আজ সোমবার, ডিসেম্বর ১, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

সৈয়দ এ. এফ. এম. মঞ্জুর-এ-খোদা

(গত সপ্তাহের পর)

সংস্কার কার্যক্রম
মসজিদে নববি নির্মাণের পর থেকে আজ অবধি বহুবার এর সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে নিম্নে উল্লেখযোগ্য সংস্কার ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের বিবরণ উপস্থাপন করা হলো-

১ম সংস্কার
উদ্যোগ গ্রহণকারী: হযরত রাসুল (সা.)
সময়: ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ (২ হিজরি)
বিবরণ: ২য় হিজরির রজব মতান্তরে শাবান মাসে (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে) হযরত রাসুল (সা.) মহান আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কেব্লা পরিবর্তনের নির্দেশ পান। তখন মসজিদে নববি অনেকটা নতুন করে নির্মাণ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। অতঃপর মসজিদটির কেব্লা উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ পবিত্র কাবা শরীফের দিকে পরিবর্তন করা হয়। এসময় কেবলার ছাদ এবং নামাজের স্থানউভয়ই উত্তর থেকে দক্ষিণে স্থানান্তর করা হয়। কেবলা নির্দেশক পাথরটি দক্ষিণ দেওয়ালে স্থাপন করা হয়। আহলে সুফফাকে উত্তর দিকে এবং মসজিদের প্রধান দরজা দক্ষিণ থেকে উত্তরে স্থানান্তর করা হয়। ফলে দক্ষিণের দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই সংস্কারের কারণে প্রায় ১৫ দিন এখানে নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়নি। এমতাবস্থায় নামাজ আদায় করা হতো হযরত রাসুল (সা.)-এর হুজরা শরীফেরপাশে অবস্থিত ‘আয়েশা/মোহাজেরিন’ নামক স্তম্ভের পিছনে।
২য় সংস্কার
উদ্যোগ গ্রহণকারী: হযরত রাসুল (সা.)
সময়: ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দ (৭ হিজরি)
বিবরণ:হযরত রাসুল (সা.) খায়বার যুদ্ধের পরপর হিজরি ৭ সালে (৬২৯ খ্রিষ্টাব্দ) এই মসজিদেরপ্রথম সম্প্রসারণ করেছিলেন। তখন মসজিদেরদৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ ফুট বাড়িয়ে প্রায় ১৬৫ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ৬৫ ফুট বাড়িয়ে প্রায়১৬৫ ফুটকরা হয়। ফলে মসজিদের আয়তনদাঁড়ায় প্রায় ২৭,২২৫ বর্গফুট (১৬৫ফুট১৬৫ ফুট)।তখন মসজিদের পশ্চিম সীমানা দেওয়াল মিম্বর থেকে ৫ কলাম দূরে ছিল।নতুন দেওয়ালের ভিত্তি পাথর দিয়ে এবং দেওয়ালগুলো পূর্বের মতো রোদেপোড়া কাঁচা ইট দিয়ে নির্মিত হয়।সম্প্রসারণ কাজের সময়ও হযরত রাসুল (সা.) নিজে ইট বহন করে সাহাবিদেরকে সাহায্য করেছেন।মসজিদের স্তম্ভগুলো খেজুর গাছ দ্বারা নির্মাণ করা হয় এবং ছাদ খেজুর পাতা দ্বারা আচ্ছাাদিত করা হয়। ১ম সম্প্রসারণের জমিটি হযরত উসমান (রা.) এক আনসার থেকে ক্রয় করেছিলেন। তিনি আল্লাহ্র রাসুল (সা.)-এর নিকট এসে আরজ করলেন, যেন জান্নাতের একটি গৃহের বিনিময়ে তার এই জায়গাটি হযরত রাসুল (সা.) ক্রয় করেন।

