
জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে নাদিম মিজান ও মায়া ইসলাম নামে দুইজনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত ও অভিযোগপত্র নিয়ে অনিয়ম, তথ্যবিকৃতি এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও সুনির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপনে ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ (আইসিটি)-এ রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা অভিযোগপত্রের পর্যালোচনায় এসব অসঙ্গতি সামনে এসেছে।
অভিযোগের সারসংক্ষেপ : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মামলায় (নম্বর ০৩/২৫) উল্লেখ করা হয়েছে, ভিকটিম নাদিম মিজান ও মায়া ইসলাম নামে দুই ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। এছাড়া আমির হোসেন ও শিশু বাসেত খান মুসা গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে আছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। মামলায় তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, এডিসি রাশেদুল ইসলাম. রামপুরা থানার ওসি মশিউর রহমান, এসআই তরিকুল ইসলাম ও এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল ও সময় নিয়ে অসঙ্গতি: অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুর আড়াইটার দিকে রামপুরা থানার সামনে মসজিদ থেকে জুমার নামাজ পড়ে বের হওয়ার সময় নাদিম মিজানকে গুলি করা হয়। তবে এ সংক্রান্ত কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা মসজিদের মুসল্লিদের কোনো সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ঘটনাটি খিলগাঁও থানাধীন মেরাদিয়া টেম্পু স্ট্যান্ডের বিদ্যুতের খাম্বার কাছে বিকাল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে গোলাগুলিতে হত্যা নাদিম মিজানের হত্যার ঘটনা ঘটে, যা রামপুরা থানা থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে। তাদের দাবি, নাদিম হত্যার ঘটনায় পুলিশের তরফ থেকে গুলি চালানো হয়নি। অন্য একটি বাহিনীর এপিসি থেকে গুলি চালানো হয়েছে।
সাক্ষ্য গ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ : মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসপি আব্দুর রউফ সাক্ষীদের জবানবন্দী তাদের বক্তব্য অনুযায়ী না লিখে নিজের মতো করে তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক সাক্ষী। এমনকি কিছু পুলিশ সদস্যও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক জবানবন্দী নেয়া হয়েছে।
সিডিআর তথ্যে ভিন্ন চিত্র : কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) অনুযায়ী, অভিযুক্ত ওসি মশিউর রহমান ও এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার ঘটনাকালে (আড়াইটা) বিটিভি ভবনের সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অথচ অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা একই সময়ে রামপুরা থানার সামনে উপস্থিত থেকে গুলি চালান বা নির্দেশ দেন-যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জবানবন্দি দাতার ভাষ্য অনুযায়ী বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিটিভি ও তার আশপাশের এলাকায় থাকলেও, তার জবানবন্দীতে দুপুর আড়াইটার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চিকিৎসা ও পোস্টমর্টেমের অভাব : নিহত ও আহতদের কাউকেই রামপুরা বা খিলগাঁও এলাকার কোনো হাসপাতালে ভর্তি বা চিকিৎসা দেয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া কোনো পোস্টমর্টেম রিপোর্ট, সুরতহাল রিপোর্ট বা নির্ভরযোগ্য ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর একটি হাসপাতালে চাপ প্রয়োগ করে মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করা হয়েছে।
অন্যান্য প্রশ্ন ও অস্পষ্টতা : মায়া ইসলামের শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন না থাকায় তার মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট নয়। একইভাবে শিশু বাসিত খান মুসার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ ঘটনার সময় তারা একটি ভবনের ভেতরে অবস্থান করছিলেন।
মামলার তদন্তে একাধিক অসঙ্গতি, ঘটনাস্থলের ভিন্নতা, তথ্যের অমিল এবং প্রমাণের ঘাটতি থাকায় পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিচারিক প্রক্রিয়ায় এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

