কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও প্রেসক্লাবের ঠিক সামনের অভিজাত ভবন। নিরাপত্তা ও নজরদারির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর চোখের সামনেই নবম তলার একটি ফ্ল্যাটে মজুত ছিল ৩ লাখ পিস ইয়াবা। দুটি কালো ট্রাভেল ব্যাগে খাকি টেপে মোড়ানো ৩০টি প্যাকেটে রাখা হয়েছিল এসব বড়ি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার এক আসামি সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, এর আগেও তিনি ১০টি চালানে মোট ২০ লাখ পিস ইয়াবা ঢাকায় পাঠিয়েছেন।
ঘটনাটি কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া নিউ সার্কিট হাউস রোডের কোরাল রিপ পূর্বিতা সুলতান ভিলার।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাত আড়াইটা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত ভবনটির নবম তলার ৮/এ নম্বর ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। ভবনটি পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও প্রেস ক্লাবের ঠিক সামনেই অবস্থিত।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন শরীয়তপুরের আরমান বয়াতী (২৭), পিরোজপুরের মো. শামীম (৩০) ও ভোলার মো. রাকিব (২৫)।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ আলী জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশের তিনটি বিশেষ দল ফ্ল্যাটটিতে অভিযান চালায়। তল্লাশির একপর্যায়ে শয়নকক্ষের কেবিনেটের ভেতরে থাকা দুটি কালো ট্রাভেল ব্যাগ থেকে ৩০টি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। এসব প্যাকেটে পাওয়া যায় ৩ লাখ পিস ইয়াবা সদৃশ ট্যাবলেট। এ সময় তিনটি মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, টেকনাফ সীমান্ত এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ইয়াবাগুলো ঢাকার কেরানীগঞ্জের মো. রাহাদ হোসেন (২৬) নামের এক ব্যক্তির কাছে পাঠানোর জন্য ফ্ল্যাটটিতে মজুত করা হয়েছিল। ফ্ল্যাটটি রাহাদের নামে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। তিনি পলাতক রয়েছেন।
গ্রেফতার আরমান সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া বক্তব্যে স্বীকার করেন, এর আগে দুই লাখ পিস করে ১০টি চালানে মোট ২০ লাখ পিস ইয়াবা রাহাদের কাছে পাঠিয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ফ্ল্যাটটিতে কারা আসা-যাওয়া করতেন, তা শনাক্ত করতে ভবনটির গত এক মাসের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ফুটেজ পর্যালোচনা করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি ইয়াবা মজুত ও পাচারের সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, গ্রেফতার তিনজন ও পলাতক রাহাদ পরস্পর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে ফ্ল্যাটটি ইয়াবা মজুত ও কেনাবেচার কাজে ব্যবহার করে আসছিলেন। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও প্রেসক্লাবের ঠিক সামনের ভবনে ইয়াবার গোডাউন গড়ে তোলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নুরুল ইসলাম হেলালী।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থাপনার ঠিক সামনের ভবনে ইয়াবা মজুত ও ব্যবসা করার সাহস দেখিয়েছে কারবারিরা। এতে তাদের শক্তি ও বেপরোয়া মনোভাবের বিষয়টি স্পষ্ট। এই মাদক কারবারীদের বিষদাঁত ভেঙে দিতে হবে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা উদ্ধারের জন্য পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, শহরে এ ধরনের আরও মাদক সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকতে পারে। সেগুলো চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।
কক্সবাজার শহরকে ইয়াবা পাচারের নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মমতাজ উদ্দিন বাহারী।
তিনি বলেন, শহরের অভিজাত ভবনগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বড় মাদক কারবারিদের বসবাসের অভিযোগ রয়েছে। বেশি ভাড়া ও বাসিন্দাদের বিষয়ে খোঁজখবর কম রাখার সুযোগে এসব ভবন মাদক মজুত ও পাচারের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।
মমতাজ উদ্দিন বাহারী আরও বলেন, মাদক কারবারের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্য এবং সাংবাদিকদের কেউ কেউ জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে পেশা বা পরিচয় বিবেচনা না করে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা উচিত।



