
২০২৭ তথা নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই দিতে পাঠ্যপুস্তক ছাপার কাজ প্রায় শেষের দিকে। ডিসেম্বর নাগাদ শিক্ষার্থীদের হাতে এসব পাঠ্যবই পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাথমিকভাবে এই তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪ ডিসেম্বর। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রণীত কারিকুলাম অনুযায়ী বইগুলো প্রস্তুত করা হলেও এ বছর শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশে আগের তুলনায় কিছুটা পরিবর্তন ও পরিমার্জন আনা হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকারের সময়ে পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা নিয়ে বর্ণনা তিন ধরনের হলো।
বিষয়টি অনুসন্ধানে প্রাথমিকের সবকটি বই ঘেঁটে দেখেছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। এতে দেখা গেছে, বইগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার গল্প শুরু হয়েছে তৃতীয় শ্রেণির বই থেকে। এরপর মুক্তিযুদ্ধের নানা ধাপ বিভিন্ন শ্রেণির বইয়ে যুক্ত হয়েছে। এর আগেও তৃতীয় শ্রেণি থেকেই ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বই থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস পড়ানো হত। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির তিনটি বইয়ে যথাক্রমে ‘আমাদের ইতিহাস’, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি’ ও ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’ নামে অধ্যায় রাখা হয়েছে। এসব অধ্যায়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটসহ এর বিভিন্ন মৌলিক বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবে। পাঠ্যবই পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।
শিক্ষা ও প্রাথমিক মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০২৮ সালে নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক রচনা করা হবে। এর আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২১ সালে প্রণীত কারিকুলাম অনুযায়ী পাঠদানের সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। ২০২৭ সালের পাঠ্যবইগুলো ওই কারিকুলাম অনুসারে ছাপা হলেও তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বেশ কিছু পরিমার্জন, সংযোজন ও বিয়োজন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এসব বইয়ে পরিমার্জিত অধ্যায়গুলোর মধ্যে বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ।
নতুন বছরের প্রকাশিত বই ঘেঁটে দেখা গেছে, এ বছর ৫ম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এর আগে প্রথমবারের মতো ১৯৯৩ সালের পরিবেশ পরিচিতি (সমাজ) বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে মেজর জিয়াউর রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে ২০০৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১২ সালের নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠ্যবই পরিমার্জন করা হয়। ওই সময় পাঠ্যবই থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণার বিবরণ এবং তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক তা পাঠ্যবইয়ে না থাকার পর ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে আবারও তাঁর নামে একটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হচ্ছে।
জিয়াউর রহমানের পাশাপাশি এবার বেগম খালেদা জিয়ার নামেও একটি পাঠ যুক্ত করা হয়েছে ৫ম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে’। পাঠটিতে বেগম জিয়ার জন্মস্থান, বেড়ে ওঠা, রাজনীতিতে আগমন, সরকার গঠন, শিক্ষাঙ্গনে তার অবদানসহ নানা বিষয়ে তার সম্পর্কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পঞ্চম শ্রেণির এই বইটিতে ‘স্মরণীয়-বরণীয় নেতা’ অংশে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নামে দুটি অধ্যায় যুক্ত করার পাশাপাশি শেখ মুজিবুর রহমানের অংশে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। অনুচ্ছেদের প্রথম বাক্যই শুরু হয়েছে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান’ লেখা দিয়ে; যা ২০২৬ সালের বইয়ে ছিল না। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে নতুন করে এ লাইনটি যুক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের বইটিতে দ্বিতীয় প্যারায় বলা হয়েছিল, ‘ভারতবর্ষ বিভক্তির পর শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হন।’ ২০২৭ সালে সেখানে লেখা হয়েছে— ‘১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হন।’ এখানে ‘ভারতবর্ষ বিভক্তির পর’-এর পরিবর্তে ‘১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর’ যুক্ত করা হয়েছে।
২০২৬ ও ২০২৭ সালের বই; ৫ম শ্রেণির তুলনামূলক চিত্র
তৃতীয় শ্রেণির ‘আমাদের ইতিহাস’
