
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ফাউগাইন গ্রামে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে অনুষ্ঠিত এক সালিশি সভায় গণপিটুনির শিকার হয়ে জয়নাল আবেদীন (৬০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগী উভয় পক্ষের কয়েকজন সদস্য পলাতক রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, গত ৯ মে দুপুরে ফাউগাইন গ্রামের আনোয়ার হোসেনের মেয়ে আয়েশা (ছদ্মনাম) নামের ওই শিশুকে বাড়ির পাশের একটি দোকান থেকে বিস্কুট কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে যান প্রতিবেশী জয়নাল আবেদীন। অভিযোগ, সেখানে তিনি শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। শিশুটির চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে জয়নাল আবেদীন তাকে ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে শিশুটি তার মাকে ঘটনার বিবরণ দিলে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) একজন সদস্যের উপস্থিতিতে গ্রামের একটি স্কুল প্রাঙ্গণে সালিশের আয়োজন করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আলোচনা চলাকালে এক পর্যায়ে উপস্থিত কিছু উত্তেজিত লোকজন ও শিশুটির পরিবারের সদস্যরা জয়নাল আবেদীনের ওপর চড়াও হন এবং তাকে বেধড়ক মারতে থাকেন। এ সময় জয়নাল আবেদীন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে তার ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং দরজায় তালা লাগিয়ে দেন। কিন্তু প্রায় ২০-২৫ জনের একটি বিক্ষুব্ধ জনতা সেখানেও তাকে অনুসরণ করে। তারা ঘরের চাবি ছিনিয়ে নিয়ে ভেতরে ঢুকে আবারও তাকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে।
পরে স্থানীয় বাজার কমিটির সভাপতির হস্তক্ষেপে জয়নাল আবেদীনকে উদ্ধার করে একটি অটোরিকশায় করে বাজারে আনা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকাল ৯টায় তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পাল্টা দিক তুলে ধরে শিশুটির বাবা আনোয়ার হোসেন থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, জয়নাল আবেদীন ও তার সহযোগীরা মেয়ের পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন। অন্যদিকে, জয়নালের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ও পুলিশ তদন্ত শুরু করলে আনোয়ার হোসেন ও তার পরিবারের সবাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের কাউকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি।
নিহত জয়নাল আবেদীনের ছেলে আনোয়ার হোসেন (ভিন্ন ব্যক্তি, পূর্ববর্তী আনোয়ার নয়) অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার বাবাকে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যদি তিনি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তাহলে আইন অনুযায়ী বিচার হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এভাবে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা সম্পূর্ণ অন্যায়।’ এই ঘটনায় তিনি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘটনার সত্যতা যাই হোক না কেন, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তারা এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বুধবার (আজ) ময়নাতদন্ত শেষে জয়নাল আবেদীনের মরদেহ নিজ গ্রামে জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে। শ্রীপুর থানার পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

