নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে মাদকের ভয়াল বিস্তার রোধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ১০০ পুরিয়া হেরোইন ও ২০০ গ্রাম গাঁজাসহ ৫ জন চিহ্নিত মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ।
মাদকের বিরুদ্ধে এই সফল অভিযানে এলাকাবাসী সন্তোষ প্রকাশ করলেও তাদের দাবি, শুধু মাঠপর্যায়ের কারবারিদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না, বরং এই ভয়ংকর মাদক সিন্ডিকেটের নেপথ্যের গডফাদার, অর্থদাতা, শেল্টারদাতা এবং মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকারী মূল হোতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী-এর দিকনির্দেশনা এবং সিদ্ধিরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ এমদাদুল হক-এর নেতৃত্বে মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযানের অংশ হিসেবে গত ১৪ জুন দিবাগত রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী বিহারী কলোনী ৩ নম্বর বালুর মাঠ তিন রাস্তার মোড়ে অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারি মিজানুর রহমান মিজান (২৬)-কে আটক করা হয়।
পরবর্তীতে রাত ১টা ২০ মিনিটে পশ্চিম কলাবাগ সাইলো রোড এলাকায় আরমানের কবুতর পালার ঘরে অভিযান চালিয়ে আরমান (৩০) ও বিল্লাল হোসেন (৩৫)-কে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১০০ পুরিয়া হেরোইন উদ্ধার করা হয়।
এরপর ১৫ জুন সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে মিজমিজি পাগলাবাড়ী এলাকায় পৃথক অভিযান পরিচালনা করে আব্বাছ (৪২) ও গুজা শাহ আলম (৪৪)-কে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেহ তল্লাশি করে ২০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক মামলা দায়ের করে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
তদন্তে আরও জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে শাহ আলমের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ৪টি মাদক মামলা, আরমানের বিরুদ্ধে ৩টি মাদক মামলা এবং বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে ৩টি মাদক মামলা রয়েছে।
একাধিক মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও তারা কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিল, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, সিদ্ধিরগঞ্জসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
এর পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট, যারা দীর্ঘদিন ধরে মাদক সরবরাহ, বিপণন এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তারা দাবি করেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা কেবল মাঠপর্যায়ের কারবারি; প্রকৃত গডফাদার, শেল্টারদাতা এবং নিয়ন্ত্রকদের চিহ্নিত না করা গেলে মাদক নির্মূল করা সম্ভব হবে না।
এলাকাবাসীর জোর দাবি, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ, নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ, র্যাব-১১ এবং জেলা প্রশাসন যেন এই গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের মাদক সরবরাহকারী, অর্থদাতা, সহযোগী এবং নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় উদঘাটন করে।
পাশাপাশি তাদের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন এবং যোগাযোগের নেটওয়ার্ক তদন্তের মাধ্যমে পুরো মাদক চক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সচেতন নাগরিকরা আরও বলেন, যদি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী নেতা, ক্ষমতাবান মহল বা অন্য কোনো ব্যক্তি এই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থেকে থাকেন কিংবা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন, তাহলে দল-মত নির্বিশেষে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মাদকের মতো ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাব, পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাব যেন বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়। তাই মাদক কারবারিদের পাশাপাশি তাদের নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষক, অর্থদাতা ও নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অব্যাহত রাখা সময়ের দাবি।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ জানিয়েছে, মাদকসহ যেকোনো ধরনের অপরাধ দমনে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তবে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সাম্প্রতিক এই অভিযানের ধারাবাহিকতায় মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতা, গডফাদার ও শেল্টারদাতাদেরও দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে, যাতে সিদ্ধিরগঞ্জসহ পুরো নারায়ণগঞ্জকে মাদকমুক্ত করা সম্ভব হয়।
কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতার সম্পৃক্ততার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। তাই এ বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।


