
.
বাংলাদেশের নির্বাচন পরিচালনার কোন স্থানে বাংলাদেশ পুলিশের আনুষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতা নেই। সংবিধান অনুসারে নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। কমিশনই নিয়োগ করে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার। এরা নির্বাচনের পূর্ব, মধ্য ও পরবর্তী সকল কাজই করেন। তাদের দ্বারাই নিয়োগপ্রাপ্ত হন প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারগণ। তাই তারাও পরিপূর্ণভাবে রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের সরাসরি অধীনে।
ভোটকেন্দ্র তাদেরই নিয়ন্ত্রণ, তত্বাধান ও পরিচালনায় থাকেন। তাই নির্বাচনের কেন্দ্রের ভিতর কি হচ্ছে তা তারাই জানে, বোঝেন ও উপলব্ধি করেন।
পুলিশ নির্বাচনকালীন আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে। তাদের সাথে নিয়োজিত থাকে আনসার বাহিনী ও প্রয়োজন মতো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ যাদেরও ভূমিকা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার। পুলিশ ভোট গ্রহণ, বর্জন কিংবা কারচুপি বা ইন্জিনিয়ারিং করারও কেউ নয়, ঠেকানোরও কেউ নয়।
তাই কেউ যদি দাবী করেন, বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচন জনগণের প্রত্যাশামত অনুষ্ঠান করতে না পারার দায় পুলিশের, তবে তারা অসত্য বলেন, উদোরপিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপান। যদি নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং সরকারি কর্মচারীদের আনুকুল্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য গণকর্মচারীদের মধ্যে পুলিশেকে অভিযুক্ত করাও হয়, তবে পুলিশের ভূমিকা কেবল সহযোগীর; মূখ্য কর্তা নয়।
একটি নির্বাচন কেন্দ্রের ভিতর কি হচ্ছে, না হচ্ছে, তার খবর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের সরাসরি জানার সুযোগ নেই। যদি সেখানে তুমুল হট্টগোল হয় কিংবা নির্বাচনের কাজে সংশ্লিষ্টরা পুলিশকে কোন কারণে ডাকেন, তবেই পুলিশের নির্বাচন কেন্দ্রে প্রবেশের সুযোগ ঘটে। এ ছাড়া পুলিশের স্থান বরাবরের মতোই রাস্তায়, দরোজার বাইরে, ভিতরে নয়।
নির্বাচন কারচুপির জন্য ক্ষমতাসীন দল যখন ইন্জিনিয়ারিং কৌশল অবলম্বন করে, তখন তাদের মাথায় থাকে রিটার্নিং অফিসারদের কথা। পুলিশের কথা তাদের মাথায় নেয়ার কোন কারণই নেই। কারণ ফলাফল ওলট-পালট করার ঘটনা কেবল রিটার্নিং অফিসার ও তার ঘনিষ্ঠরাই করতে পারে।
২০১৪ সালে হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রায় সব নেতাই মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও রিটার্নিং অফিসারগণ তাদের সেই সুযোগও দেননি। এমনকি মনোনয়পত্র জমা না দিয়েই নির্বাচিত হয়েছিলেন জাতীয় পার্টির অনেক নেতা।
অন্যদিকে ২০১৮ সালের নির্বাচনে রিটার্নি অফিসারগণ বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলের নেতাদের একের পর এক হাস্যকর কারণে মনোনয়ন পত্র বাতিল করতে থাকে। ফলে নির্বাচনের সপ্তাহকাল আগেও বিএনপির ভোটারগণ তাদের প্রতীকের প্রার্থী কে, তা নিয়েই বিভ্রান্তিতে পড়েছিল। রিটার্নিং অফিসারদের কাস্টডিতে থাকা বেলট কিভাবে আগের রাতে নিঃশেষ হল, তাও তাদেরই জানার কথা, তাদেরই জবাব দেয়ার কথা; পুলিশ বা অন্যকোন শৃঙ্খলা বাহিনী নয়।
স্থানীয় পরিষদের নির্বাচনগুলোর অবস্থা আরও ভয়ংকর ছিল। বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে খোদ সরকারি দলের প্রার্থীগণই ভোট দেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ব্যালট পেপার পাননি। কারণ রিটার্নিং অফিসাদের সহযোগিতায় ভোট শুরুর আগেই সব ব্যালট বাক্সে ঢুকানো হয়েছিল। জিজ্ঞাস করুন সেই সময়ের বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারকে।
আমার এলাকায় এক বৃদ্ধ ভোটার বললেন, বাবা ভালই ভোট হয়েছে। তবে দুপুর বেলা খাবারের বিরতিটা বেশিক্ষণ ছিল। গ্রামে-গঞ্জে ব্যালট পেপারের অভাবে প্রিজাইডিং অফিসারগণ জনরোষ থেকে বাঁচার জন্য এভাবে দুপুরের খাবারের জন্য মধ্যাহ্ন বিরতি দিয়েছিলেন। এবার বলুন, এই বিরতি প্রদানে পুলিশের ভূমিকা কি ছিল?
কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও এখানে আমরা পাকিস্তান আমলের আইয়ুবের সামরিক শাসনকালে অনুষ্ঠিত ১৯৭০ সালের নির্বাচনের কথা বলতে পারি। এ নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার (পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি)। বিচারপতি সাত্তার সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে আইয়ুবের সামরিক সরকার আওয়ামী লীগকে হারাতে রিটার্নিং অফিসারদেরই ব্যবহার করবে।
তাই তিনি জেলার ডিসিদের পরিবর্তে জেলা জজদের রিটানিং অফিসারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আর এ ভূখণ্ডে এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত যে নির্বাচনটিকে নিয়ে সরকার, বিরোধীদল কেউই প্রশ্ন তুলতে পারেনি, সেটা ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচন।
এ কথা অনস্বীকার্য যে হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকেই পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছিল। এই ধ্বংসের হাত থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসনের আমলা কিংবা বিচারবিভাগের প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত কেউই রেহাই পায়নি। অতিশয় আগ্রহে হোক কিংবা চাকরি বাঁচানোর তাগিদেই হোক গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রই গত ১৬ বছর স্বৈরাচারের সহযোগী ছিল।
ষোল বছর লাঙের ঘরে রাত কাটিয়ে সব দায় পুলিশের উপর চাপিয়ে কোন সরকারি কর্মচারীর নিজেদের সতী প্রমাণের চেষ্টাকে কি নামে ডাকব আমরা ? আজন্ম পঙ্কেপুষ্ট হয়েও আপনারা পঙ্কজ; পুলিশ অচ্ছুত, দলিত দূর্বা।

