তেল, চিনি ও রডসহ কোটি টাকার পণ্য নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে ট্রাক। কিছু সময় পরই চালক ও সহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। পরদিন দূরের কোনো নির্জন স্থান থেকে মিলছে খালি গাড়ি—কিন্তু থাকছে না মূল্যবান পণ্যের কোনো হদিস। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ আশপাশের বিভিন্ন সড়কে এমন ঘটনা নিয়মিত হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পরিবহন মালিকদের।
পণ্যবাহী গাড়িতে সংঘবদ্ধ ডাকাতি ও লুট বন্ধ, প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদারের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে মানববন্ধন করেছেন ট্রান্সপোর্ট মালিক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা।
বুধবার (১৫ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পরিবহন প্রতিষ্ঠানের মালিক, প্রতিনিধি, চালক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা অংশ নেন।
ডাকাতি বাড়ছে, ক্ষতির বোঝা মালিক-ব্যবসায়ীর
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, সম্প্রতি মহাসড়কে পণ্যবাহী যানবাহন লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, চিনি, রড ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্যবাহী ট্রাকগুলো ডাকাত চক্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এসব ঘটনায় একদিকে পরিবহন মালিকেরা গাড়ি ও ব্যবসা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার পণ্য হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশের পণ্য পরিবহন খাত মারাত্মক সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
‘ডাকাতির মামলা না নিয়ে চালক-হেলপারকে আসামি করা হচ্ছে’
মেসার্স নাটোর পরিবহন সংস্থার মালিক মো. মোস্তফা বলেন, পণ্যবাহী ট্রাক ডাকাতির শিকার হওয়ার পর থানায় অভিযোগ করতে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাটি ডাকাতি হিসেবে নথিভুক্ত করা হচ্ছে না। উল্টো চালক ও সহকারীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৭ ধারায় বিশ্বাসভঙ্গ ও আত্মসাতের অভিযোগে মামলা নেওয়া হচ্ছে।
তার ভাষ্য, এতে প্রকৃত ডাকাত চক্র আড়ালে থেকে যাচ্ছে। অপরদিকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই চালক ও সহকারীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে পণ্য হারানো ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার—কোনোটিই পাচ্ছেন না।
২৭ লাখ টাকার তেল উধাও, মিলেছে শুধু খালি ট্রাক
নিজেদের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মো. মোস্তফা জানান, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে নাটোরে নেওয়ার জন্য তাদের একটি ট্রাকে ৭৫ ড্রাম সুপার ওয়েল তেল তোলা হয়েছিল। তেলগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৭ লাখ টাকা।
ট্রাকটি গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর একপর্যায়ে চালক ও সহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরদিন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রজেক্ট এলাকা থেকে ট্রাকটি খালি অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তবে ট্রাকে থাকা তেলের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তিনি দাবি করেন, এ ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন থানায় অভিযোগ দেওয়া হলেও প্রকৃত ঘটনা অনুযায়ী ডাকাতির মামলা গ্রহণ করা হয়নি। বরং দণ্ডবিধির ৪০৭ ধারায় বিশ্বাসভঙ্গ ও আত্মসাতের অভিযোগ হিসেবে ঘটনাটি রেকর্ড করা হয়েছে।
বিস্তৃত সড়কজুড়ে একই চক্রের তৎপরতা
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেই নয়—সাভার, গাজীপুর, কোনাবাড়ী, চান্দুরা, গাউছিয়া, মিরের বাজার, পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়ক এবং এশিয়ান হাইওয়ের বিভিন্ন অংশেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে।
তাদের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভুয়া পরিচয় দিয়ে তেলবাহী ও মূল্যবান পণ্যবাহী ট্রাক থামায়। পরে চালক ও সহকারীকে জিম্মি করে পণ্য লুট করে গাড়ি অন্য স্থানে ফেলে রেখে যায়।
এ চক্রের তৎপরতায় তেল পরিবহন ব্যবসা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক পরিবহন মালিক মূল্যবান পণ্য বহনে অনীহা প্রকাশ করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি
পরিবহন মালিকেরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। একই সঙ্গে ভুয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ব্যবহারকারী সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
তাদের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে—তেলবাহী ট্রাক ডাকাতির ঘটনায় প্রকৃত ঘটনার ভিত্তিতে ডাকাতির মামলা রেকর্ড করতে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া, মহাসড়কে নিয়মিত পুলিশি টহল বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং পণ্যবাহী গাড়ির নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
মানববন্ধনে যেসব প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়
মানববন্ধনে বি ট্রান্সপোর্ট, নিউ এ আর ট্রান্সপোর্ট, মেসার্স আরবী ট্রান্সপোর্ট, নিউ এ এম ট্রান্সপোর্ট, মেসার্স গাউসিয়া ট্রান্সপোর্ট, সারা ট্রান্সপোর্ট, মেসার্স নিউ বগুড়া ট্রান্সপোর্ট, মেসার্স অপু ট্রান্সপোর্ট, মেসার্স ঈশাখা ট্রান্সপোর্ট, দরবার ট্রান্সপোর্ট, খাজা গরীবে নেওয়াজ ট্রান্সপোর্ট, এসপি ট্রান্সপোর্ট ও মেঘনা ট্রান্সপোর্টের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সততা পরিবহন সংস্থা, সুমন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, নাটোর পরিবহন সংস্থা, নিউ আর আর পরিবহন সংস্থা, মেসার্স জাহান ট্রান্সপোর্ট, মেসার্স যমুনা ট্রান্সপোর্ট, মেসার্স জেএস ট্রান্সপোর্ট, স্বর্ণা ট্রান্সপোর্ট এবং নিউ আন্তঃজিলা ট্রান্সপোর্টসহ বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠানের ভুক্তভোগী মালিক ও প্রতিনিধিরা কর্মসূচিতে অংশ নেন।


