আজ
|| || ||
ছয় বছর ধরে সড়কের অপেক্ষা, নৌকা-সাঁকোয় ছয় গ্রামের ২৮ হাজার মানুষ
প্রকাশের তারিখঃ ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সাতক্ষীরা :ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে বিধ্বস্ত হওয়ার ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও পুনর্নির্মাণ হয়নি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। ফলে ছয় গ্রামের প্রায় ২৮ হাজার মানুষকে কোথাও নৌকায়, কোথাও বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, রোগী, শিশু ও গর্ভবতী নারীরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়ক দুটি পুনর্নির্মাণের দাবিতে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে বারবার আবেদন-নিবেদন করেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে থেকে কুড়িকাহুনিয়া হয়ে গড়াইমহল খাল পেরিয়ে কপোতাক্ষ নদের ওয়াপদার পুরাতন লঞ্চঘাট পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কটি একসময় এলাকার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ ছিল। এ পথে কুড়িকাহুনিয়া ও শ্রীপুর গ্রামের ১০ হাজারের বেশি মানুষ চলাচল করতেন।
অন্যদিকে, মকবুল গাজীর বাড়ির সামনে কালভার্ট পার হয়ে সনাতনকাটি–নাকনা সংযোগ সড়কটিও প্রায় দুই কিলোমিটার। এ পথে সনাতনকাটি, নাকনা, গোকুলনগর ও গোয়ালবাটি গ্রামের প্রায় ১৮ হাজার মানুষ চলাচল করেন। দুই সড়ক দিয়ে প্রতাপনগর ও আনুলিয়া ইউনিয়নের পাশাপাশি কয়রা উপজেলারও বহু মানুষ যাতায়াত করেন। দশআনিয়া খেয়াঘাট পার হয়ে খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রেও পথ দুটি গুরুত্বপূর্ণ।
২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙে প্রতাপনগরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এর এক বছর পর ২০২১ সালের ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও রাস্তাঘাট। পানির প্রবল স্রোতে সড়ক দুটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে যায়। কোথাও কোথাও গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়। এতে যোগাযোগব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
পরে বেড়িবাঁধ সংস্কার হওয়ায় মানুষ এলাকায় ফিরতে শুরু করলেও সড়ক দুটি আর আগের অবস্থায় ফেরেনি। স্থানীয়রা জানান, যাতায়াতের চরম সংকট সামাল দিতে ইউনিয়ন পরিষদের সামনের অংশে প্রায় ৭০০ ফুট দীর্ঘ বাঁশের সাঁকো তৈরি করা হয়। কয়েকটি বাঁশ পাশাপাশি বিছিয়ে পেরেক দিয়ে তৈরি করা সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন মানুষ চলাচল করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সাঁকোটি সরু হওয়ায় বিপরীত দিক থেকে দুজনের যাতায়াতও ঝুঁকিপূর্ণ। বাঁশ ভেঙে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে। মালপত্র নিয়ে চলাচলেও ভোগান্তি পোহাতে হয়। অন্যদিকে সনাতনকাটি, নাকনা, গোকুলনগর ও গোয়ালবাটি এলাকার বাসিন্দাদের অনেকটা পথ নৌকায় পার হতে হয়। বিকল্প সড়ক ব্যবহার করলে কয়েক কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হয়।
শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি
সড়ক না থাকায় শিক্ষার্থীদেরও প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। প্রতাপনগর ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কুড়িকাহুনিয়া মহিলা মাদ্রাসা, প্রতাপনগর ফাজিল মাদ্রাসা, প্রতাপনগর আল-আমিন মহিলা মাদ্রাসা, কুড়িকাহুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এই পথ ব্যবহার করে।
প্রতাপনগর ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জয়দেব কুমার দাশ বলেন, স্রীরামকাটি, শ্রীপুর, নাংলা ও গোকুলনগরসহ আশপাশের গ্রামের শিক্ষার্থীরা এই পথ দিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। পথটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টির সময় সাঁকো বা নৌকা পার হতে গিয়ে অনেকের বই-খাতা ও পোশাক ভিজে যায়। কেউ কেউ দুর্ঘটনার শিকারও হয়। বাধ্য হয়ে অনেক শিক্ষার্থী লস্করী-খাজরা হয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে বিদ্যালয়ে আসে।
নাকনা গ্রামের শিক্ষার্থী সবুজ হোসেন ও তানিয়া সুলতানা জানায়, প্রতিদিন যাতায়াতে তাদের অনেক কষ্ট হয়। বর্ষার সময় সাঁকো ও নৌকা পার হতে গিয়ে বই-খাতা ও পোশাক ভিজে যায়। অনেক দিন তারা স্কুলেও যেতে পারে না।
এদিকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী রিয়াছাত আলী বলেন, আম্ফানের পর এলাকার অনেক ঘরবাড়ি ও জমি খালের মধ্যে চলে গেছে। হাজার হাজার মানুষের চলাচলের কথা বিবেচনা করে স্থানীয়দের সহযোগিতায় প্রায় ১১ থেকে ১২শ বাঁশ দিয়ে সাঁকো তৈরি করা হয়। মানুষ কষ্ট করে সাঁকো ও নৌকায় চলাচল করলেও প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। জনস্বার্থে দ্রুত সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
উপাধ্যক্ষ মাওলানা অহিদুল ইসলাম বলেন, প্রতাপনগর একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর স্থায়ীভাবে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়নি। বাধ্য হয়ে স্থানীয়রাই বাঁশের সাঁকো ও নৌকার ব্যবস্থা করেছেন। হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী আবু দাউদ ঢালী বলেন, বেড়িবাঁধ ভেঙে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সনাতনকাটি ও কুড়িকাহুনিয়া এলাকায় কোথাও কোথাও প্রায় ৩০ ফুট গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। সাঁকো ও নৌকার পাশাপাশি মানুষকে দীর্ঘ বিকল্প পথ ঘুরে তালতলা হয়ে দৈনন্দিন কাজ, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। সাঁকো ভেঙে দুর্ঘটনাও ঘটছে। দ্রুত সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে,আশাশুনি উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী অনিন্দ্যদেব সরকার বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড জায়গাটি ইনবাক করে দিলে অথবা এলজিইডি প্রয়োজনীয় এনওসি পেলে রাস্তার কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের এই যোগাযোগ সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দ্রুত সড়ক ও প্রয়োজনীয় কালভার্ট নির্মাণ করা হলে ছয় গ্রামের প্রায় ২৮ হাজার মানুষের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষেরও যাতায়াতের দুর্ভোগ কমবে।
সম্পাদক: মো: রবিউল হক। প্রকাশক: মো: আশ্রাফ উদ্দিন ।
প্রকাশক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২, টয়েনবি সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে মুদ্রিত
দেলোয়ার কমপ্লেক্স, ২৬ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা), ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে প্রকাশিত ।
মোবাইল: ০১৭৯৮৬৫৫৫৫৫, ০১৭১২৪৬৮৬৫৪
ওয়েবসাইট : dailyjanadarpan.com , ই-পেপার : epaper.dailyjanadarpan.com
Copyright © 2026 Daily Janadarpan. All rights reserved.