দয়াল মা’র দয়ায় প্রচন্ড ঝড়ে নৌকাডুবি হতে রক্ষা-
আল্লাহর মহান বন্ধু, যুগের ইমাম, মহান সংস্কারক ও মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবন দানকারী সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী হুজুর ক্বেবলাজানের প্রাণপ্রিয় সহধর্মিণী হযরত সৈয়দা হামিদা বেগম দয়াল মা (রহঃ) ছিলেন তৎকালীন জামানার শ্রেষ্ঠ মহামানব ও সুলতানিয়া-মোজাদ্দেদিয়া তরীকার ইমাম হযরত সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ চন্দ্রপুরী (রহঃ)-এর আদরের চতুর্থ কন্যা এবং একজন মহীয়সী মহামানবী। তিনি ছিলেন একজন মাদার জাত অলী-আল্লাহ। অর্থাৎ জন্মগতভাবেই তিনি ছিলেন আল্লাহ মনোনীত এবং উচ্চ মাকামের অধিকারিণী।
যারা খাটি অলী-আল্লাহ তাঁরা আল্লাহ প্রদত্ত অলৌকিক কারামতের অধিকারী হয়ে থাকেন। আল্লাহর ইচ্ছাতেই নবী-রাসুল ও অলী-আল্লাহগণ অলৌকিক কারামত প্রদর্শন করে থাকেন। তবে একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত তাঁরা অলৌকিক কারামত প্রদর্শন করেন না। আর এই অলৌকিক কারামত বা মু’জিযা যে মহাসত্য তা একমাত্র মুমিনগণই বিশ্বাস করেন। অবিশ্বাসীরা এসব অলৌকিক কারামতকে যাদু বলে প্রচার করতো। অলৌকিক কারামত সম্পর্কে পবিত্র কুরআন হতে কিছু আয়াত উদ্ধৃত করা হলো।
“তিনিই সেই মহান আল্লাহ, যিনি তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শন বা মু’জিযাসমুহ প্রদর্শন করে দেখান”(সুরা-মু’মিন-৪০: আয়াত-১৩)।
” নিশ্চয়ই যারা আমার নিদর্শন তথা মু’জিযাসমুহ (মিথ্যা বলে) অবিশ্বাস করছে, তাদেরকে আমি জাহান্নামের আগুনে পোড়াবো”(সুরা-নিসা-৪: আয়াত-৫৬)।
“(হে রাসুল)! আপনি তাদের বলুন, হে আহলে কিতাবীরা! তোমরা কেন আল্লাহর নিদর্শন তথা মু’জিযাসমুহকে অবিশ্বাস করছো?” (সুরা-আলে ইমরান-৩: আয়াত-৯৮)।
“হে রাসুল! আপনি তাদের (অবিশ্বাসীদের) বলুন, নির্দশন বা মু’জিযা তো আল্লাহর ইচ্ছাতেই সংঘটিত হয়”(সুরা-আনকাবুত-২৯: আয়াত-৫০)।
“হে রাসুল! আপনি তাদের (অবিশ্বাসীদের) বলুন, তোমরা কি আল্লাহ ও তাঁর মু’জিযাসমুহ এবং তাঁর রাসুলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিলে?”(সুরা-তাওবা-৯: আয়াত-৬৫)।
“কোন রাসুলের পক্ষে সম্ভব নয় আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কোন নির্দশন বা মু’জিযা প্রদর্শন করা”(সুরা-মু’মিন-৪০: আয়াত-৭৮)।
উপরোক্ত আয়াতসমুহ হতে অলৌকিক কারামত সম্পর্কে আমরা সুস্পষ্ট ধারণা পেয়েছি। আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে আল্লাহ মনোনীত মহামানব নবী-রাসুল ও অলী-আল্লাহগণ প্রয়োজন মোতাবেক অলৌকিক কারামত প্রদর্শন করেন। আর এই অলৌকিক কারামত হলো আল্লাহ প্রদত্ত এমন এক মহাসত্য সার্টিফিকেট, কে আল্লাহর মনোনীত মহামানব আর কে মিথ্যাবাদী ভন্ড, তা জানার উপায় হলো এ অলৌকিকত্ব। কারণ যারা আল্লাহ মনোনীত মহামানব, তাঁদের জীবনে অলৌকিক কারামত সংঘটিত হবার মত একটি ঘটনা হলেও থাকবে। আমাদের হযরত দয়াল মা (রহঃ) হলেন আল্লাহ মনোনীত এবং অলৌকিক কারামতের ক্ষমতা সম্পন্ন একজন উচ্চ শ্রেণীর অলী-আল্লাহ। তিনি ছিলেন দেশরক্ষক শ্রেণীর অলীগণের প্রধান কুতুবুল আকতাব। তাঁর জীবনে অসংখ্য অলৌকিক কারামত সংঘটিত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি আল্লাহর ইচ্ছায় অসংখ্য অলৌকিক কারামত প্রদর্শন করেছেন। তার মধ্যে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি।
