মুসলিম জাতি ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো পালনের ক্ষেত্রে চাঁদকে অনুসরণ করে থাকে। কিন্তু একই ধর্মীয় অনুষ্ঠান একই তারিখে পালন না করে মুসলিম রাষ্ট্রসমুহ তা ভিন্ন ভিন্ন তারিখে পালন করে। এটার কারণ হলো চন্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী চন্দ্র মাসের তারিখ গণনা না করে চাঁদ দেখে চন্দ্র মাসের তারিখ নির্ধারণ করা হয় বিধায় একেক মুসলিম রাষ্ট্র একেক দিন চাঁদ দেখতে পাবার দাবি করে, এবং সে অনুযায়ী তারা ভিন্ন ভিন্ন দিনে চন্দ্র মাসের প্রথম তারিখ নির্ধারণ করে থাকে। এই ধর্মীয় অজ্ঞতা ও অনৈক্যের কারণে মুসলিম বিশ্ব আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর একই দিনে বা তারিখে পালন না করে ভিন্ন ভিন্ন দিনে বা তারিখে তা পালন করছে। যেমন সৌদী আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশসমুহ যেদিন ঈদুল ফিতর পালন করে, আমাদের বাংলাদেশে সেদিন চাঁদ দেখতে না পাওয়ার অজুহাতে তার ২/১ দিন পর ঈদ পালিত করা হচ্ছে।
মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এই ঈদুল ফিতরের অনুষ্ঠান এভাবে ভিন্ন ভিন্ন দিনে পালন করায় মুসলমানদেরকে বিধর্মীদের কাছে আজ হেয় প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে। আর এতে ধর্ম পালনে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যটিও ব্যাহত হচ্ছে। অথচ ইহুদি খৃষ্টানরা সৌর ক্যালেন্ডারকে অনুসরণ করে বিধায় তারা বড়দিন সহ তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান সৌর পঞ্জিকা অনুযায়ী সারা বিশ্বে একই দিনে পালন করে থাকে। এটা তাদের একটা ঐক্যের প্রতীক। যা মুসলিম জাতির মাঝে নেই।
চন্দ্র ও সুর্যকে আল্লাহপাক সময়, দিন, মাস ও বছরসমুহ গণনা করার জন্যে সৃষ্টি করেছেন। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনের কিছু দলিল উপস্থাপন করা হলো-
(১) “তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন চাঁদ ও সুর্যকে। আর এরা প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ কক্ষপথে (আল্লাহর নির্দেশে) চলছে একটি নির্দিষ্ট সময় অনুসারে” (সুরা-যুমার-৩৯: আয়াত-৫)।
(২) “আমি তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছি সুর্য ও চন্দ্রকে। এরা সর্বদা একই নিয়মে তথা একই সময় অনুসারে (আমার নির্দেশে) তাদের কক্ষপথে প্রদিক্ষণ করে চলেছে” (সুরা-ইব্রাহীম-১৪: আয়াত-৩৩)।
(৩) “তিনিই সেই মহান সত্বা, যিনি সুর্যকে করেছেন উজ্জ্বল আলোকময় আর চন্দ্রকে করেছেন স্নিগ্ধ আলো বিতরণকারীরূপে। অতঃপর এ চাঁদ ও সুর্যের জন্যে তিনি নির্ধারিত করে দিয়েছেন তাদের নিজস্ব ও নির্ধারিত সময়ে চলার কক্ষপথ, যাতে তোমরা (এই চাঁদ ও সুর্যের হিসাব দ্বারা মাসসমুহ ও) বছরসমুহের হিসাব জানতে ও গণনা করতে পার” (সুরা-ইউনুস-১০: আয়াত-৫)।
পবিত্র কুরআনের উপরোক্ত তিনটি আয়াত হতে সুস্পষ্টভাবে বুঝা গেল চাঁদ ও সুর্য মহান আল্লাহপাকের নির্দেশে একই নিয়মে ও একই সময়ে তাদের নিজস্ব কক্ষপথে প্রদিক্ষণ করে চলেছে। আর এটা এ জন্য যে, আমরা যেন চাঁদ ও সুর্যের দ্বারা সময়, মাস, দিন ও বছরের হিসাব সঠিকভাবে গণনা করে তা জানতে পারি। অর্থাৎ, চাঁদ ও সুর্য এ দু’টোকে সৃষ্টি করা হয়েছে সময়, দিন, মাস ও বছরের হিসাব গণনা করার জন্যে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, যদি সুর্যের দিকে না তাকিয়েই আমরা ঘড়ির দ্বারা সময় এবং সৌর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সৌর দিন, মাস ও বছরের হিসাব গণনা করতে পারি, তবে একই নিয়মের অধীন চাঁদের সময়, দিন, মাস ও বছরের হিসাব করতে কেন চাঁদ দেখে তা করতে হবে? চন্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কেন আমরা চন্দ্র তারিখ, মাস ও বছরের হিসাব করি না? এটা তো আমাদের মুসলিম জাতির বিশাল এক অজ্ঞতা!
