আজ বুধবার, মে ১৩, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পুলিশে বদলি এবং পদায়নে অনিয়ম ও ‘তদবির বাণিজ্যের’ বিষয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। পুলিশ সপ্তাহের তৃতীয় দিন মঙ্গলবার রাজরাবাগে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক সম্মেলনে তিনি এ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সম্মেলনে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, বিশেষ করে জেলা পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় বলা হয়, অনেক কর্মকর্তা এক দপ্তর থেকে বদলি হয়ে পুনরায় সুবিধাজনক দপ্তরে পোস্টিং পেতে বিভিন্ন লবিং বা অনৈতিক উপায় ও আশ্রয় নিচ্ছেন। এ প্রবণতাকে ‘বিভাগীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থি’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন আইজিপি। সম্মেলনে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

কর্মকর্তাদের পেশাদারি বজায় রাখা এবং নৈতিকতা ও শুদ্ধাচার নিশ্চিত করার কঠোর নির্দেশনা দিয়ে আইজিপি বলেন, মাঠ পুলিশকে বিবেকের তাড়নায় কাজ করতে হবে। সভায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন তুলেন-কেন সঠিক সময়ে সঠিক রিপোর্ট দেওয়া হয় না? কেন মাঠ পর্যায়ে স্বচ্ছতা বজায় থাকছে না? তিনি কর্মকর্তাদের নিজেদের ‘রুহ’ বা আত্মাকে পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেবল নির্দেশ দিয়ে নয়, নিজেদের আচরণ ও সততার মাধ্যমে পুলিশবাহিনীকে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।

একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে আইজিপি বলেন, কোনো ধরনের তদবির বা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বদলি হওয়া যাবে না। দলবাজি বা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া চলবে না। সব ক্ষেত্রে মেধা ও পেশাদারির স্বাক্ষর রাখতে হবে। পেশাদারি আর শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজের নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি তাদের বিষয়ে স্বচ্ছ রিপোর্ট দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশিংয়ের পাশাপাশি মাদকের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

সম্মেলনে উপস্থিত একজন অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, পুলিশের প্রতিটি ইউনিটে নৈতিকতা বজায় রাখার বিষয়ে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। কোনো পুলিশ সদস্যের মাদকের সঙ্গে ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কারও ব্যক্তিগত অপরাধের দায় বাহিনী নেবে না উল্লেখ করে আইজিপি কঠোর অবস্থান থেকে বিভাগীয় তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেন। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে আইজিপির বার্তা-থানাকে হতে হবে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। ‘জিরো কমপ্লেইন’ বা অভিযোগহীন থানা গঠনের লক্ষ্যে কর্মকর্তাদের আরও দায়িত্ব হতে হবে। বিশেষ করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করতে এসে কোনো নাগরিক যেন হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে কড়া নজরদারি থাকতে হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ডিআইজি বলেন, বিগত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের ইমেজ সংকটের ইতি টানতে চান আইজিপি। এই কঠোর অবস্থান বহাল থাকলে মাঠ পর্যায়ে কাজের গতি ও স্বচ্ছতা ফিরবে।

আলোচনায় উঠে আসে স্থানীয় প্রভাবে অনেকের দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটে। তাই কেউ কেউ যেন নিজ জেলা বা নিকটাত্মীয়ের এলাকায় বদলি হতে না পারেন, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। অনিয়ম রোধে কর্মকর্তাদের স্থায়ী আবাসের কাছাকাছি পোস্টিং না দিয়ে কিছুটা দূরত্বে পদায়নের বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। সম্মেলনে পুলিশ সদর দপ্তরের সঙ্গে বিভিন্ন উইংয়ের (বাজেট, রক্ষণাবেক্ষণ ও লজিস্টিকস) সমন্বয়হীনতা দূর করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মাঠ পর্যায়ে কনস্টেবল থেকে শুরু করে সাব-ইনস্পেকটরদের আবাসন, ছুটি এবং কল্যাণমূলক কাজগুলো যাতে আরও সহজ ও গতিশীল হয় সে বিষয়ে কর্মকর্তারা মতামত দেন।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অপরিহার্য বলে মাঠ কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দেন আইজিপি। তিনি বলেন, পুলিশ যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করে, তবে সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে এবং জনমনে অসন্তোষ তৈরি হবে। কনস্টেবল নিয়োগে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভিন্ন প্রকল্পের কেনাকাটা এবং রক্ষণাবেক্ষণ খাতে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘ইন্টেলিজেন্স লেড পুলিশিং’ বা গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক কার্যক্রমে জোর দেওয়ার নির্দেশ দেন।

দূরবর্তী এলাকায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের ব্যারাক ও আবাসনব্যবস্থার উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর আশ্বাস দিয়ে আইজিপি বলেন, বিশেষ প্রয়োজনে সদস্যদের পাওনা ছুটি নিশ্চিত করতে রেঞ্জ ডিআইজিদের ভূমিকা নিতে হবে। প্রশাসনিক সম্মেলনে আইজিপি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ‘বিবেকের তাড়নায়’ কাজ করার আহ্বান জানান। সাধারণ মানুষ যাতে থানায় গিয়ে হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য ‘ওপেন ডোর পলিসি’ বা সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার তাগিদ দেন আইজিপি।

Exit mobile version