আজ
|| || ||
নেছারাবাদে জামায়াত নেতা শফিকুলের বিরুদ্ধে হিন্দুদের জমি দখল ও হয়রানির গুরুতর অভিযোগ: প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি
প্রকাশের তারিখঃ ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার সমুদয়কাঠী ইউনিয়নে জমি দখল, ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙচুর, কষ্টিপাথরের মূর্তি পাচার এবং রাতের অন্ধকারে সেনাবাহিনীর পোশাক পরে সংখ্যালঘু পরিবারগুলোকে ভয়ভীতি দেখানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ওয়ার্ড জামায়াত সভাপতি শফিকুল ইসলাম হাওলাদারের বিরুদ্ধে। এই পরিস্থিতিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী অবিলম্বে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য ও লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালের ২৩ মার্চ সমুদয়কাঠী গ্রামের মৃত মাখন লাল আইচের ছেলে সমির রঞ্জন আইচ এবং উত্তম আইচ তিনটি রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে তাদের সম্পত্তি আব্দুর রহমান হাওলাদারের দুই ছেলে শফিকুল ইসলাম হাওলাদার এবং সিদ্দিকুর রহমান হাওলাদারের কাছে যৌথভাবে বিক্রি করেন। তবে জমির মূল মালিকরা দুই ভাইয়ের কাছে সম্পত্তি বিক্রি করলেও, শফিকুল ইসলাম হাওলাদার সম্পূর্ণ জালিয়াতির আশ্রয় নেন। তিনি অপর ক্রেতা সিদ্দিকুর রহমানকে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে শুধু নিজের নামে একটি অনিবন্ধিত (আনরেজিস্টার্ড) 'বহায়ের চুক্তিপত্র' তৈরি করেন। পরবর্তীতে এই ভুয়া চুক্তিপত্রটি ব্যবহার করে আদালতে বিবাদীদের অনুপস্থিতির সুযোগে ভুল তথ্য দিয়ে নিজের পক্ষে একটি একতরফা ডিক্রি বাগিয়ে নেন। এর সূত্র ধরে তিনি ওই এলাকার বিপুল পরিমাণ জমি অবৈধভাবে নিজের একক নিয়ন্ত্রণে নেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শফিকুল ইসলাম একের পর এক জমি দখল ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে শফিকুল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তবে সরকার পতনের পরপরই রাতারাতি খোলস বদলে তিনি সমুদয়কাঠী ইউনিয়নের ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি বনে যান। এই অপকর্মে তার সহযোগী হিসেবে রয়েছেন ওয়ার্ড জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক আবুল, সাবেক যুবলীগ নেতা টিটু আইচ এবং মৃণাল আইচ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চারজনের সিন্ডিকেট এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং সাধারণ মানুষের সাথে কোনো ধরনের সামাজিক যোগাযোগ না রেখে এককভাবে নির্যাতন ও হয়রানি চালিয়ে যাচ্ছে।
এলাকাবাসীর বিশেষ ক্ষোভের জায়গা হলো—পিরোজপুর জেলা জুড়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে আল্লামা মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী সবসময় একটি আস্থার ও সম্প্রীতির নাম হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে শফিকুল ও আবুলের মতো সুবিধাবাদী ব্যক্তিরা জামায়াতের পদ-পদবি ব্যবহার করে যে অত্যাচার, নিপীড়ন ও ভূমি গ্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে, তাতে স্থানীয় হিন্দুদের মাঝে দীর্ঘদিনের সেই আস্থার জায়গাটি চরমভাবে কলঙ্কিত ও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। দলের নাম ভাঙিয়া তাদের এই ব্যক্তিগত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটির ভাবমূর্তিও সংকটে পড়ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
শফিকুল ও তার চক্রের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৫টি বড় ধরনের দখলদারিত্ব ও অপরাধের অভিযোগ তুলেছে এলাকাবাসী:
১. মুন্সি বাড়ির জায়গা দখল ও রাস্তা বন্ধ: স্থানীয় 'মুন্সি বাড়ি' নামে পরিচিত রবি মুন্সি, সুমন মুন্সি ও সুজন মুন্সির পারিবারিক জায়গা জোরপূর্বক দখল করা হয়েছে। এমনকি তাদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার একমাত্র চলাচলের রাস্তাও সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
২. ঐতিহাসিক ইউপি পুকুর ও সরকারি ভূমি দখল: সমুদয়কাঠী ইউনিয়ন বোর্ডের প্রথম ৬ বার প্রেসিডেন্ট যতীন আইচের ইউনিয়ন পরিষদে দান করা ঐতিহাসিক পুকুর এবং সরকারি রাস্তার প্রায় ৫-৬ বিঘা জায়গা অবৈধভাবে দখল করে শফিকুল সেখানে নিজের বাগান তৈরি করেছেন।
৩. ধোপা বাড়ির জমি গ্রাস: এলাকার আদি বাসিন্দা 'ধোপা বাড়ি' হিসেবে পরিচিত বিমল ধোপা, অমল ধোপা ও মানিক ধোপার বসতভিটার জায়গা দখল করে নিয়েছেন এই জামায়াত নেতা।
৪. পুরোনো মঠ ও মন্দির ভাঙচুর: ঐতিহ্যবাহী পুরনো মঠ ও মন্দির ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানকার জমিও নিজের কবজায় নিয়েছেন শফিকুল।
৫. শীতলা মন্দিরের জায়গা দখল ও মূর্তি পাচার: ঐতিহ্যবাহী শীতলা মন্দিরের জায়গা দখল করার পাশাপাশি সমির আইচের বাড়ির ভেতরের তিনটি মন্দির থেকে একটি কষ্টিপাথরের কালী মূর্তি এবং একটি কষ্টিপাথরের সরস্বতী মূর্তি চুরি করে চড়া দামে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে শফিকুলের বিরুদ্ধে।
এলাকাবাসীর আরও একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, শফিকুলের কাছে সেনাবাহিনীর একটি পোশাক রয়েছে। গভীর রাতে তিনি ওই পোশাক পরে এলাকায় ঘুরে বেড়ান এবং সংখ্যালঘু পরিবারগুলোকে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করেন, যাতে কেউ তার এসব অপরাধের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস না পায়।
এ বিষয়ে সমুদয়কাঠী এলাকাবাসী জানান, শফিকুল ও তার সাগরেতদের অত্যাচারে এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। তারা অবিলম্বে এই অবৈধ দখলদারিত্ব বন্ধ, পাচার হওয়া কষ্টিপাথরের মূর্তি উদ্ধার, বন্ধ রাস্তা উন্মুক্তকরণ এবং এই চক্রের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পিরোজপুর জেলা ও নেছারাবাদ উপজেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সম্পাদক: মো: রবিউল হক। প্রকাশক: মো: আশ্রাফ উদ্দিন ।
প্রকাশক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২, টয়েনবি সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে মুদ্রিত
দেলোয়ার কমপ্লেক্স, ২৬ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা), ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে প্রকাশিত ।
মোবাইল: ০১৭৯৮৬৫৫৫৫৫, ০১৭১২৪৬৮৬৫৪
ওয়েবসাইট : dailyjanadarpan.com , ই-পেপার : epaper.dailyjanadarpan.com
Copyright © 2026 Daily Janadarpan. All rights reserved.