গুমের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত সন্ধান, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং দায়ীদের বিচারের দাবিতে সাতক্ষীরায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (২৩ মে) সকাল সাড়ে ১০টায় সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সামনে আন্তর্জাতিক গুম সপ্তাহ উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর উদ্যোগে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এতে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
মানববন্ধনে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে নিখোঁজ থাকা জনির পরিবারের হৃদয়বিদারক বক্তব্যে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। জনির পিতা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে, কিন্তু আজও জানি না সে কোথায়। বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে— সেটাও জানি না। অন্তত তার কবরটা দেখে মরতে পারতাম…” তার এই আর্তনাদে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
বক্তারা বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে গুমের ঘটনা ঘটলেও অনেক পরিবার এখনো তাদের প্রিয়জনের কোনো সন্ধান পায়নি। তারা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে গুমের প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
গুমের শিকার জনির এক দশকের নিখোঁজ জীবনের প্রসঙ্গ তুলে বক্তারা বলেন, জীবিত বা মৃত— কোনো অবস্থাতেই তার সন্ধান না মেলায় পরিবারটি চরম মানসিক যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার সঙ্গে তৎকালীন ওসি এমদাদসহ কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলেও দীর্ঘ সময়েও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতিতে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর সাতক্ষীরা জেলা সমন্বয়ক সাংবাদিক মুজাহিদুল ইসলাম এবং সঞ্চালনা করেন মানবাধিকার কর্মী সাংবাদিক ফিরোজ হোসেন। এতে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক কামরুল ইসলাম, সাংবাদিক শাহজাহান আলী মিটন, মানবাধিকার কর্মী হাফিজুর রহমান প্রমুখ।
এসময় ১০ দিন নিখোঁজ থাকা শিক্ষক টিপু সুলতান তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নিখোঁজ থাকার সময়কার ভয়াবহ স্মৃতি ও মানসিক যন্ত্রণার কথা জানান।
বক্তারা আরও বলেন, গুমের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও অধিকাংশ ঘটনারই এখনো বিচার হয়নি। তাই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি নিখোঁজ ঘটনার সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
তারা সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন—
১. অবিলম্বে গুম প্রতিরোধ আইন জাতীয় সংসদে পাশ করতে হবে।
২. নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে সম্পত্তি ও ব্যাংক হিসাব পরিচালনার অধিকার দিতে হবে।
৩. ভারতের কারাগারে বাংলাদেশি গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিষয়ে কূটনৈতিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
৪. গুম-সংক্রান্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে ভুক্তভোগীদের মুক্তি দিতে হবে।
৫. গুমের সঙ্গে জড়িতদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারীরা নিখোঁজদের সন্ধান ও ন্যায়বিচারের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
অনুষ্ঠানে নবীন মানবাধিকার কর্মী কাজী মশিউর রহমান, দৈনিক নয়া দিগন্তের সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি জিললুর রহমানসহ বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, গুম ভিকটিম পরিবারের সদস্য ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।