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, সুর্যের সময় অনুসারে আজ ডিসেম্বর মাসের ৩১ তারিখ হলে, আগামীকাল যে, জানুয়ারীর ১ তারিখ হবে এটা তো সবাই জানে! এজন্যে সুর্যের দিকে তাকানো বা পরবর্তী দিনের সুর্য উদয়ের উপর নির্ভরশীল হতে হয় না। তাহলে চাঁদের ক্ষেত্রে কেন রমজান মাসের ৩০ তারিখের পর, পরবর্তী মাস শাওয়াল মাসের ১ তারিখ কবে হবে, তা জানার জন্যে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে? বা আকাশে চাঁদ উদিত হয়েছে কিনা তার উপর নির্ভর করতে হবে? সুর্যের তারিখের বেলায় তো কেউ সুর্যের দিকে তাকায় না! সৌর ক্যালেন্ডার দেখেই পুরো পৃথিবীর মানুষ দিন, মাস আর বছরের হিসাব গণনা করে। আর আমাদের মুসলিম জাতি চন্দ্র ক্যালেন্ডার থাকা সত্বেও এ আধুনিক যুগে এখনো হা করে চাঁদের দিকে তাকিয়ে মাস গণনা করে। এ অজ্ঞতার জন্যই এই মুসলিম বিশ্বে আজ কোন একতা নেই। রয়েছে শুধু মতবিরোধ আর অশান্তি। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহপাক বলেন-“হে মুসলমানগণ! তোমরা আল্লাহর রজ্জু তথা সকল বিধি-বিধানকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর (তথা মুসলমানগণ ভাই ভাই হিসাবে মিলেমিশে থেকে ধর্মের সকল বিধি-বিধান একই নিয়মে পালন কর।) পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইও না (তথা ধর্মের বিধি-বিধান পালনে কোন মতভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের মধ্যে কোন অনৈক্য সৃষ্টি কর না)” (সুরা-আলে ইমরান-৩: আয়াত-১০৩)।
মানব সৃষ্টির পুর্বেই মহান আল্লাহপাক দিন, মাস ও বছর গণনা করার জন্যে চন্দ্র মাসসমুহ নির্ধারণ করে রেখেছেন অর্থাৎ চন্দ্র ক্যালেন্ডার তৈরি করে রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে- “নিশ্চয়ই (চন্দ্র) মাসসমুহের সংখ্যা বারোটি আল্লাহর কাছে সুনির্দিষ্ট রহিয়াছে তার কিতাবে (লাওহে মাহফুজে) সেদিন থেকে, যেদিন তিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিন! তার মধ্যে পবিত্র মাস চারটি…”(সুরা-তাওবা-৯: আয়াত-৩৬)।উপরোক্ত আয়াত হতে সুস্পষ্ট যে, চন্দ্র মাসসমুহ মানুষ সৃষ্টির পুর্ব হতেই মহান আল্লাহপাক নির্ধারণ করে রেখেছেন। তার মানে কতদিনে কোন্ মাস হবে, কত মাসে বছর হবে তা মহান আল্লাহ কর্তৃক পুর্ব হতেই নির্ধারিত রয়েছে। তাহলে কেন আমরা আল্লাহর নির্ধারিত চন্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চন্দ্রমাস ও বছরের হিসাব গণনা করি না? হযরত ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে হযরত আলী (কাঃমাঃ) মুসলমানদের জন্য আল্লাহর বিধান অনুযায়ী আট বছরের চন্দ্র হিজরী ক্যালেন্ডার তৈরি করে দিয়ে গেছেন। অথচ আমরা সেই চন্দ্র ক্যালেন্ডারের অনুসরণ না করে, এখনো চাঁদের দিকে উঁকিঝুঁকি মেরে তাকিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো পালন করি। এতে মুসলিম বিশ্বে অনৈক্যের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
