আজ
|| || ||
অনুমোদনহীন রিফাইনারিতে ক্রুড আমদানির তোড়জোড় সুপার পেট্রোকেমিক্যালের
প্রকাশের তারিখঃ ৫ নভেম্বর, ২০২৬
নির্মাণাধীন রিফাইনারি প্ল্যান্ট স্থাপনের সরকারি অনুমোদন নেই। প্ল্যান্টটি চালুর অনুমতি চেয়ে একাধিকবার আবেদন করেও সাড়া পায়নি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি। এর মধ্যেই এবার ওই প্ল্যান্টে পরিশোধনের জন্য বিপিসির কাছে চার লাখ টন লাইট ক্রুড (কনডেনসেট) ও আট লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানির অনুমতি চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ এর আগে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে প্ল্যান্টটিতে শুধু লাইট ক্রুড পরিশোধনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল তারা।
বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এ ধরনের রিফাইনারি নির্মাণ ও পরিচালনার উদ্যোগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় একমাত্র জ্বালানি পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নে যখন কাজ এগোচ্ছে, তখন অনুমোদনহীন বেসরকারি প্ল্যান্টের নির্মাণকাজ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গত ২৭ অক্টোবর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে ক্রুড আমদানির অনুমতি চায় সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ২০২৭ সালের জন্য চার লাখ টন লাইট ক্রুড এবং আট লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানির অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
তবে একই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গত ১৪ জুলাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে নির্মাণাধীন প্ল্যান্টে লাইট ক্রুড পরিশোধনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। সেখানে বছরে ২০ লাখ টন সৌদি আরবের অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অথবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। দুই চিঠির তথ্যের মধ্যে এই পার্থক্য নিয়েই তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
গণমাধ্যমের হাতে আসা ২৭ অক্টোবরের চিঠি এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিপিসির ১০ আগস্টের একটি চিঠির সূত্র উল্লেখ করে ২০২৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে পরিশোধিত জ্বালানি কেনার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ওই পরিকল্পনায় বিপিসিকে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ টন অকটেন, ১ লাখ ১৯ হাজার টন পেট্রোল, ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টন ডিজেল এবং ৩ লাখ ৬১ হাজার টন হাই সালফার ফার্নেস অয়েল (এইচএফও) সরবরাহের কথা বলা হয়।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বিপিসিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে ২০২৭ সালে চার লাখ টন লাইট ক্রুড (কনডেনসেট) ও আট লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানি প্রয়োজন। এসব কাঁচামাল পরিশোধন করে উৎপাদিত জ্বালানি বিপিসিকে সরবরাহ করা হবে বলে জানানো হয়।
কিন্তু ১৪ জুলাইয়ের চিঠিতে লাইট ক্রুড ও কনডেনসেটের মধ্যে এমন কোনো অভিন্ন পরিচয় দেওয়া হয়নি। বরং সেখানে নির্দিষ্টভাবে সৌদি আরবের অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড আমদানির কথা বলা হয়েছিল। ফলে ২৭ অক্টোবরের চিঠিতে কনডেনসেটকে লাইট ক্রুড হিসেবে উপস্থাপনের বিষয়টি নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে গণমাধ্যম। তাদের বক্তব্য, কনডেনসেট ও লাইট ক্রুডের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিপিসির আগের বিভিন্ন অনুমতিপত্রেও কনডেনসেটকে সরাসরি লাইট ক্রুড হিসেবে উল্লেখ করার নজির নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক এক মহাব্যবস্থাপক বলেন, ‘কনডেনসেটকে স্বাভাবিকভাবে লাইট ক্রুড অয়েল বলার সুযোগ নেই। বিপিসি কখনো কনডেনসেটকে লাইট ক্রুড অয়েল হিসেবে চিহ্নিত করে না। কারণ কনডেনসেট হচ্ছে গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া গ্যাসের উপজাত। কিন্তু ক্রুড অয়েল হচ্ছে পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট।’
একই বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী। দেশের প্রখ্যাত এই ভূতত্ত্ববিদ মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বলেন, ‘কনডেনসেট এক ধরনের লাইট ক্রুড হলেও আমাদের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের জন্য আমদানি করা লাইট ক্রুড ও কনডেনসেট এক নয়। কনডেনসেট আসে গ্যাসক্ষেত্র থেকে, আর লাইট ক্রুড আসে তেলক্ষেত্র থেকে। দুটোই পরিশোধন করে পেট্রোলিয়াম জ্বালানি পণ্য উৎপাদন করা হয়।’
এদিকে, গত ১৪ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল পরিশোধনক্ষমতার একটি ক্রুড অয়েল রিফাইনারি প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিল সুপার পেট্রোকেমিক্যাল। ওই চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণাধীন প্রকল্পের বার্ষিক অপরিশোধিত তেল পরিশোধনক্ষমতা সাড়ে ১৭ লাখ মেট্রিক টন উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি প্ল্যান্টটি লাইট ক্রুড পরিশোধনের উপযোগী করে তৈরি করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। তবে প্রকল্পটির সরকারি অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো তথ্য সেখানে ছিল না। এর আগে রিফাইনারি স্থাপনের অনুমতি চেয়ে প্রতিষ্ঠানটি একাধিকবার আবেদন করলেও তা অনুমোদন পায়নি।