আমি আশেক রাসুল রুস্তম আলী মোল্লা, পিতা-ওয়াজউদ্দিন মোল্লা, গ্রাম-মুরাদপুর, পোঃ গোপালদী, থানা-আড়াইহাজার, জেলা-নারায়ণগঞ্জ, পেশা-ব্যবসা।
আমি ১৯৯৪ সালে আল্লাহর মহান বন্ধু সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী হুজুর ক্বেবলাজানের নিকট ‘মোহাম্মদী ইসলাম’ এর তরীকা গ্রহণ করি। একদিন আমি এলাকার আরো ৫ জন জাকের ভাইকে সাথে নিয়ে আমার ছেলের বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে আমাদের গ্রাম থেকে কুমিল্লা জেলার বাঞ্ছারামপুর থানায় যাই। তারপর পাত্রী দেখা শেষে বাড়ী ফেরার পথে আমরা নৌকায় করে মেঘনা নদী অতিক্রম করছিলাম। তখন আনুমানিক সাড়ে ছয়টা বাজে। সন্ধ্যা ঘনঘন, নৌকা মেঘনা নদীর মাঝ বরাবর দিয়ে চলছিল। হঠাৎ আকাশ ঘনকালো মেঘে ছেয়ে গেল। মেঘের সে কি প্রচন্ড গর্জন, ভয়ে যেন হৃদয় কেঁপে উঠে! এরই মধ্যে নৌকার মাঝি বললো, গতকালও এমন ঝড় উঠেছিল, সেই ঝড়ের কবলে পড়ে একটা নৌকাডুবি হয়ে ২৩ জন যাত্রী মারা যায়।
মাঝির কথা শুনে ভয়-আতঙ্কে নৌকায় থাকা সকল যাত্রীদের বুকের ভিতর কাঁপন ধরে গেল। দেখতে দেখতে প্রচন্ড দমকা বাতাস ছুটলো। বাতাসের তীব্রতার সাথে নামলো অঝোর বৃষ্টি। প্রচন্ড ঝড়ো-হাওয়ার তোড়ে নৌকায় থাকা সকল যাত্রীরা দিশেহারার মত হয়ে গেল। ঝড়ের মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে, এই বুঝি ঢেউয়ের তোড়ে হেলতে-দুলতে থাকা নৌকাটি ডুবে গেল প্রায়! নৌকার মাঝিও সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে নৌকার হাল ধরে রাখতে, কিন্তু ঝড়ের তীব্রতার কাছে সেও পরাভূত। পরিস্থিতি এতটাই বিপদসংকুল ছিল যে, আমরা সবাই বাঁচার আশাই ছেড়ে দিয়েছি। এই বিপদের সময় আমরা জাকের ভাইয়েরা সবাই যার যার মত করে মানত করে মহান মোর্শেদের কদমে বিপদ হতে উদ্ধার পাবার জন্য আকুতি-মিনতি জানিয়ে মোহাম্মদী ইসলামের মিলাদ শরীফ পাঠ করতে লাগলাম। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মনের অজান্তেই আমার মুখ থেকে হঠাৎ উচ্চারিত হলো, “ওগো দয়াল মা! আপনি আমাদের প্রতি দয়া করেন!”
ঠিক ঐ মুহুর্তে আমি চাক্ষুষভাবে দেখতে পাই, ঝড়ের কবলে পড়া ডুবুডুবু প্রায় নৌকার সম্মুখভাগে কালো বোরকা পরিহিত অবস্থায় হযরত দয়াল মা (রহঃ) দাঁড়িয়ে রয়েছে। আল্লাহর মহান বন্ধু হযরত দয়াল মা’র দয়ায় হঠাৎ যেন ঝড় ধীরে ধীরে থেমে গেল। ঝড় থামার পর তাকিয়ে দেখি দয়াল মা নেই। হঠাৎ যেভাবে উদয় হয়েছিলেন, হঠাৎ আবার সেভাবেই যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। উল্লেখ্য সেদিন আমাদের পাশে থাকা একটি নৌকা ডুবে ১২ জন যাত্রীর মধ্যে ২ জন যাত্রী মারা গিয়েছিল। কিন্তু দয়াল বাবাজান ও দয়াল মা’র দয়ায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে অক্ষত অবস্থায় বাড়ী ফিরে আসার তৌফিক ভিক্ষা দিয়েছিলেন। তারপর আমরা দেওয়ানবাগ দরবার শরীফে এসে মানত আদায় করে আল্লাহর বন্ধুদের উসিলা ধরে মহান আল্লাহর কদমে শুকরিয়া জ্ঞাপন করি।
সংকলন- ‘সূফী সম্রাজ্ঞী হযরত সৈয়দা হামিদা বেগম দয়াল মা (রহঃ)-এর গৌরবোজ্জ্বল জীবনী’; পৃষ্ঠা-৪১৮-৪১৯; লেখিকা- প্রফেসর ড. সৈয়দা তাকলিমা সুলতানা (মাঃআঃ)।