হযরত রাসুল (সাঃ) মদিনায় হিজরত করার এক বছর পর আল্লাহপাক মুসলমানদের উপর রোজার বিধান প্রবর্তন করেন। তখন তিনি সাহাবীদেরকে রমজানের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলে তারা জিজ্ঞেস করেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা কিভাবে রোজা পালন করবো?” তখন আরবে চান্দ্র বছর গণনার কোন সঠিক নিয়ম না থাকাতে এবং মুসলমানরা স্বল্প পরিসরে মদিনা ও মক্কার উপকন্ঠে বসবাস করতো বিধায় তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বলেন-“তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো ও চাঁদ দেখে রোজা খোলো (ঈদ পালন কর)!” অর্থাৎ রোজা প্রবর্তনের প্রাথমিক সময়কালীন হযরত রাসুল (সাঃ) চাঁদ দেখে রোজা পালন ও ঈদ পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে মুসলিম রাস্ট্রের পরিধি বৃদ্ধি পেয়ে সমগ্র আরবজাহানে ছড়িয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় মুসলমানরা যাতে সঠিক নিয়মে ধর্ম পালন করতে পারে, সেজন্যে হযরত রাসুল (সাঃ) তাঁর জীবনের শেষ দিকে এসে চন্দ্র মাস গণনার উপর গুরুত্বারোপ করে বলেন-“আমরা (জাহেরী) লেখাপড়া না জানা লোক। লিখতে পারিনা ও ভাল করে হিসাব রাখতে পারিনা। চন্দ্র মাস হয় এই ও এইতে।” এই বলে প্রথমে তিনি দু’হাতের দশ আঙুল দু’বার উঁচিয়ে দেখালেন (১০+১০=২০), তৃতীয়বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গল বন্ধ রেখে দেখালেন (৯), অর্থাৎ একমাস (১০+১০+৯)=২৯ দিন। তারপর দ্বিতীয় পর্যায়ে দু’হাতের দশ আঙুল তিনবার উঁচিয়ে দেখালেন (১০+১০+১০)= ৩০ দিন। অর্থাৎ চন্দ্রমাস এক মাস হয় ২৯ দিনে পরবর্তী মাস হয় ৩০ দিনে (সুত্র-বোখারী ও মুসলিম শরীফ)। তখন থেকে মুসলিম জাতি চাঁদ দেখার পরিবর্তে চন্দ্র পঞ্জিকা অনুসরণ করতে শুরু করে। কিন্তু তখনও চন্দ্র বছর গণনার সঠিক কোন নিয়ম ছিল না।
পরবর্তীতে মাজহাবের ইমামগণও সারা বিশ্বে একই দিনে পবিত্র ঈদুল ফিতর পালনে গুরুত্বারোপ করেন। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বলেন-“চন্দ্রের উদয়স্থল, এলাকা বা রাষ্ট্র বিবেচনার বিষয়বস্তু নয়। চন্দ্র উদয়ের বিষয়টি শুধু বিবেচনা হবে। অর্থাৎ কোন দেশ বা অঞ্চলে চন্দ্র উদয় হয়েছে কি তা দেখার বিষয় নয়, চন্দ্র উদয় হয়েছে কি তাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয়” (সুত্র-ফতোয়ায়ে আলমগীরী)। ফতোয়ায়ে কাজীখানে উল্লেখ রয়েছে-“বিখ্যাত ফকিহ আবু লাইস (রহঃ) ও সামসুল আইম্মাহুনাওয়ানী (রহঃ) এরূপ ফতোয়া প্রদান করতেন যে, “যদি পশ্চিম দেশীয় লোক রমজানের চাঁদ দর্শন করে, তবে (তার খবর পাওয়া মাত্র) পুর্ব দেশীয় লোকদের উপরও রোজা রাখা ও ঈদ পালন করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।”
