
মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও সামাজিক সচেতনতা তৈরি না হলে শুধু, চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ সমাজ গড়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
তিনি বলেন, একজন মানুষ যখন শুধু নিজের কষ্ট নয়, অন্যের ব্যথাও অনুভব করতে শেখে, তখনই সে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে। অপরাধ, মাদকাসক্তি ও রোগব্যাধি কমাতে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র সব পর্যায়ে দায়িত্বশীলতার বিকল্প নেই।
মঙ্গলবার বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে ‘হেপাটাইটিস: আসুন, বাধা ভেঙে এগিয়ে যাই’ প্রতিপাদ্যে চট্টগ্রামের লালখান বাজারে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ, আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। লিভার কেয়ার সোসাইটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এর আগে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
জেলা প্রশাসক বলেন, সুস্থ সমাজ গঠনের শুরু হতে হবে পরিবার থেকে। একজন মাকে গর্ভধারণের সময় থেকেই সচেতন হতে হবে। পরিবার ও সমাজের অবহেলার কারণেই অনেক তরুণ মাদকাসক্ত হচ্ছে। এই অবক্ষয় শুধু অপরাধ বাড়াচ্ছে না, জটিল রোগের বিস্তারেও ভূমিকা রাখছে।
“মানুষ যখন নিজের ব্যথা বোঝে, তখন সে জীবিত। আর যখন অন্যের ব্যথা বোঝে, তখন সে প্রকৃত মানুষ,” বলেন জাহিদুল ইসলাম। তিনি আরও বলেন, পৃথিবীতে মানুষের প্রয়োজন মেটানোর মতো সম্পদ আছে, কিন্তু লোভ মেটানোর মতো সম্পদ নেই। তাই সংযম ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার কোনো বিকল্প নেই।
উচ্চশিক্ষার প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আমাদের বড় বড় ডিগ্রি আছে। কিন্তু সেই শিক্ষা যদি সমাজে প্রভাব না ফেলে, অপরাধ ও রোগ না কমায়, তাহলে সেই ডিগ্রির মূল্য কোথায়? ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাফল্য তখনই অর্থবহ, যখন তার ইতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ে।
স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে ডিসি জানান, প্রতিদিন লিভার ও কিডনি রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষ সহায়তার জন্য তার কাছে আসেন। আবেদনকারীদের বড় অংশই কিডনি রোগী। তাই খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত শনিবার চট্টগ্রামে ৬ হাজার ২০০ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অংশগ্রহণে বিভিন্ন দপ্তর থেকে ১৩৫ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই বর্জ্য জমেছিল। শুধু বাইরের পরিবেশ নয়, মানুষের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আমরা প্রায়ই অন্যের ভুল নিয়ে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালন করছি কি না তা নিয়ে ভাবি না। বাইরে আলোকিত করলেই হবে না, ভেতরটাও আলোকিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান ও লিভার কেয়ার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ। তিনি জানান, দেশে আনুমানিক ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। প্রতি বছর ২০ হাজারের বেশি মানুষ এই রোগে মারা যান। আক্রান্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই নিজের রোগ সম্পর্কে জানেন না। অথচ লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের কারণ হেপাটাইটিস বি।
আলোচনা শেষে চিকিৎসকেরা রোগীদের প্রশ্নের উত্তর দেন এবং হেপাটাইটিস শনাক্তে পরীক্ষা ও সময়মতো চিকিৎসার পরামর্শ দেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন। সঞ্চালনা করেন লিভার কেয়ার সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. তারেক শামস। এতে চিকিৎসক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও লিভার রোগীরা উপস্থিত ছিলেন।
লিভার কেয়ার সোসাইটির কার্যক্রমের প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক বলেন, হেপাটাইটিস ও লিভার রোগ নিয়ে জনসচেতনতায় প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কাজ সম্প্রসারণে সহযোগিতা করা হবে।