তৃতীয় শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ে মোট ১২টি অধ্যায় রয়েছে। বইটির তৃতীয় অধ্যায়ে ‘আমাদের ইতিহাস’ নামে একটি পাঠ রয়েছে। এতে ‘ভাষা আন্দোলন’, ‘শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’, ‘আমাদের স্বাধীনতা দিবস’ এবং ‘আমাদের বিজয় দিবস’ নামে পৃথক ৪টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। অনুচ্ছেদগুলোতে ১৯৪৭-এর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পরবর্তী ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবস পর্যন্ত ইতিহাসের চুম্বকাংশ তুলে ধরা হয়েছে। সাথে বেশ কিছু রঙিন ছবিও রয়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের।
অধ্যায়ের ‘আমাদের স্বাধীনতা দিবস’ নামের তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— ‘পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে শোষণ করতে থাকে। প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। এ ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এরপর ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে এদেশের ছাত্র, শিক্ষক, পুলিশ, ইপিআর সদস্য ও সাধারণ মানুষকে। তাই ২৫শে মার্চকে আমরা কালরাত বলি।
২৬শে মার্চ ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন। এইদিন থেকেই শুরু হয় পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। পরদিন ২৭শে মার্চ পুনরায় চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করি। ২৬শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল বলে এই দিবসটি আমাদের ‘স্বাধীনতা দিবস’। এ দিবসটি আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় শ্রেণির ২০২৬ ও ২০২৭ সালের একই অনুচ্ছেদের তুলনামূলক চিত্র
২০২৬ ও ২০২৭ সালের তৃতীয় শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইটির তৃতীয় অধ্যায় যাচাই করে দেখা যায়, নতুন শিক্ষবর্ষে অধ্যায়টির তৃতীয় অনুচ্ছেদে একটি লাইন পরিমার্জন করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি ছবি ও লাইন সংযুক্ত করা হয়েছে।
২০২৬ সালের বইয়ে একই অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় প্যারায় ‘২৬ মার্চ তারিখে মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন’— এই লাইনটি থাকলেও নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে তা পরিমার্জন করে ‘২৬শে মার্চ ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন’ লেখা হয়েছে। পাশাপাশি ‘পরদিন ২৭ শে মার্চ পুনরায় চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে’— লেখাটি সংযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়াও অনুচ্ছেদটিতে ৩টি ছবি থাকলেও নতুন করে ‘২৫ শে মার্চ ১৯৭১’ ক্যাপশনসহ আরেকটি ছবি যুক্ত করা হয়েছে।
২০২৬ ও ২০২৭ সালের তৃতীয় শ্রেণির বইয়ে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত বিভিন্ন ছবি
এদিকে অধ্যায়টির ‘আমাদের বিজয় দিবস’ নামের চতুর্থ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ১০ই এপ্রিল তৈরি হয় ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’। ১৭ই এপ্রিল প্রথম গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার। এ সরকার মুজিবনগর সরকার, অস্থায়ী সরকার ও প্রবাসী সরকার নামেও পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের জন্য গঠন করা হয় ‘মুক্তিবাহিনী’। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ। অসীম সাহসে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যায়। প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশ আমাদেরকে সহযোগিতা করে। প্রায় নয় মাস ধরে মুক্তিযুদ্ধ চলে। পাকিস্তানি বাহিনী অবশেষে হার মানতে বাধ্য হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তারা আত্মসমর্পণ করে।’
এদিকে ২০২৬ সালের পাঠ্যবইটির একই অনুচ্ছেদে ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম’— লেখা ছিল। নতুন শিক্ষাবর্ষে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ শব্দের পরিবর্তে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি লেখা হয়েছে।
২০২৬ সালে লেখা ছিল— ‘১০ এপ্রিল ১৯৭১ গঠন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার।’ ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে লেখা হয়েছে— ‘১০ই এপ্রিল তৈরি হয় ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’। ১৭ই এপ্রিল প্রথম গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার।’
২০২৬ সালে লেখা ছিল— ‘এ সরকার মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করা হয়।’ ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে লেখা হয়েছে— ‘এ সরকার মুজিবনগর সরকার, অস্থায়ী সরকার ও প্রবাসী সরকার নামেও পরিচিত।’