উল্লেখ্য যে, মসজিদে নববি সংলগ্ন হযরত হারেস ইবন নোমান আনসারি (রা.)-এর একটি বাড়ি ছিল। তিনি এই বাড়িটি হযরতরাসুল (সা.)-কে উপহার স্বরূপ প্রদান করেন। উক্ত স্থানে হযরত রাসুল (সা.)-এর পরিবারের সদস্যদের বসবাসের জন্য পূর্বের ২টি কক্ষের সাথে নতুন করে আরো ৭টি কক্ষ যুক্ত করে মোট ৯টি কক্ষে উন্নীত করা হয়। নবিনন্দিনীহযরত ফাতেমা (রা.)-এর হুজরা শরীফ ছিল হযরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরা শরীফের বরাবর। দুটি হুজরা শরীফের মধ্যবর্তী দেওয়ালে এক কপাট বিশিষ্ট একটি কাঠের দরজা ছিল। হযরত রাসুল (সা.) যখনি হুজরা শরিফে প্রবেশ করতেন; সর্বপ্রথম হযরত ফাতেমা (রা.)-এর গৃহে প্রবেশ করেহযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াহজহাহু, হযরত ফাতেমা (রা.), হযরত ইমাম হাসান (রা.) এবং হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সাথে কুশল বিনিময় করতেন। কখনও কখনও হযরত আলী (কা.) নিজ হাতে খাবার প্রস্তুত করে দয়াল রাসুল (সা.)-এর খেদমতে পেশ করতেন। আহার শেষে হযরত রাসুল (সা.)হযরত মা আয়েশা (রা.)-এর গৃহে প্রবেশ করতেন।পরবর্তীতে এই দুইহুজরা শরীফের মধ্যবর্তী দেওয়ালের দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। (জজবুল কুলুব, ওয়াফাহ আল ওয়াফাহ ১ম-খন্ড)

হযরত রাসুল (সা.) এর হুজরা শরীফগুলোর অবস্থান
হযরত রাসুল (সা.) এর প্রত্যেক সহধর্মিণীর সাথে অবস্থানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হুজরা শরীফ ছিল। এগুলো হলো
১. দক্ষিণ দিকে- হযরত মাসাওদা (রা.) এবং হযরত মা সাফিয়্যা (রা.)-এর হুজরা শরীফ।
২. উত্তর দিকে- হযরত মা উম্মে সালমা(রা.), হযরত মা উম্মে হাবিবা (রা.), হযরত মা জয়নব (রা.), হযরত মা জুয়াইরিয়্যা (রা.) এবং হযরত মা মাইমুনা (রা.)-এর হুজরা শরীফ।
৩. পূর্ব দিকে- হযরত মা আয়েশা (রা.) এবং হযরত মা মারিয়া (রা.)-এর হুজরা শরীফ।
সবগুলোহুজরা শরীফই ছিল মসজিদ অভিমুখী এবং প্রত্যেকটি হুজরা শরীফেই ইবাদতের জন্য আলাদা স্থান ছিল।
মিম্বর
প্রথমদিকে মসজিদে নববিতে মিম্বরের ব্যবস্থা ছিল না বিধায় হযরত রাসুল (সা.) মেহরাব সংলগ্ন পশ্চিম দিকে দাঁড়িয়ে খুৎবা প্রদান করতেন। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে খুৎবা প্রদান করার সময় তিনি মাঝে মাঝে সেখানে স্থাপিত খেজুর কাণ্ডের একটি খুঁটিতে হেলান দিতেন। একনাগাড়ে র্দীঘক্ষণ দাঁড়িয়ে খুৎবা প্রদান করা আল্লাহ্র রাসুল (সা.)-এর জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। তখন সাহাবিগণ হযরত রাসুল (সা.)