এসব কুরআন-হাদীস ও মাজহাবের ইমামগণের আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, পবিত্র ঈদ পালনের ক্ষেত্রে চাঁদ দেখাটা জরুরী নয়, চন্দ্র পঞ্জিকার অনুসরণই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সময় নির্ধারণের জন্য ঘড়ি ছিল না এবং এ কুরআনের উপরোক্ত আয়াতগুলো তখনো নাযিল না হওয়াতে আর চন্দ্র ক্যালেন্ডার তখনো তৈরী না হওয়াতে হযরত রাসুল (সাঃ) তখন সাহাবীদের বলেছিলেন, চাঁদ দেখে রোজা ও ঈদ পালন করার জন্যে। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি চন্দ্রমাস গণনা করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। তাছাড়া বিজ্ঞানের এই আধুনিক যুগে এখন তো হিজরী ক্যালেন্ডার রয়েছেই, এবং কুরআন-হাদীসের নির্দেশও আছে! তবে কেন এখনো চাঁদ দেখার সেই সনাতন পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে!
মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী সুফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী হুজুর ক্বেবলাজান আট বছরের চন্দ্র পঞ্জিকার পুনর্প্রবর্তন করে সমস্ত মুসলিম বিশ্বকে একই দিনে পবিত্র ঈদ পালন করার আহবান জানিয়েছেন। সেই লক্ষ্যে তিনি “অষ্ট বর্ষচক্র চান্দ্রপঞ্জিকা” উদ্বোবন করে ১৯৯৫ ইং সনে তা ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি)-তে উপস্থাপন করলে বিশ্বের ৫০টি মুসলিম দেশের প্রতিনিধিরা তা সাদরে গ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে তা বাস্তবায়নের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। আসুন আমরা আল্লাহর মহান বন্ধু সূফী সম্রাট হুজুর ক্বেবলাজানের এই ধর্মীয় সংস্কার অনুসরণ করে সারা বিশ্বে সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো চন্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী একই দিনে পালন করি। অর্থাৎ দিন বা তারিখ হবে একই, তবে পার্থক্য হবে শুধু সময়ের। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শুধু সময়ের ব্যবধান বা পার্থক্যে একই দিনে রোজা ও ঈদসহ সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো সকল মুসলিম উম্মাহ একাত্ম হয়ে পালন করা একান্ত কর্তব্য। তবে সেইদিন আর বেশি দুরে নেই, যেদিন আল্লাহর বন্ধু সূফী সম্রাট হুজুর ক্বেবলাজানের ধর্মীয় সংস্কার অনুযায়ী সারা বিশ্বে পবিত্র ঈদসহ সকল ধর্মীয় সকল অনুষ্ঠানগুলো একইদিনে শুধু সময়ের পার্থক্যে সকল মুসলিম উম্মাহ একাত্ম হয়ে পালন করবে ইনশাআল্লাহ।
ধর্মীয় গবেষক ও লেখক- এ আর শাহীন মাহমুদ, (খাদেম- বাবে জান্নাত রওজা শরীফ; গবেষক ও লেখক- সূফী সম্রাট রিসার্চ সেন্টার; সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান- প্লাস্টিক এন্ড রাবার সু মার্চেন্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ; সাবেক শিল্পী- বাংলাদেশ বেতার)।



