গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় একটি বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের অপরিকল্পিত কারখানা নির্মাণের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শেষ পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত স্মারকলিপি দিয়ে এই সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
দুই বছর ধরে চলা দুর্ভোগের অবসান চাই
গত সোমবার (১৭ আগস্ট) রাজবাড়ী ইউনিয়নের মালিপাড়া গ্রামের (৩ নং ওয়ার্ড, পোস্ট: ভাওয়াল রাজাবাড়ী) ভুক্তভোগী বাসিন্দারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। আবেদন দেন— মোছাঃ সেলিনা আক্তার, বাসন্তী রবি দাস, মোঃ রমিজ উদ্দিন মোল্লা, হিরা লাল রবি দাস ও মিন্টু রবি দাসসহ এলাকার প্রান্তিক জনপদের অসংখ্য নারী-পুরুষ।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই জলাবদ্ধতায় তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দুই বছর আগে এলাকার উর্বর ধানখেত ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সেই থেকেই প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়, যা এখন এলাকার জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
সামান্য বৃষ্টিতেই ভেসে যায় ঘর-বাড়ি**
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এখন সামান্য বৃষ্টি হলেই কারখানা সংলগ্ন নর্দমা ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। বৃষ্টির পানি নিচু এলাকার বাড়িঘর, উঠান, এমনকি টয়লেট পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যায়। দুই বছর ধরে জমে থাকা এই পানিতে আশেপাশের গাছপালা মরে যাচ্ছে, বাড়ির দেয়াল ফেটে যাচ্ছে এবং ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও জানান, বিশেষ করে মালিপাড়ার সংখ্যালঘু মুচি সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁদের ছোট ছোট ঘরবাড়ি প্রতিনিয়ত পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, যা তাঁদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। শিশু-বৃদ্ধসহ সবার চলাফেরা বন্ধ হয়ে গেছে, বাড়িতে রোগব্যাধি বেড়েছে।
-কারখানা কর্তৃপক্ষের প্রতি তীব্র ক্ষোভ**
এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, তাঁরা বারবার কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কোনো রকম সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে বিষয়টি উপেক্ষা করে আসছিল। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়া কোনো পথ না পেয়ে তাঁরা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে এই স্মারকলিপি পেশ করেন।
আবেদনে তাঁরা স্পষ্টভাবে দাবি জানান, তাৎক্ষণিকভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ নিতে হবে, অবৈধভাবে ফেলা মাটি অপসারণ করতে হবে এবং স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান যাতে ভবিষ্যতে কোনও জনবসতিপূর্ণ বা কৃষি এলাকায় গড়ে না উঠতে পারে, সে জন্য নিয়মকানুন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবিও তোলা হয়।
উপজেলা প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি।
বিষয়টি নিয়ে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, তারা আবেদনপত্রটি গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য জরুরি ভিত্তিতে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রশাসন বলেছে, এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কাজ করা হবে।
এদিকে কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেন ফারুক জানান। যেহেতু ভুক্তভোগী পরিবার জেলা প্রশাসকের বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করা হবে এতে আমার কিছু বলার নেই
তবে ভুক্তভোগী বাসিন্দারা মনে করেন, প্রশাসন যদি কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নেয়, তাহলে এই জলাবদ্ধতা কেবল আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তাঁরা এখন অপেক্ষায় আছেন উপজেলা প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
শিল্পায়ন যেমন দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করে, তেমনি তা হতে হবে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব। জনস্বার্থ ও জনজীবনকে অবহেলা করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ কখনোই কাম্য নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর ভোগান্তি লাঘবের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে পরিবেশ আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি।