বিপিসির ১০ আগস্টের চিঠিতে মূলত ২০২৭ সালের জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা তৈরির জন্য সুপার পেট্রোকেমিক্যালের কাছ থেকে সরবরাহের সম্ভাব্য পরিমাণ জানতে চাওয়া হয়েছিল। বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানটি থেকে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেলসহ বিভিন্ন গ্রেডের কী পরিমাণ জ্বালানি পাওয়া যেতে পারে, তা জানা প্রয়োজন।
চিঠিতে বলা হয়, ২০২৬ সালের ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে সরবরাহের সম্ভাব্য পরিমাণ জানানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না পাওয়ায় বিপিসির পক্ষে ২০২৭ সালের আমদানি পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছিল না। এ কারণে জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর—এই দুই পর্বে মাসভিত্তিক ও গ্রেডভিত্তিক সরবরাহের পরিমাণ নির্ধারিত ছকে ১২ আগস্টের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ১২ আগস্ট সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রণব কুমার সাহা স্বাক্ষরিত চিঠিতে ২০২৭ সালে বিপিসিকে মোট ১২ লাখ ৩ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনা জানানো হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি ছাড়া বছরের বাকি ১১ মাসে প্রতি মাসে ২১ হাজার ৫০০ টন অকটেন ও ১০ হাজার টন পেট্রোল সরবরাহের কথা বলা হয়। এ ছাড়া মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে ৫০ হাজার টন ডিজেল এবং ৪২ হাজার টন করে এইচএফও দেওয়ার পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়।
ফেব্রুয়ারি মাসে ২০ হাজার টন অকটেন ও ৯ হাজার টন পেট্রোল সরবরাহের কথা জানানো হয়। ডিজেলের ক্ষেত্রে জানুয়ারিতে ১২ হাজার ৫০০ টন, ফেব্রুয়ারিতে ১১ হাজার ৫০০ টন, মার্চে ১২ হাজার ৫০০ টন এবং এপ্রিলে ৩০ হাজার টন সরবরাহের পরিকল্পনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি এপ্রিল মাসে ২৫ হাজার টন এইচএফও সরবরাহের কথাও উল্লেখ করা হয়।
ওই চিঠির তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘বর্তমানে নির্মাণাধীন ৩৫ হাজার ব্যারেল ক্ষমতার ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিটটি (সিডিইউ) আগামী মার্চ ২০২৭ সালে চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং উক্ত পরিকল্পনার আলোকে এপ্রিল, ২০২৭ সাল থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের পরিমাণ প্রাক্কলন করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার এবং সিইও প্রণব কুমার সাহার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপেও খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, হেভি ক্রুড আমদানির অনুমতি চেয়ে পাঠানো চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ক্রুড আমদানির বিষয়ে সুপার পেট্রোকেমিক্যালসের একটি চিঠি আমার কাছে এসেছে। চিঠিটি আমাদের বিপিসির টিম পর্যালোচনা করছে।’
তবে সরকারি অনুমোদন ছাড়া জ্বালানির মতো স্পর্শকাতর পণ্যের রিফাইনারি প্ল্যান্ট কীভাবে নির্মিত হচ্ছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘বর্তমানে সারাবিশ্বে জ্বালানি একটি স্পর্শকাতর পণ্য। দেশে সরকারি অনুমোদন ছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে রিফাইনারি নির্মিত হলে তা জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলবে। অনুমোদন না নিয়ে রিফাইনারি করা আইনের লঙ্ঘন। এতে তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত।’
উল্লেখ্য, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি তাদের বিদ্যমান ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট থেকে বিপিসিকে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল সরবরাহ করে আসছে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল, এমটিটি, লাইট এমএস ও এসবিপিএস মিলিয়ে মোট ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩৭ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ করেছে।
এসব পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল সংগ্রহে প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির পূর্বানুমোদন নিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ন্যাফতা, পেট্রোবাংলা থেকে দেশীয় কনডেনসেট এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা কনডেনসেট ব্যবহার করে থাকে।
সম্পাদক: মো: রবিউল হক। প্রকাশক: মো: আশ্রাফ উদ্দিন ।
প্রকাশক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২, টয়েনবি সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে মুদ্রিত
দেলোয়ার কমপ্লেক্স, ২৬ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা), ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে প্রকাশিত ।
মোবাইল: ০১৭৯৮৬৫৫৫৫৫, ০১৭১২৪৬৮৬৫৪
ওয়েবসাইট : dailyjanadarpan.com , ই-পেপার : epaper.dailyjanadarpan.com
Copyright © 2026 Daily Janadarpan. All rights reserved.