
পুলিশের নৈতিক মনোবল পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জনআস্থা বিনির্মাণে ৬৪ জেলায় কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠন করার পরিকল্পনা করেছে সরকার। কমিউনিটি পুলিশ স্থানীয় পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পুলিশকে সহযোগিতা করবে। ফলে পুলিশের নৈতিক মনোবল পুনরুদ্ধার হবে এবং তাদের ওপর জনগণের আস্থা ফিরে আসবে।
এ বিষয়ে ট্রেনিং ও মোটিভেশনে প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধতন একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
৬ মাসে ৩ হাজার ৯৮৪টি উঠান বৈঠকের পরিকল্পনা
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের অংশ হিসেবে প্রতিটি থানায় (৬৬৪টি থানায়) সাইবার, মাদক এবং অন্যান্য অপরাধসহ বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতামূলক মাসিক উঠান বৈঠক আয়োজন করা হবে। ৬ মাসে মোট ৩ হাজার ৯৮৪টি উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এসব বৈঠকের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সচেতনতামূলক ও মোটিভেশনাল ক্যাম্পেইন
ঢাকাসহ সারা দেশের জেলা পুলিশ এবং মেট্রোপলিটন পুলিশের ৭২টি ইউনিটের মাধ্যমে প্রতি মাসে একটি করে ৬ মাসে মোট ৪৩২টি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাফিক আইন বিষয়ে সচেতনতামূলক ও মোটিভেশনাল ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব ক্যাম্পেইনের ফলে যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা কমবে। একই সঙ্গে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠবে।
এ ছাড়া র্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়নের সদস্যদের জন্য মোট ২৭০টি মোটিভেশনাল সেশন (৯০টি প্রশিক্ষণ সেশন, ৯০টি সেমিনার এবং ৯০টি টাউন হল মিটিং) আয়োজন করা হবে। এতে র্যাব সদস্যদের মনোবল পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনআস্থা অর্জিত হবে বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।
সেবাবান্ধব পুলিশ গড়ে তুলতে পুলিশের মোটিভেশন, প্রশিক্ষণ ও নৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ৬৪ জেলার ৬৪টি সদর থানা এবং ৮টি মেট্রোপলিটন পুলিশের ৮টি কোতোয়ালি থানার পুলিশ সদস্যদের (প্রতিটি সেশনে ৩০ জন করে মোট ২ হাজার ১৬০ জন) ৫ দিন মেয়াদি ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অফিসার ও ফোর্সের সদস্যরা আইন ও বিধি অনুসরণ করে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে দায়িত্ব পালনে আরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ন্যূনতম বল প্রয়োগ নীতি
এ ছাড়া জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যূনতম বল প্রয়োগ নীতি বিষয়ে ৩০টি ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে। এতে ৩০ জন করে মোট ৯০০ জন প্রশিক্ষণ পাবেন। পাশাপাশি ট্রাফিক অ্যান্ড ড্রাইভিং স্কুলে (টিডিএস) বিভিন্ন মেয়াদে ৫০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত পাঁচ ধরনের বিষয়ে ৫০০ জন পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও ভাবছে সরকার।
এদিকে, পুলিশ সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে তাদের পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নারীবান্ধব পুলিশিং জোরদার
নারীবান্ধব পুলিশিং জোরদার করতে ৮টি বিভাগীয় শহরে কর্মরত নারী পুলিশ সদস্যদের সন্তানের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নারী, শিশু ও বয়স্ক সেবাপ্রার্থীদের জন্য ৬৪ জেলার ৬৪টি সদর থানার সংশ্লিষ্ট ডেস্ককে প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জামের মাধ্যমে মডেল ডেস্কে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে সঠিক আচরণ ও কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে সরাসরি তদারকি ও পরিদর্শনের মাধ্যমে সকল সদর থানাকে ‘জিরো কমপ্লেইন্টস সেন্টার’-এ পরিণত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সেবার মানোন্নয়নে ৩০ দিনের মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাছাইকৃত ২৫ জন পুলিশ সদস্যকে ট্যুরিস্ট পুলিশে পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া জুলাই-আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে পুলিশের নৈতিক মনোবল বৃদ্ধি ও জনআস্থা অর্জনের লক্ষ্যে পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশ, ডিএমপি এবং রাজশাহী রেঞ্জে পুলিশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে দুই বছর মেয়াদি তিনটি গবেষণা পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ পুনঃনিরীক্ষণেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
ব্যয় হবে ১৪ কোটি টাকা
পুলিশের নৈতিক মনোবল পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জনআস্থা অর্জনের লক্ষ্যে কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠনে রাজস্ব বাজেট থেকে ২ কোটি টাকা এবং পুলিশের মোটিভেশন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পুলিশের মনোবল বৃদ্ধির এসব উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে বা কাজে আসবে- জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পুলিশের মনোবল বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রমের প্রয়োজন আছে। তবে, শুধু কর্মশালা, উঠান বৈঠক বা পোশাক পরিবর্তনের মাধ্যমে জনআস্থা পুরোপুরি ফিরে আসবে না। জবাবদিহিতা, পেশাদারিত্ব, অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং মানবাধিকার মেনে আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ পুলিশের আচরণ ও সেবার মানে বাস্তব পরিবর্তন দেখলে তবেই আস্থা টেকসইভাবে ফিরে আসবে।
জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, জনগণের আস্থা অর্জনও পুলিশের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। জুলাই-আগস্ট পরবর্তী বাস্তবতায় পুলিশের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব কমাতে কমিউনিটি পুলিশিং, মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ এবং সেবার মান উন্নয়নের উদ্যোগগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ। পুলিশের মনোবল ও জনআস্থা– দুটোই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে।

