
গাজীপুর প্রতিনিধি:
গাজীপুরের ভাওয়াল বনাঞ্চলে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বন উজাড়ের ভয়াবহ চিত্র। এবার গাজীপুর সদর উপজেলার ভবানীপুর মৌজাস্থ ভবানীপুর ফরিদ মার্কেট সংলগ্ন নজরুল মাস্টারের বাড়ির পাশ থেকে একের পর এক মূল্যবান সেগুন গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, বন বিভাগের গেজেটভুক্ত জমিতে থাকা প্রায় ১৮ থেকে ২০টি সেগুন গাছের মধ্যে ইতিমধ্যে ১০ থেকে ১২টি গাছ রাতের আঁধারে কেটে নিয়ে গেছে একটি প্রভাবশালী চক্র। অথচ অভিযোগের পরও রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সিএস দাগ নং ১১৯৪ ও ১১৯৫ এবং এসএ ১০৮০ ও আরএস ৬৩৯৫ দাগভুক্ত বন বিভাগের গেজেটভুক্ত এলাকায় গত কয়েকদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে গাছ কাটা হচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহল একাধিকবার বিষয়টি সিংড়াতলী ফরেস্ট অফিস ও ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তাদের অবগত করলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রথমদিকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গাছ জব্দ করে অফিসে নেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো গাছ জব্দ করা হয়নি। বরং গত এক সপ্তাহ ধরে ধাপে ধাপে গাছ কেটে ট্রাকযোগে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে এলাকাজুড়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এলাকাবাসী জানান,
“ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই আমরা শুনেছি পুরো বাগান প্রায় দুই লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। বন বিভাগ সব জানার পরও অদ্ভুতভাবে নিশ্চুপ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন—বন বিভাগের নাকের ডগায় কীভাবে গেজেটভুক্ত জমির এত মূল্যবান সেগুন গাছ উজাড় হয়ে যায়? তাহলে কি কোনো অদৃশ্য প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় চলছে এই বন ধ্বংসের মহোৎসব?
পরিবেশবিদদের মতে, ভাওয়াল বনাঞ্চল শুধু গাজীপুর নয়, পুরো মধ্যাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বিচারে বন উজাড়ের ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভাওয়াল বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালী মহলের দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও গাছ কাটার ঘটনা বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে বন বিভাগের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ থেকেছে। অভিযোগ রয়েছে, দায়সারা অভিযান ও রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে কাঠখেকো সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
পরিবেশ সচেতন মহলের অভিমত,
“একটি পূর্ণবয়স্ক সেগুন গাছ তৈরি হতে কয়েক দশক সময় লাগে। অথচ কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে অল্প সময়েই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান বনসম্পদ। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ পরিবেশ বলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।”
বাংলাদেশ বন আইন, ১৯২৭ অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল বা গেজেটভুক্ত জমির গাছ অবৈধভাবে কর্তন, পরিবহন ও বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইনেও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা ও ফৌজদারি মামলার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইনের কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় বন ধ্বংসকারীরা দিন দিন আরও সংগঠিত ও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে এলাকাবাসী দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের শনাক্ত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, অবশিষ্ট গাছ রক্ষায় জরুরি অভিযান পরিচালনা এবং বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
সিংড়াতলী বিট কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, “কে বা কারা গাছ কেটেছে, তাদের নাম পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে আমি গিয়ে গাছ কাটায় বাধা দিয়ে আসছি। এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। কাটা গাছগুলো সময় সুযোগ বুঝে অফিসে নিয়ে আসব।”
এদিকে বিষয়টি জানতে চাইলে ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তা রাশেদ শাহদাৎ সাংবাদিকদের বলেন, “আমি বিষয়টি অবগত ছিলাম না। আগামীকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, ইতিমধ্যে এক সপ্তাহ ধরে গাছ কাটার পরও রেঞ্জ কর্মকর্তার ‘অবগত না থাকার’ বক্তব্য বন বিভাগের নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতাকেই প্রমাণ করে। পরিদর্শনের আশ্বাস দিলেও ইতিমধ্যে উজাড় হয়ে যাওয়া সেগুন গাছ আর ফিরে আসবে না বলে মনে করছেন পরিবেশ সচেতনরা।