এদিকে ২০২৬ সালে অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় প্যারায় লেখা হয়েছে— ‘ভারতসহ কিছু রাষ্ট্র আমাদেরকে সহযোগিতা করে।’ ২৭ সালে লেখা হয়েছে— ‘প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশ আমাদেরকে সহযোগিতা করে।’ এখানে ভারতসহ কিছু রাষ্ট্রের পরিবর্তে ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়াও ২৬ সালে লেখা হয়েছে— ‘বিজয়ের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি স্বাধীন দেশ, একটি মানচিত্র, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত ও আমাদের অধিকার। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস।’ ২৭ সালে লেখা হয়— ‘লাখো প্রাণের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন দেশ, একটি মানচিত্র, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত। ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস।’ এখানে ‘লাখো প্রাণ’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে।
চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি’
চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে মোট ১৪টি অধ্যায় রয়েছে। বইটির পঞ্চম অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি’ নামে একটি পাঠ রয়েছে। ‘পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য এবং ছয় দফা, ১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭০ সালের নির্বাচন’ নামে দুই অনুচ্ছেদের এই অধ্যায়টিতে ব্রিটিশদের ভারতবর্ষে শাসন-শোষণ, ভারত-পাকিস্তান নামে দুটি নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা, ১৯৪৮ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ও পাকিস্তানের কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাষ্ট্রভাষা নিয়ে ঘোষণা, পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ, ভাষা আন্দোলনে চার শহিদ, তিন নেতার নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠন, পরবর্তীতে তিন নেতার সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানকে যুক্ত করে পাকিস্তানি বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনগণের সোচ্চার হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক পোস্টারটি এ বছর চতুর্থ শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হয়েছে
এ ছাড়াও ‘সোনার বাঙলা শ্মশান কেন?’ নামে মুক্তিযুদ্ধপূর্ববর্তী ঐতিহাসিক পোস্টারটির একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে চাল, আটা, সরিষা, উন্নয়ন, সামরিক বিভাগে চাকরিসহ ১০টি খাতের বৈষম্যের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে।
অধ্যায়টির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যূত্থান ও ১৯৭০ সালের নির্বাচন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং ৬৯-এর গণ-অভ্যূত্থানে শহিদ আসাদ, ড. শামসুজ্জোহা, সার্জেন্ট জহুরুল হক, শিশু মতিউরের শহিদ হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। দুই অনুচ্ছেদে নতুন শিক্ষাবর্ষের সঙ্গে চলতি শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে মৌলিক কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।
পঞ্চম শ্রেণির ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘স্মরণীয় বরণীয় নেতা’
পঞ্চম শ্রেণির চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকিস্তান আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতাপরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য নেতৃবৃন্দকে নিয়ে যথাক্রমে ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’ ও স্মরণীয় বরণীয় নেতা’ নামে দুটি অধ্যায় রয়েছে।
‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’ অধ্যায়টিতে ‘স্বাধীনতা ঘোষণার পটভূমি ও অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার’, ‘মুক্তিযুদ্ধের মুক্তিবাহিনী’, ‘মুক্তিযুদ্ধকালে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহের ভূমিকা’, ‘আমাদের বিজয়’, ‘জাতীয় দিবসসমূহ উদযাপন’ নামে ৫টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদে— ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬), ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যা, মেজর জিয়াউর রহমান, এমএজি ওসমানী, ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারীদের জন্য শরণার্থী শিবির, নিউইয়র্কে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ, রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ, মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণের বিজয় উল্লাস এবং খেতাবপ্রাপ্ত সাত বীরশ্রেষ্ঠসহ মোট ২৯টি ছবি রয়েছে। এসব ছবির কোনোটিতে ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে, আবার কোনটিতে দেওয়া হয়নি।
তবে ২০২৬ সালের পাঠ্যবইটির এই অধ্যায়ের প্রথম অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় থাকা মেজর জিয়াউর রহমানের ছবিতে ‘মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা’ ক্যাপশন দেওয়া থাকলেও ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের একই অনুচ্ছেদে থাকা ছবিতে শুধু ‘মেজর জিয়াউর রহমান’ লেখা রয়েছে।
২০২৬ ও ২০২৭ সালের বইয়ে একই অনুচ্ছেদের তুলনামূলক চিত্র
