# এল নিনো শুধু আমাদের দোরগোড়ায় নয়, এটি ইতোমধ্যে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে
# তাপপ্রবাহ, খরা ও মরুকরণের মধ্যেই চলছে প্রকৃতির সঙ্গে টিকে থাকার লড়াই
এসএম শামসুজ্জোহা : ‘আজ রঙ চিনে নেওয়ার আকাল’ আর কয়েক বছর পরে হয়ত সত্যিই রঙ বদলে যাবে পৃথিবীর। নীল রঙে লালই মিশে যাচ্ছে। এই লাল হল জলবায়ু বদলের ভ্রূকুটি। পৃথিবীর সেই স্নিগ্ধ কিন্তু উজ্জ্বল নীলাভ জ্যোতি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমাদের নীল গ্রহকে ঘিরে যে দ্যুতি বিচ্ছুরিত হত, এখন তা নিভে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ২০ বছর আগের পৃথিবীর সে রঙরূপ আর নেই, এমনটাই জানাচ্ছেন গবেষকরা। জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটারে সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্র ছাপা হয়েছে।
সেখানে গবেষকরা বলছেন, পৃথিবীর নীলাভ রঙের চাকচিক্য স্তিমিত হচ্ছে ক্রমশ। মহাশূন্যে পৃথিবী একসময় জ্বলজ্বল করত, তার নীলাভ দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে। এখন পৃথিবীর প্রতি বর্গমিটারে হাফ ওয়াটেরও কম আলো বিচ্ছুরিত হয়। ফ্যাকাশে হচ্ছে পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ। সাগর-মহাসাগরের নীল রঙের প্রলেপে দূষণের ধূসর ছাপ পড়ছে। গত দুই শতাব্দী ধরে পরিবেশ দূষণ কুড়ে কুড়ে খেয়েছে পৃথিবীর মাটি, বায়ুমন্ডল ও জলভাগকে। তারই পরিণাম বড় ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দিচ্ছে।
গত ২ জুন ২০২৬ বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এল নিনোর ব্যাপারে সতর্ক করেছে। সংস্থাটি বলছে, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রজল অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠেছে এবং এর ফলে এল নিনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি যদি সত্যিই সৃষ্টি হয় তাহলে আগামী কয়েক মাসে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তিত হয়ে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সংস্থাটি মানচিত্র এঁকে সেই পরিস্থিতিতে পৃথিবীর কোন অঞ্চলে কী ধরনের অভিঘাত তৈরি হতে পারে সেটি ব্যাখ্যা করেছে (২ জুন ২০২৬ইং)।
এই মানচিত্র অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাংশে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাবে আর বাংলাদেশ ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশ ও দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু অংশে শুষ্কতা দেখা দেবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘এল নিনো শুধু আমাদের দোরগোড়ায় নয়, এটি ইতোমধ্যেই ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি কেবল শুরু। এল নিনো আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং ইতোমধ্যেই জ্বলতে থাকা পৃথিবীতে যেন আরও জ্বালানি যোগ করছে।’
জাতিসংঘের আইপিসিসির রিপোর্ট অনুযায়ী, গত এক দশকে ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও ০.৫০ থেকে ১ দশমিক ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ মেটেরিওলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (বিএমডি) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের গড় তাপমাত্রা গত ৫০ বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। গড় তাপমাত্রা পরিবর্তন হওয়ায় বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময় বদলে গেছে। এখন আর প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে যথা সময়ে ঋতুর আবির্ভাব ঘটছে না এবং ঋতুর সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে। জাতিসংঘের মেরুকরণবিরোধী সংস্থা ইউনাইটেড নেশন্স কনভেনশন টু কমব্যাট ডেজার্টিফিকেশনের (ইউএনসিসিডি) নির্বাহী সচিব মিশরের বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ড. ইয়াসমিন ফুয়াদ ফোনে বলেন, ‘ভূমি আমাদের জীবনধারণের ভিত্তি, এটি আমাদের খাদ্য সরবরাহ করে, অর্থনীতি শক্তিশালী করে এবং আমাদের পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখে।’
জানা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বে প্রতি এক মিনিটে একজনের মৃত্যু হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের প্রতি আগ্রহের কারণে মারাত্মক বায়ুদূষণ ও দাবানল হচ্ছে এবং সংক্রামণ ব্যাধি ডেঙ্গুর মতো নানা রোগ বাড়ছে। উষ্ণতা বৃদ্ধি ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় বিশ্বে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে করা এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্য সাময়িকী দ্য ল্যানসেট এ গবেষণা করেছে।
গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা থেকে নির্গত দূষণ গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রধান উৎস। তাপপ্রবাহের কারণে জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাপপ্রবাহ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং ত্বকের রোগের প্রকোপ বাড়ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাড্রিয়েন আরশট-রকফেলার ফাউন্ডেশন রিজিলিয়ানস সেন্টারের ‘হট সিটিস, চিলড ইকোনমিস: ইমপ্যাক্টস অব এক্সট্রিম হিট অন গ্লোবাল সিটিস’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে ঢাকায় উচ্চ তাপমাত্রার কারণে প্রতিবছর ৬০০ কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ এই ক্ষতির পরিমাণ ৮ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে খরার প্রভাবে প্রতিনিয়ত ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৩ থেকে ১৪টি জেলায় খরা দেখা যায়। বৃষ্টিপাত না হওয়া, পর্যাপ্ত বনায়ন না থাকা, কৃষিজমি ও জলাধার দখল হয়ে যাওয়ার কারণে খরার ঝুঁকি আরও বাড়ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের রিপোর্ট অনুযায়ী, খরার কারণে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল অঞ্চলে ফসলের উৎপাদন প্রায় ২০-৩০ শতাংশ কমে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পানির স্তর বছরে গড়ে স্থানভেদে দুই থেকে তিন ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে এবং এই হার অব্যাহত থাকলে আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে এ দেশের উত্তরাঞ্চল সম্পূর্ণ মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ অনুষদের ডিন এবং বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এর চেয়াম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার জনদর্পন’কে বলেন, রূপ হারাচ্ছে পৃথিবী, ছাড়খাড় করছে উষ্ণায়ণ সারা পৃথিবীর গবেষক, পরিবেশবিদরাই দুঃসংবাদ দিচ্ছেন। আর কয়েক বছর পরে হয়ত ওই নীল আকাশ, নীল সমুদ্র আর থাকবে না। বদলে যাবে সাগর-মহাসাগরের রঙ, আমাদের নীল গ্রহ দূষণের কালো ছায়ায় ঢেকে যাবে।
সম্প্রতি, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের ৩৬টি স্থান নিয়ে বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয় উত্তরা সেক্টর-১৩ এলাকায় এবং সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় নয়াপল্টন এলাকায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ শুধু জলাভূমি ও বৃক্ষ কম থাকার কারণে উত্তরা সেক্টর-১৩ এলাকা এবং নয়াপল্টন এলাকার মধ্যকার গড় তাপমাত্রার পার্থক্য ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ক্যাপসের গবেষণা থেকে আরও পরিলক্ষিত হয়- যেসব এলাকায় সবুজের উপস্থিতি রয়েছে, সেসব এলাকায় তাপমাত্রা তুলনামূলক কম এবং গাছপালা ও জলাভূমি কম থাকার কারণে বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি। গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৭ সালের গড় তাপমাত্রার তুলনায় ২০২৫ সালের গড় তাপমাত্রা প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। মরুকরণের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আবার এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিই মরুকরণকে ত্বরান্বিত করছে। জাতিসংঘের বিশ্ব পানি উন্নয়ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সেচের পানির ৮৬ শতাংশ ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হয়। সেচের ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে দেশগুলোর শীর্ষ পাঁচে রয়েছে বাংলাদেশ।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এমএ সাত্তার মন্ডল এ প্রতিবেদক’কে বলেন, আজকাল বিজ্ঞানীদের অনেকে বলছেন, এই পৃথিবী হয়তো টিকবে না, ধ্বংস হয়ে যাবে। এর একটি প্রধান কারণ হতে পারে জলবায়ুর পরিবর্তন। এটা তো ঠিক, যদি ২০৫০ সালের মধ্যে আমরা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারি, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের ধারা রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর অবধারিত পরিণতি পৃথিবীর মৃত্যু। প্রাণের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাঁর জোর দাবী- “একটি মাত্র পৃথিবী, মহাবিশ্বে কোটি কোটি ছায়াপথ, আমাদের ছায়াপথেও আছে কোটি কোটি গ্রহ, কিন্তু ‘পৃথিবী’ আছে শুধু একটি। আসুন সবাই মিলে এর যত্ন নিই”।
নি- ০৩/০৯


