র বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বদলে বর্জ্য আলাদা করে পুনর্ব্যবহার, কম্পোস্টিং ও বায়োগ্যাস উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আব্দুল মঈন খানের সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সাক্ষাতের পর প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর বেইজিংয়ে চূড়ান্ত ত্রিপক্ষীয় ও অর্থায়ন চুক্তি হওয়ার কথা। তিনি স্বীকার করেন, ইউনিটপ্রতি ২৫ টাকা দাম বেশি; তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত সুবিধা বিবেচনায় প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ল্যান্ডফিল ব্যবহারের জন্য সিটি করপোরেশনকে ভাড়া দেবে এবং সরকারের সরাসরি বিনিয়োগ লাগবে না।
মাতুয়াইলে উৎপাদন হতে পারে ৪০-৫০ মেগাওয়াট
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাতুয়াইলেও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ চলছে। চীনের পাওয়ার চায়না এ প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে এখানে ৪০-৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বিঅ্যান্ডএফ গ্রুপ মাতুয়াইলে বর্জ্য থেকে মিথেন গ্যাস উৎপাদনের প্রকল্পে কাজ করছে।
চুক্তি করেও আটকে নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের জালকুড়িতে ৬ মেগাওয়াটের বর্জ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পে পিডিবি, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও চীনের ইউঅ্যান্ডডি এনভায়রনমেন্টাল টেকনোলজির মধ্যে চুক্তি হয় ২০২২ সালের ১ সেপ্টেম্বর।
প্রতিদিন ৬০০ টন বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা। সরকার ইউনিটপ্রতি প্রায় ২০ টাকা ৯১ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেছে। ৪৫৫ দিনের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার কথা থাকলেও এখনও কাজ শুরু হয়নি। জালকুড়ির নির্ধারিত স্থান এখনও মূলত ময়লার ভাগাড় হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থায়ন ও বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে ধীরগতিকে প্রকল্প আটকে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রতি ইউনিটে খরচ ২১ টাকা
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরেও ১১ মেগাওয়াটের বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রকল্পের দরপ্রস্তাব ও ট্যারিফ অনুমোদন করে।
২৫ বছর মেয়াদে ইউনিটপ্রতি ২১ টাকা ১১ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। মোট প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি এখনও পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাব্য সময় ধরা হয়েছে ২০২৭ সালের ১২ জুন।
চট্টগ্রামে একাধিক প্রস্তাব, বাস্তবায়ন নেই
চট্টগ্রামে গত এক দশকে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একাধিক প্রস্তাব এসেছে। এর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। সর্বশেষ জাপানের জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিদিন ১ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করে ১২-১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখিয়েছে।
জমির সংকট, অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা এবং পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার অভাবকে প্রকল্প বাস্তবায়নের বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খুলনায় ছোট প্রকল্প
খুলনার শলুয়ায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে বর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। প্রায় ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে প্রতিদিন ৩৭৫ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে ১৫ টন জৈব সার, ৩০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ এবং প্রায় ৫ হাজার লিটার ডিজেল উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি, অগ্রগতিও ধীর।
অন্যান্য দেশের তুলনায় কতটা বেশি
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভারতের কয়েকটি সাম্প্রতিক প্রকল্পে ইউনিটপ্রতি প্রায় ৬ দশমিক ২ থেকে ৭ দশমিক ৯৫ রুপি ট্যারিফ দেখা যায়। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা প্রায় ৮-১১ টাকা। চীনের বেঞ্চমার্ক ট্যারিফ ০.৬৫ ইউয়ান বা প্রায় ১১-১২ টাকা। শ্রীলঙ্কায় নতুন কাঠামোয় পৌর বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুতের সর্বোচ্চ হার প্রায় ৪১ দশমিক ৭২ রুপি, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৪ টাকা।