২০২৬ সালের পাঠ্যবইয়ে অধ্যায়টির তৃতীয় অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় তিনটি ছবি রয়েছে। পৃষ্ঠার প্রথম ছবির ক্যাপশন ছিল ‘যুবক্যাম্পের মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ, ভারত, ১৯৭১’ লেখা ছিল। ২০২৭ সালে একই পৃষ্ঠায় প্রথম ছবিটি পরিবর্তন করা হয়েছে, সে ছবির ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে ‘মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ, ভারত, ১৯৭১’।
এ ছাড়াও ২০২৭ সালের অধ্যায়টিতে ১৯৫২ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭০ সালের নির্বাচন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা-বর্ণনা এবং যুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে অনুচ্ছেদটিতে যেসব অংশ যোজন-বিয়োজন হয়েছে তা তুলে ধরা হলো—
২০২৬ সালের পাঠ্যবইয়ে ৫ম অধ্যায়ের প্রথম অনুচ্ছেদটির তৃতীয় প্যারায় ‘ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন’ লেখা ছিল। ২০২৭ সালের বইটিতে সেখানে ‘ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবের সঙ্গে সংকট নিরসনে আলোচনা শুরু করেন’ লেখা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে ‘সংকট নিরসনে’ শব্দটি যোগ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের বইয়ে ‘আলোচনার মধ্যেই ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে’ লেখা রয়েছে। ২০২৭ সালে এটিকে পরিবর্তন করে লেখা হয়েছে ‘নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ করে এবং ইতিহাসের এক নির্মম গণহত্যা পরিচালনা করে।’
‘অপারেশন সার্চলাইট শুরু হলে চট্টগ্রামে তৎকালীন ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ‘উই রিভোল্ট’ বলে প্রথম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এরপর রাত ২টা ১৫ মিনিটে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে সেনাসদস্য ও স্বাধীনতাকামী জনগণকে নিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। প্রথমে তিনি নিজের নামেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরবর্তী ঘোষণায় তিনি ‘শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে’ বাক্যটি যুক্ত করেন। এভাবেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।’—২০২৭ সালের পাঠ্যবইটিতে নতুন করে এই পাঁচটি লাইন যুক্ত করা হয়েছে, যা ২০২৬ সালে ছিল না।
২০২৬ ২০২৭ সালের ৫ম শ্রেণির বইয়ে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে পাঠ
২০২৬ সালে অনুচ্ছেদটির তৃতীয় প্যারায় যা ছিল, ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে যা বাদ দেওয়া হয়েছে
২০২৬ সালের বইয়ে— ‘বর্বর হামলা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, শিক্ষকদের বাসভবন, পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স, ইপিআর সদর দফতরসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। প্রতিরোধ গড়ে তুলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের সদস্যরা। এ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পুলিশ, ইপিআর সদস্যসহ নির্বিচারে সবার ওপর গণহত্যা চালায়।’ ২০২৭ সালের পাঠ্য বই থেকে এই অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের বইয়ে শুধু জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি উল্লেখ করে হলেও ২০২৭ সালের বইটিতে ঘোষণার পর যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে।
পঞ্চম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে ‘স্মরণীয় বরণীয় নেতা’ নামের একটি অধ্যায় রয়েছে। এতে ৬টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। পঞ্চম ও ৬ষ্ঠ অনুচ্ছেদে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া নামে দুটি অনুচ্ছেদের নামকরণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের একই বইয়ের অধ্যায়টিতে মেজর জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া নামে কোনো অনুচ্ছেদ ছিল না। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে নতুন করে অনুচ্ছেদ দুটি যুক্ত করা হয়েছে।
এই অধ্যায়টিতে এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানের নামে আরও ৪টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। অনুচ্ছেদগুলোতে তাদের সম্পর্কে মৌলিক ধারণা দেওয়া হয়েছে। তবে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ফরিদপুর জেলার তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।’ পাশাপাশি তার শিক্ষা জীবন, রাজনীতি ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের জয়লাভ, ১৯৭১ নিয়ে তার অবস্থান-বক্তব্য ও তার মৃত্যু নিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে কিছুটা সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে।
২০২৬ সালের অনুচ্ছেদ থেকে ২০২৭ সালে যা বাদ দেওয়া হয়েছে
