
বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়ার কাছে স্মারকলিপি পেশ করেছে স্থানীয় সংগঠন “আমরা বন্দরবাসী”। বুধবার (২৫ জুন) এ আই আকাশের নেতৃত্বে দুপুরে এই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপিতে বন্দর উপজেলার প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ: আকিজ ফ্যাক্টরি কাঠগড়ায়
বন্দর উপজেলার বাসিন্দারা শিল্প প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সৃষ্ট ব্যাপক পরিবেশ দূষণের কারণে প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষত, আকিজ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি কর্তৃক উন্মুক্ত অবস্থায় লাইমস্টোন (চুনপাথর) আনলোড করার ফলে বন্দর সিটি কর্পোরেশনের ২২, ২৩, ২৪ নম্বর ওয়ার্ড, বন্দর ইউনিয়ন পরিষদের বেশিরভাগ অংশ এবং সদর থানার খানপুর এলাকার বেশিরভাগ অংশের নাগরিকরা প্রতিনিয়ত বাতাসের সাথে লাইমস্টোন ফসফসের (গুঁড়ো) শিকার হচ্ছেন।
এছাড়াও, সিমেন্ট কারখানার একই সীমানায় আলকে আটা ও ময়দা মিল স্থাপন করায় আটা-ময়দার সাথে লাইমস্টোন মিশ্রিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। মদনপুর-মদনগঞ্জ মহাসড়কের বাগবাড়ি এলাকায় আকিজ এগ্রো ফিড কোম্পানির আলকে ফিডমিল চালুর পর প্রায় ২৮টি মেশিনের মধ্যে ৭-৮টি প্রাথমিক পর্যায়ে চালু হওয়া মেশিনে উৎপাদিত ফিডের দুর্গন্ধ আশেপাশের মানুষের জীবন বিষিয়ে তুলছে এবং পানিবাহিত রোগের সংখ্যা বাড়াচ্ছে।
“আমরা বন্দরবাসী” আগামী সাত দিনের মধ্যে উল্লেখিত আলকে ফ্যাক্টরির মালিকপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বন্দরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে একটি জরুরি বৈঠক করে এই দূষণের প্রতিকারে দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর দাবি ও আল্টিমেটাম দিয়েছে।
বিশুদ্ধ পানির সংকট: দুর্ভোগে ২ লাখ মানুষ
স্মারকলিপিতে বিশুদ্ধ পানির তীব্র অভাবের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের দায়িত্বে থাকলেও, সিটি কর্পোরেশনের অধিকাংশ এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সমস্যা প্রকট। তবে বন্দরের নতুন ৮টি ওয়ার্ডে বিশুদ্ধ পানির অভাব সবচেয়ে বেশি। কিছু গভীর নলকূপ থাকলেও, সেগুলোর অধিকাংশই প্রায়শই বিকল থাকে। ফলস্বরূপ, প্রায় দুই লক্ষ মানুষ সারা বছর পানির অভাবে কষ্ট পাচ্ছে। এছাড়াও, বিশুদ্ধ পানির নামে দূষিত পানি সরবরাহের কারণে মানুষ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দ্রুত গভীর নলকূপের সমস্যার সমাধান এবং বন্দরবাসীর বিশুদ্ধ পানির অভাব দূর করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
বেহাল দশা সড়কের: বাড়ছে দুর্ঘটনা ও যানজট
বন্দরের প্রধান সড়ক মদনপুর-মদনগঞ্জ সড়কটি ভয়ংকর রকমের খানাখন্দকে ভরা। এর ফলে প্রতিদিন বহু মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে এবং রাস্তার মাঝখানে গাড়ি বিকল হয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কারণ হচ্ছে এবং কতিপয় সুবিধাভোগী এর সুযোগ নিচ্ছে। রাস্তায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া নবীগঞ্জ ঘাট থেকে কাইকারটেক লিংক রোড এবং বন্দর ঘাট থেকে ঘারমোরা হয়ে কাগজেরড্রেন পর্যন্ত রাস্তার অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। এই রাস্তাগুলির কোনো উন্নয়ন কাজ হয়নি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না বলে স্মারকলিপিতে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দ্রুত রাস্তাগুলির সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও চাঁদাবাজি: মানবেতর জীবনযাপন
স্মারকলিপিতে অবৈধ গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে একটি শ্রেণীর দুষ্টচক্রের দৌরাত্ম্যের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, কিছু চক্র রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে অর্থের বিনিময়ে গ্যাসের সংযোগ দিচ্ছে। বর্তমানে নতুন প্রভাবশালী মহল সাধারণ মানুষকে লাইন কাটার ভয় দেখিয়ে এবং কিছু ক্ষেত্রে লাইন কেটে জরিমানা আদায় করে জিম্মি করছে। এতে সাধারণ মানুষ গ্যাসের সমস্যায় জর্জরিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। “আমরা বন্দরবাসী”র পক্ষে এ আই আকাশ বৈধ গ্যাস সংযোগগুলি নিয়মমাফিক প্রদান নিশ্চিত করা এবং অবৈধ দুষ্টচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
স্মারকলিপির শেষে “আমরা বন্দরবাসী” জানিয়েছে যে, তারা বন্দরে জন্মগ্রহণ করে ভুল করেননি। গুলশান, বনানীর সমতালে খাজনা, ট্যাক্সসহ সবকিছু দিয়েও তারা সবচেয়ে দুর্ভাগা। তারা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলামকে একজন কর্মঠ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা উল্লেখ করে তাদের ‘বাঁচার মতো ব্যবস্থা’ করে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। অন্যথায়, বন্দর থেকে তাদের ‘বিতাড়িত করে দেওয়ার’ চরম হতাশার কথাও ব্যক্ত করেছেন।

