
জ্বালানি সংকটে গত মাসে বিদ্যুৎ সংকট চরম আকার ধারণ করে। এ সময় গড়ে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।
রাতের পাশাপাশি দিনেও উচ্চহারে লোডশেডিং ছিল নিয়মিত ঘটনা। অথচ এ সময় সৌরবিদ্যুৎ থেকে খুব একটা সহায়তা পাওয়া যায়নি। জাতীয় গ্রিডে দিনে সর্বোচ্চ ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এসেছে। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স বাতিল করে গেছে।
জাতীয় অর্থনীতির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
জাতীয় অর্থনীতির প্রতিবেদনে বলা হয়, দায়মুক্তির আইনের আওতায় লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, এমন যুক্তিতে দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর লাইসেন্স বাতিল করা হয়। তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বিদ্যুৎ বিভাগের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পাইপলাইনে থাকা সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের ৩৭টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করা হয়েছিল।
এগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট।
যদিও বেসরকারি খাতে এলওআই (লেটার অব ইনটেন্ট) বা প্রাথমিক অনুমতিপত্র ইস্যুকৃত কেন্দ্রগুলোর লাইসেন্স ফেরত পেতে নানা জায়গায় ধরণা দেয় বিনিয়োগকারী দেশি-বিদেশি কম্পানিগুলো। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। বরং ইউনূস সরকার এগুলোর পরিবর্তে নতুন করে ৫৫টি গ্রিড-সংযুক্ত সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরপত্র আহ্বান করে। ৫ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াটের জন্য দরপত্র আহ্বান করেও তেমন কোনো সাড়াই পাওয়া যায়নি।
১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্র জমা পড়ে, যেগুলোর সক্ষমতা ছিল মাত্র ৯০০ মেগাওয়াট।
খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের ওই অনাগ্রহের মূল কারণ ছিল ‘সভরেন গ্যারান্টি’ না থাকা। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রকল্পের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে এ গ্যারান্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তারা। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সভরেন গ্যারান্টি না দেওয়ায় নতুন দরপত্র নিয়ে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। বর্তমান সরকারও দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন করে গ্রিড-সংযুক্ত সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। যদিও তা কতটা সফল হবে এখনই বলা যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাতিল করা নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর এলওআই ইস্যু করা হয়েছিল ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে। এর মধ্যে ২৭টি ছিল সৌরবিদ্যুতের, তিনটি বায়ুবিদ্যুৎ ও একটি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প। ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটির জন্য জমি অধিগ্রহণ চলছিল।
জাতীয় অর্থনীতির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ওই ২৭টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২ হাজার ৪০৪ মেগাওয়াট। এগুলোর বেশিরভাগই রংপুর, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগে নির্মাণের কথা ছিল। আর বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র তিনটি ফেনীর সোনাগাজী, সাতক্ষীরার আশাশুনি এবং কক্সবাজারের চকরিয়ায় নির্মাণের কথা ছিল। এ তিনটি সক্ষমতা ছিল যথাক্রমে ৩০, ১০০ ও ২২০ মেগাওয়াট। আর বর্জ্য থেকে ১১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্মাণের কথা ছিল।
অন্যদিকে দরপত্র মূল্যায়নাধীন অবস্থায় ছিল পিডিবির তিনটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র। এগুলোর সক্ষমতা ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬, ২০ ও ৫০ মেগাওয়াট। প্রথমটি কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে, দ্বিতীয়টি বড়পুকুরিয়ায় ও তৃতীয়টি রাঙ্গুনিয়ায় নির্মাণের কথা ছিল। এর বাইরে মহেশখালীতে যৌথ উদ্যোগে ১৬০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য দরপত্রও মূল্যায়নাধীন ছিল। আর বেসরকারি খাতে কক্সবাজারের ইনানীতে ৫০ মেগাওয়াট ও চাঁদপুরে ৫০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দরপত্র আহ্বানের পর বাতিল করা হয়েছিল। পুনরায় দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়ায় থাকা এ দুটি কেন্দ্রের অনুমোদনও বাতিল করা হয়।
পিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাতিলকৃত ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবগুলোই ছিল দায়মুক্তির আইনের অধীনে প্রক্রিয়াধীন। সেগুলো বাতিল করা হলেও একই আইনের অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। এটি মূলত সরকারের দ্বৈতনীতি। বরং সে সময় এসব প্রকল্প বাতিল না করলে বর্তমানে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে চলে আসত। এতে দিনে বিদ্যুতের সংকট তেমন থাকত না।
এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষ আইনের (দায়মুক্তি আইন) অধীনে বাতিল হয়ে যাওয়া ৩৭টি এলওআই ইস্যুকৃত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এসব প্রকল্পে ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল। বাতিলকৃত এসব সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারকে সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করার পাশাপাশি এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার তাগিদ দেয় সংস্থাটি।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনের বিদেশি বিনিয়োগের সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ : অগ্রগতির পথ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব পরামর্শ দেয় সিপিডি। অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, রাজনৈতিক বিবেচনা ও অনিয়মের অভিযোগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার ৩৭ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ১৪টি দেশের অর্থায়নের এসব প্রকল্পের মধ্যে চীনের চারটি, সিঙ্গাপুরের সাতটি এবং ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে একটি করে প্রকল্প।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকার যে ৩৭টি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প বাতিল করেছিল তার মধ্যে ১৫টি কম্পানি জমি কিনেছে, সরকারকে কর দিয়েছে। তারা অনেক বিনিয়োগ করেছে। এরই মধ্যে এসব প্রকল্পে ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে।