২০২৬ সালের একই অধ্যায়ের ৪র্থ অনুচ্ছেদের তৃতীয় প্যারায় বলা হয়েছে— ‘শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি নিঃশর্ত মুক্তিলাভ করেন। পরদিন ২৩শে ফেব্রুয়ারি তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়।’ তবে ২০২৭ সালের বই থেকে ‘পরদিন ২৩শে ফেব্রুয়ারি তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়’— এই লাইনটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের বইয়ে লেখা ছিল— ‘এতে পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার জন্য উজ্জীবিত হয়। ২০২৭ সালে লেখা হয়েছে ‘এতে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার জন্য উজ্জীবিত হয়।’ ২০২৬ সালের বইয়ে লেখা ছিল— ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি নিজ দেশে ফিরে আসেন।’ ২০২৭ সালে লেখা হয়েছে— ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন।’
দীর্ঘ দেড় দশক পর পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছেন জিয়াউর রহমান
২০২৭ সালে যা নতুন যোগ করা হয়েছে
২০২৬ সালের একই অনুচ্ছেদের প্রথম প্যারায় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান’ লেখা ছিল না। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে নতুন করে এ লাইনটি যুক্ত করা হয়েছে।
২০২৬ সালের বইটিতে দ্বিতীয় প্যারায় বলা হয়েছিল, ‘ভারতবর্ষ বিভক্তির পর শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হন।’ ২০২৭ সালে সেখানে লেখা হয়েছে— ‘১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হন।’ এখানে ‘ভারতবর্ষ বিভক্তির পর’-এর পরিবর্তে ‘১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর’ যুক্ত করা হয়েছে।
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে ঢাকা থেকে আটক করে পাকিস্তানে কারাবন্দি করে রাখে। ২০২৭ সালে এই লাইনে ‘তাঁকে ঢাকা থেকে আটক করে’ এই তথ্যটি নতুন যোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের তারিখ হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে ‘তিনি ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন।’ এই বাক্যটি ২০২৭ সালের অনুচ্ছেদে নতুন যুক্ত করা হয়েছে।
প্রথমবারের মতো পাঠ্যবইয়ে বেগম খালেদা জিয়া
‘জিয়াউর রহমান’ নামের পঞ্চম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান ও রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ১৯৩৬ সালের ১৯শে জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।’ পাশাপাশি অ্যাকাডেমিক, কর্মজীবন, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ, নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঞ্জ রেজিমেন্টে সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনীতিতে আগমন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ, স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা ও ‘খাল খনন’ কর্মসূচিসহ তার সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া এই অধ্যায়ে প্রথমবারের মতো পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। পাঠটিতে বেগম জিয়ার জন্মস্থান, বেড়ে ওঠা, রাজনীতিতে আগমন, সরকার গঠন, শিক্ষাঙ্গনে তার অবদানসহ নানা বিষয়ে তার সম্পর্কে অন্তভুক্ত করা হয়েছে।
এনসিটিবির বক্তব্য
এনসিটিবির গবেষণা কর্মকর্তা মো. হাসানুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই পরিমার্জনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের (আইইআর) চারজন শিক্ষককে সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে তাঁরা এ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। পরে প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। বগুড়ায় দুটি এবং এনসিটিবিতে কয়েকটি কর্মশালার মাধ্যমে বই পরিমার্জনের কাজ সম্পন্ন হয়।
কমিটিগুলোকে মূলত ইতিহাসের কোনো বর্ণনায় প্রয়োজনীয় সংশোধন, তথ্যগত অস্পষ্টতা বা ভুল তথ্য থাকলে তা ঠিক করা এবং শিক্ষার্থীদের বয়স ও উপযোগিতা বিবেচনায় বিষয়বস্তু আরও সহজ ও স্পষ্ট করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী ছবি ও মানচিত্র পরিবর্তনের বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হয়। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে ইতিহাস, ভূগোল, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির মতো বিভিন্ন বিষয় থাকায় প্রতিটি উপবিষয়ের জন্য পৃথক বিশেষজ্ঞ প্যানেল কাজ করেছে।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে বড় পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের স্মরণীয় নেতা’ শিরোনাম পরিবর্তন করে ‘স্মরণীয়-বরণীয় যারা’ করা হয়েছে। আগের বইয়ে এ অধ্যায়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এ কে ফজলুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমানের সংক্ষিপ্ত জীবনী ছিল। নতুন সংস্করণে তাদের সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার জীবনী যুক্ত করা হয়েছে।