-কে খুৎবা প্রদানের স্থানে একটি মিম্বর স্থাপন করার প্রস্তাব দিলেন। হযরত রাসুল (সা.) তাঁদের এই প্রস্তাবে সম্মত হন। আল্লাহ্র রাসুল (সা.) যখন মিম্বর তৈরির বিষয়ে সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করছিলেন, তখনতাঁর চাচা হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, “আমার গোলাম কিলাব ভালো কাঠ মিস্ত্রি, সে মিম্বর তৈরি করতে পারবে।” অতঃপর হযরত আব্বাস (রা.) কিলাব-কে জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে মিম্বর তৈরির আদেশ দেন। কিলাব তিন ধাপ বিশিষ্ট বর্গাকৃতির একটি মিম্বর তৈরি করেন। মিম্বরটির উচ্চতা ছিল ৩ ফুট এবং দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ছিল ১.৫ ফুট। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, আবিসিনীয় কাঠ মিস্ত্রি বাক্কুম মিম্বরটি তৈরি করেন। মিম্বরটি স্থাপন করা হয় ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে (৮ হিজরি)। হযরত রাসুল (সা.) মিম্বরের ৩য় ধাপে বসতেন এবং ২য় ধাপে কদম মোবারক রাখতেন।মিম্বর তৈরির পর হযরত রাসুল (সা.) দুই খুৎবার মাঝে একবার সেখানে বসে বিশ্রাম নিতেন।উল্লেখ্য যে,আমিরমুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (শাসনকাল: ৬৬১-৬৮০ খ্রি; ৪১-৬০ হি.) ৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে (৫০ হিজরি) হযরত রাসুল (সা.)-এর মিম্বরটি মদিনা থেকে সিরিয়ার দামেস্ক-এ সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই উদ্দেশ্যে যখন তিনি মিম্বরটি উত্তোলন করেন; ঠিক তখনি হঠাৎ সূর্যগ্রহণ আরম্ভ হয়, প্রবল বেগে বাতাস বইতে শুরু করে, আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে থাকে এবং ভূমিকম্প হতে থাকে। এর ফলে সবার মধ্যে ভীষণ আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। তখন মুয়াবিয়া বলেন, “মিম্বরকে মাটিতে খেয়ে ফেলেছে কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখাই আমার উদ্দেশ্য ছিল।” অতঃপর বিভিন্ন ব্যক্তির পরামর্শে তিনি এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। (হৃদয় তীর্থ মদিনার পথে,মূল: জজবুল-কুলুব ইলা দিয়ারিল মাহবুব, শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দেস দেহলভী (রহ.), অনুবাদ- মুহিউদ্দীন খান, পৃষ্ঠা-৭০)
আলোর ব্যবস্থা
প্রথম পর্যায়ে মসজিদে নববিতে খেজুর গাছের আঁশ বা ছালজ্বালিয়ে আলোর ব্যবস্থা করা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে ৯ম হিজরিতে হযরত তামিম আল-দ¦ারি (রা.) মসজিদে নববি-এর আলোর এই দুরবস্থা দেখে ফানুস (একপ্রকার হারিকেন জাতীয় ল্যাম্প)-এর ব্যবস্থা করেন। এর ফলে মসজিদের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত আলো সরবরাহ নিশ্চিত হয়। মসজিদে আলোর এই সুব্যবস্থা দেখে হযরত রাসুল (সা.) অত্যন্ত খুশি হন এবংহযরত তামিম আল দ্বারি (রা.)-কে বলেছিলেন, “আমাদের মসজিদ তুমি আলোকিত করলে, আল্লাহ্ তোমাকে আলোকিত করুন।”(স্মৃতি অমøান মদীনা মোনাওয়ারা, আবদুল কাইয়ুম আব্বাসী, পৃষ্ঠা ৮২)

হযরত রাসুল (সা.)-এর সময়কালের সম্মানিত স্তম্ভসমূহ
মসজিদে নববি-এর স্তম্ভগুলোর মধ্যে ৮টি স্তম্ভ বিভিন্ন তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার কারণে বিশেষ সম্মান লাভ করেছিল। নিম্নে এই ৮টি সম্মানিত স্তম্ভরাজির বর্ণনা দেওয়া হলো।

১. হান্নানাহ/মাখলুকস্তম্ভ: বর্তমানে এই স্তম্ভটি যেখানে রয়েছে সেখানে খেজুর গাছের একটি খুঁটি ছিল। মিম্বর স্থাপনের পূর্বে আল্লাহর রাসুল (সা.) সেই খুঁটিতে হেলান দিয়ে খুৎবা প্রদান করতেন। মিম্বর স্থাপনের পর যেদিন হযরত রাসুল (সা.) মিম্বরে বসে খুৎবা প্রদান করেন, সেদিন উক্ত খেজুর গাছটি হযরত রাসুল (সা.)-এর বিচ্ছেদ বেদনায় উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকে। খেজুর গাছটি এমনভাবে কাঁদছিল এবং কাঁপছিল যে, মনে হচ্ছিল এটি বুঝি ফেটে যাবে। নাসাই শরিফে হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, “খুঁটিটি বাচ্চা ছিনিয়ে নেওয়া উটনীর মতো কান্না আরম্ভ করে।” এই অবস্থা দেখে অনেকে ভয়ে দাঁড়িয়ে যান। তখন দয়াল রাসুল (সা.) খেজুর গাছটিকে আলিঙ্গন করে সেটির গায়ে হাত বুলিয়ে দেন। ফলে সাথে সাথে সেটির কান্না থেমে যায়।
অতঃপর হযরত রাসুল (সা.) গাছটিকে বললেন, “তুমি যদি বলো, আমি তোমাকে সেই স্থানে রোপণ করব, যেখানে তুমি ছিলে। তখন তুমি পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। অথবা আমি তোমাকে বেহেশতে রোপণ করতে পারি, তুমি সেখানকার নদী এবং ঝরনার পানি পান করতে পারবে। অতঃপর তুমি যখন ফলবতী হবে, তখন আল্লাহ্র বন্ধুগণ তোমার ফল গ্রহণ করবে।” (সুনান আল দারেমি শরীফ) খুঁটিটি বেহেশত পছন্দ করল। তখন দয়াল রাসুল (সা.)-এর নির্দেশে সেখানেই একটি গর্ত খুঁড়ে তাকে দাফন করা হলো।
এই প্রসঙ্গে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্্ (রা.) বলেন- “যখন জুমার দিন হলো, হযরত রাসুল (সা.) সেই তৈরি মিম্বরের উপরে বসলেন। সেসময় যে খেজুর গাছের উপর ভর দিয়ে তিনি খুৎবা দিতেন, সেটি এমনভাবে চিৎকার করে উঠল, যেন তা ফেটে পড়বে। হযরত রাসুল (সা.) নেমে এসে তাকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন। তখন সেটি ফোঁপাতে লাগল, যেমন ছোটো শিশুকে চুপ করানোর সময় ফোঁপায়। অবশেষে তা স্থির হয়ে গেল। হযরত রাসুল (সা.) বলেন, ‘খেজুর গাছটি কাঁদছিল, কারণ এটি মহান আল্লাহ্র স্মরণের নিকটবর্তী ছিল’।” (বোখারি শরীফ, ই.ফা.বা কর্তৃক অনূদিত, হাদিস নং ১৯৬৫)
খেজুর গাছটি বাচ্চা ছিনিয়ে নেওয়া উষ্ট্রীর মতো কান্না করছিল বিধায় এই স্তম্ভটিকে ‘হান্নানাহ’ স্তম্ভ বলা হয়। আরবি হান্নানাহ শব্দ দ্বারা উটের কান্না বুঝানো হয়। অপরদিকে ‘খালুক’ নামক একটি বিখ্যাত সুগন্ধি এই স্তম্ভটিতে লাগিয়ে রাখা হতো। এজন্য এই স্তম্ভটিকে মাখলুক স্তম্ভও বলা হয়। আরবি ‘খালুক’শব্দ থেকে মাখলুক শব্দের উৎপত্তি। এই স্তম্ভটি ‘মেহরাব-এ-নববি’-এর একটু পিছনে ডান দিকে অবস্থিত।
০২. আয়েশা স্তম্ভ:
মসজিদে নববি-এর ১ম সারির স্তম্ভরাজিতে তওবা স্তম্ভের ঠিক পরের স্তম্ভটি আয়েশা স্তম্ভ, যাকে ‘কোরাহ’ স্তম্ভ বা ‘মুহাজিরিন’ স্তম্ভও বলা হয় । মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর হযরত রাসুল (সা.) মক্কা থেকে আগত সকল মুহাজির সাহাবিকে নিয়ে এই স্থানে নামাজ আদায় করতেন এবংকেবলা পরিবর্তনের কারণে মসজিদে নববি-এর সংস্কারের সময়ও কিছুদিন হযরত রাসুল (সা.) সকলকে নিয়ে এই স্তম্ভের পিছনে নামাজ আদায় করেছেন। এছাড়াও মক্কা থেকে আগত মুহাজিরগণ এই স্থানেই নিয়মিত বসতেন। এজন্য একে ‘মুহাজিরিন স্তম্ভ’ বলা হয়।

আরবি ‘কোরাহ’ শব্দের অর্থ ‘ভাগ্য’। হযরত ইবনে জাবালাহ (রা.) বলেছেন, “আমরা জানতে পেরেছি যে, এই জায়গায় দোয়া কবুল হয়।”(ওয়াফাহ-আল-ওয়াফাহ, ২য় খণ্ড; নূরুদ্দিন সামহুদি)। তাবারানি তার আল-মুজাম আল-আওসাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,“হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, হযরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার মসজিদে এমন একটি স্থান আছে, লোকেরা এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য জানলে সেখানে নামাজ আদায়ের জন্য লটারির ব্যবস্থা করবে’।” তখন উপস্থিত সাহাবিগণ হযরত আয়েশা (রা.)-কে ঐ স্থানটির ব্যপারে জানানোর অনুরোধ করলে তিনি নীরব থাকেন। অতঃপর শুধু হযরত আয়েশা (রা.)-এর ভাগ্নে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) ব্যতীত সকলে হুজরা শরীফ থেকে বের হয়ে আসেন। এর কিছুক্ষণ পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)হযরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরা শরীফ হতে বের হয়ে আসেন এবং মুহাজিরিন স্তম্ভের পাশে নামাজ আদায় করেন। ফলে সকলে ধরে নেন যে, এই স্থানটিই হযরত রাসুল (সা.) বর্ণিত সেই ফজিলতপূর্ণ স্থান।পরবর্তীতে হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উসমান (রা.), হযরত আমির বিন আবদুল্লাহ (রা.)-সহ অনেক সাহাবিই সেখানে নামাজ আদায় করতেন। হযরত আয়েশা (রা.)-এর দ্বারা উক্ত স্তম্ভের গোপনীয়তা প্রকাশিত হওয়ায় পরবর্তীতে এই স্তম্ভটির নামকরণ করা হয় ‘আয়েশা স্তম্ভ’।

০৩. তওবা স্তম্ভ: এটি ‘লুবাবা’ স্তম্ভ নামেও পরিচিত। এটি মিম্বর থেকে ৪র্থ এবং হযরত রাসুল (সা.)-এর কক্ষ থেকে ২য় স্তম্ভ যা রিয়াজুল জান্নাত-এর মধ্যে অবস্থিত। এক আনসার গোত্রপতি হযরত আবু লুবাবা (রা.) নিজের ( )একটি ভুলের শাস্তি হিসেবে এই খুঁটিতে নিজেকে বেঁধে বলেছিলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্র রাসুল (সা.) নিজে না খুলে দেবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এর সঙ্গে বাঁধা থাকব।” হযরত রাসুল (সা.) তখন বলেছিলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে আল্লাহ আদেশ না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত খুলব না।” তখন তিনি কান্নাকাটি করে তওবা করতে থাকেন। এভাবে ৭ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁর তওবা কবুল হয়। অতঃপর হযরত রাসুল (সা.) নিজ হাত মোবারকে তাঁর বাঁধন খুলে দেন এবং তাঁকে ক্ষমা করে দেন। তাই এই স্তম্ভকে তওবা কবুলের স্তম্ভ বলা হয়।

০৪. আস-সারির স্তম্ভ: এই স্তম্ভটি তওবা স্তম্ভের সাথে অবস্থিত। হযরত রাসুল (সা.) এই স্তম্ভের নিকটে বসে মোরাকাবা করতেন। তিনি মাঝে মাঝে এখানে মাদুর পেতে বিশ্রাম নিতেন। মাদুর-এর আরবি প্রতিশব্দ সারির। তাই এই স্তম্ভটিকে আস সারির স্তম্ভ বলা হয়।

০৫. আলী স্তম্ভ/হারাস স্তম্ভ:সারির স্তম্ভের ঠিক পিছনে উত্তর দিকে উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরা শরীফের দরজার সামনেই এই স্তম্ভটি অবস্থিত। এই দরজা দিয়েই হযরত রাসুল (সা.) তাঁর হুজরা শরীফ থেকে মসজিদে নববিতে প্রবেশ করতেন। শেরে খোদা হযরত আলী (কা.) প্রায় সর্বদাই এই স্তম্ভের নিকট দাঁড়িয়ে হযরত রাসুল (সা.)-কে পাহারা দিতেন, যেন বাইরের কোনো শত্রু তাঁকে আক্রমণ করতে না পারে। আরবি ‘হারাস’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘পাহারা’। তাই এই স্তম্ভটিকে হারাস স্তম্ভ বলা হয়। তাছাড়া শেরে খোদা হযরত আলী (কা.)-এর সম্মানে এই স্তম্ভটিকে আলী স্তম্ভও বলা হয়ে থাকে।

০৬. ওফুদ স্তম্ভ: আরবি ‘ওফুদ’শব্দের বাংলা অর্থ প্রতিনিধি। এটি আলী স্তম্ভের উত্তরে অবস্থিত। হযরত রাসুল (সা.)-এর কাছে কেউ দেখা করতে আসলে বা কোনো প্রতিনিধি দল ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে আসলে তিনি দয়া করে এখানে সাক্ষাত দিতেন। বহু গোত্র এখানে ইসলাম গ্রহণ করেছে।

০৭. মারবা-আতুল বাইর স্তম্ভ: ‘মারবা-আতুল বাইর’ অর্থ সমাধির বর্গ। বর্তমানে এই স্তম্ভটি হযরত রাসুল (সা.)-এর রওজা মোবারকের চার দেওয়ালের ভিতরে পরেছে বিধায় একে মারবা-আতুল বাইর স্তম্ভ বলা হয়।

০৮. তাহাজ্জুদ স্তম্ভ: এই স্তম্ভটি হযরত মা ফাতেমা (রা.)-এর হুজরা শরীফের পিছনে স্থাপিত। এই কলামটির পিছনে হযরত রাসুল (সা.) প্রতি রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। তাই এটিকে তাহাজ্জুদের স্তম্ভবলা হয়। (চলবে)

 

সৈয়দ এ. এফ. এম. মঞ্জুর-এ-খোদা : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Exit mobile version