
ভোরের কুয়াশাভেজা আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি, অথচ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতা-গাউছিয়া গোলচত্বর এখন শত শত মানুষের কোলাহলে মুখর। কারো কাঁধে কোদাল-ঝুড়ি, কারো হাতে রাজমিস্ত্রির সরঞ্জাম কিংবা ধান কাটার কাস্তে। দৃশ্যত এখানে কোনো পণ্য নেই, তবুও চলছে তীব্র দরদাম। কেননা, এই হাটটিতে বিক্রি হয় মানুষের হাড়ভাঙা খাটুনি আর গায়ের শ্রম।
যুগ যুগ ধরে টিকে থাকা এই ‘মানুষ বিক্রির হাটে’ উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে দেশের প্রান্তিক জনপদের দিনমজুরেরা যেমন কাজ খুঁজে পান, তেমনি নির্মাণ কিংবা কৃষিকাজের জন্য সস্তায় শ্রমিক পেতে প্রতিদিন ভিড় করেন শত শত ক্রেতাও। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর উপকণ্ঠে হওয়ায় রূপগঞ্জে শ্রমের চাহিদা ও মূল্য—উভয়ই কিছুটা বেশি। তাই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ময়মনসিংহ, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলার শত শত দিনমজুর বাড়তি আয়ের আশায় এখানে ভিড় জমান। প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে এই বেচাকেনা। এখানে রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, স্যানিটারি মিস্ত্রি থেকে শুরু করে কৃষিশ্রমিক ও সাধারণ দিনমজুর—সবাই দরদামের মাধ্যমে নিজেদের শ্রম বিক্রি করেন।
মৌসুম ও কাজের ধরন ভেদে এই হাটে শ্রমের দাম ওঠানামা করে। বর্তমানে মাটি কাটা বা গৃহস্থালি কাজের জন্য আধা বেলা ৬০০-৭০০ টাকা এবং পুরো দিন (সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা) ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় শ্রমিক পাওয়া যায়। নির্মাণ ও স্যানিটারি মিস্ত্রিরা হাজিরা হিসেবে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা এবং তাঁদের সহকারীরা (হেলপার) ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা চুক্তিতে বিক্রি হন। ক্ষেত্রবিশেষে মাসিক চুক্তিতেও কাজ মেলে এই হাটে।
জানা যায়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আশা নিম্ন আয়ের কিছু মানুষ সংসারের প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতেই এখানে গায়ের শ্রম বিক্রি করেন। এ হাটে এক শ্রেণির মানুষ আসেন ‘বিক্রি’ হতে, অন্য শ্রেণির মানুষ আসেন শ্রম কিনতে। চলতে থাকে দরদাম, পণ্যের মতোই মৌসুম বিবেচনায় তাদের দামও ওঠানামা করে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে নিজেদের যেন এভাবেই বেচে দিচ্ছেন তারা। এ হাঁটে নির্ধারিত সময়ের ভেতরেই প্রায় সবাই বিক্রি হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে অল্পসংখ্যক মানুষ অবিক্রিত থাকে। বিক্রি না হওয়া দিনটাতে কেউ কেউ অন্য কাজ খোঁজেন, আবার কেউ কেউ বিশ্রাম করে কাটিয়ে দেন। জীবিকার তাগিদে জীবন সংগ্রামের ঘাঁটি হিসেবে অনেকেই বেছে নিয়েছেন এই শ্রমের হাটকে।
মাটিকাটা শ্রমিক গ্রুপের সরদার ইস্কান্দার হোসেন জানান, নেত্রকোনা এলাকায় তার বাড়ি। গ্রামে তেমন কাজ না থাকায় একটু বাড়তি আয়ের আশায় এখানে চলে এসেছেন। পার্শ্ববর্তী একটি এলাকায় প্রায় ১০ বছর যাবত পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। প্রতিদিনই শ্রম বিক্রির জন্য এ হাটে আসেন। মাঝেমধ্যে দু-এক দিন কাজ মিস হলেও মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার কাজ করে থাকেন।
উপজেলার হাটাব এলাকার আকমল হোসেন বলেন, স্ত্রী সন্তান নিয়ে চারজনের সংসার। লেখাপড়া জানা না থাকায় ভালো কোনো কাজ জুটে নাই। তাই বাধ্য হয়েই দিনমজুরের কাজ করতে হয়। সংসার আর বাচ্চাদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে প্রায় প্রতিদিনই এই হাটে আসি।
রাজমিস্ত্রি আনোয়ার হোসেন বলেন, সকালে কাজের খোঁজে আমরা এই হাটে চলে আসি। মিস্ত্রি ১ হাজার থেকে ১২’শ টাকা এবং হেলপার ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা রোজে বিক্রি করি। কোনো কোনো সময় এক বাড়িতেই মাস বা তার অধিক কাল কাজ পেয়ে থাকি। প্রতিদিন এ হাটে কয়েকশ দিনমজুর বিক্রি হয়ে থাকে বলে জানান তিনি।
নোয়াগাও এলাকা থেকে শ্রমিক কিনতে আসা মনির হোসেন বলেন, বাউন্ডারি ওয়াল তৈরি করার জন্য একজন রাজমিস্ত্রি আর দুজন হেলপার লাগবে। তাই এ মানুষ বিক্রির হাটে এসেছি। ১ হাজার টাকা রোজ চুক্তিতে একজন রাজমিস্ত্রি ও ৮০০ টাকা করে দুইজন হেলপার নিলাম।
আহসানুল্লাহ সোহান গন্ধর্বপুর থেকে মানুষ বিক্রির হাটে এসেছেন মাটি কাটার দিনমজুর কিনতে। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, আধা বিঘা পরিমাণ পুকুরের পাড় বাঁধাই করতে হবে, তাই মাটি কাটা শ্রমিক লাগবে। ভুলতা গাউছিয়া গোল চত্বরে বছরজুড়েই প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত মানুষ বিক্রির হাট জমে। তাই এখানে এসেছি। তিনি বলেন, এখানে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিম্ন আয়ের মানুষ শ্রম বিক্রি করে থাকেন। পুরো দিন ১২শ টাকা আর আধা বেলা ৭০০ টাকা চাচ্ছে। পরে ১ হাজার টাকা পুরো দিন চুক্তিতে ৮ জন দিনমজুর