এ দুটি বিষয়ই বইয়ের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এ ছাড়া অন্যান্য পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে বানান সংশোধন, তথ্য আরও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন, অস্পষ্ট ছবি পরিবর্তন এবং ভূগোলের কিছু মানচিত্র উন্নত করা। এ ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের সহযোগিতায় কিছু নতুন মানচিত্রও তৈরি করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্বাধীনতার ঘোষণাসংক্রান্ত বর্ণনায় পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, স্বাধীনতার বর্ণনা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা আগের সংস্করণেও ছিল। স্বাধীনতার ঘোষকসংক্রান্ত বর্ণনায় গত বছরই পরিবর্তন আনা হয়েছিল। চলতি পরিমার্জনে বিষয়টি আরও সংশোধন করা হয়েছে। বগুড়ার কর্মশালার পর ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ইতিহাসের অংশ পর্যালোচনার জন্য আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়।
তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক নাসিরসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এ কমিটিতে ছিলেন। তারা শুধু পঞ্চম শ্রেণির বই নয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের বর্ণনাগুলো পর্যালোচনা করেন। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের পক্ষ থেকেও কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়। উচ্চপর্যায়ের কমিটির পর্যালোচনার ভিত্তিতেই বইগুলোতে ইতিহাসের বর্ণনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, উচ্চপর্যায়ের কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকে ‘স্মরণীয়-বরণীয় যারা’ অধ্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘স্বাধীনতার অন্যতম স্থপতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এনসিটিবি থেকে ‘অন্যতম স্থপতি’ শব্দটা যোগ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞ প্যানেল নাকি অন্য কোনো টিম পরিবর্তন করেছে, তা সঠিকভাবে বলতে পারছি না।
‘আমাদের স্মরণীয় নেতা’ শিরোনাম পরিবর্তন করে ‘স্মরণীয়-বরণীয় নেতা’ করা হয়েছে। আগের বইয়ে এ অধ্যায়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এ কে ফজলুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমানের সংক্ষিপ্ত জীবনী ছিল। নতুন সংস্করণে তাদের সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার জীবনী যুক্ত করা হয়েছে।
এনসিটিবির তৃতীয় শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ের গবেষণা কর্মকর্তা মো. সোহানুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির পর এনসিটিবিতে দায়িত্ব পাওয়ার পর তৃতীয় শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইটির পরিমার্জন-সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারি।
বইগুলো পরিমার্জনের জন্য প্রথমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের (আইইআর) চারজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, অধ্যাপক নূর আলম সিদ্দিকী, অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ ও অধ্যাপক হাফিজুর রহমান। তাদের নেতৃত্বে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবই পরিমার্জনের জন্য বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ও লেখক প্যানেলের তালিকা তৈরি করা হয়। ২০ জনের একটি লেখক প্যানেল (বিশেষজ্ঞ) ছিল।
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে দুই থেকে তিনটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা তাদের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পাঠ্যবইয়ে যেসব পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেছেন, সেগুলো সুপারিশ করেন। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতেই বইগুলো পরিমার্জন করা হয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণির বইয়ে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ইতিহাস অধ্যায়ে সামান্য কিছু পরিমার্জন করা হয়েছে। এ ছাড়া বানান ভুল, প্রশ্নের সঙ্গে অসংগতি এবং এ ধরনের ছোটখাটো কিছু সংশোধন করা হয়েছে।
২০২৬ সালের বইয়ে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, ২০২৭ সালের বইয়েও সেগুলো মোটামুটি একইভাবে রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী দু-একটি লাইন বা বাক্যে সামান্য পরিবর্তন এসেছে। তবে তৃতীয় শ্রেণির বইয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন নেই।
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সব পাঠ্যবই পরিমার্জনের ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন অধ্যাপক পুরো কার্যক্রমের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে, বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ও লেখক প্যানেল বইগুলোর পরিমার্জনের বিষয়ে সুপারিশ তৈরি করেছেন। তাদের তৈরি করা প্রতিবেদন অনুযায়ী এনসিটিবি বইগুলোর ডিজাইন ও বিষয়বস্তুতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এসেছে।”
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। বিষয়টি জানিয়ে ম্যাসেজ করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি

