আজ
|| || ||
আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭, আহত ৫৩৬ : এইচআরএসএস
প্রকাশের তারিখঃ ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
চলতি বছরের আগস্ট মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় দলীয় ও অন্তর্কোন্দলে ৭ জন নিহত এবং বিভিন্ন দলের ৫৩৬ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি-এইচআরএসএস’।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলামের পাঠানো প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ৭০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৬ জন। আগস্ট মাসে সহিংসতার অন্তত ৭০টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ২০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫২ জন ও নিহত ৫ জন। ১৮টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৩৩ জন ও নিহত ১ জন। ৭টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ২৬ জন ও নিহত ১ জন।
৬টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬ জন ও ১০টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে ৩৮ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ৯টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭১ জন। নিহত ৭ জনের মধ্যে বিএনপির ৫ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন ও জামায়াতের একজন।
এসব ঘটনার মধ্যে ক্যাম্পাসন্দ্রিক ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের অন্তত ১৩টি ঘটনায় আহত হয়েছে ২১৬ জন।
এর মধ্যে ছাত্রদল-শিবিরের ৮টি ঘটনায় ১৮১ জন এবং ছাত্রদল, অন্যান্য ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫টি ঘটনায় ৩৫ জন আহত হয়েছে।
‘আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তর্কোন্দল, ও চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশের কয়েকটি জেলায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৪টি ঘটনায় ৩ জন আহত এবং ২ জন নিহত হয়েছেন। অন্তত ১২ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
এ ছাড়া সারা দেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক ১৯টি ঘটনায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা ও হামলার ঘটনাও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আগস্ট মাসে কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরায় স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন আহত হয়েছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে ৬২টির অধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১১২৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরো প্রায় ২২০৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া, একই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলিয়ে মোট ১৬২টি ঘটনায় ১২৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৪২৯ জন নেতাকর্মী, বিএনপির ২২ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৪ জন, এনসিপির ৯ জন এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের ৫ জন সদস্য রয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় সারা দেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ৫৩টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ২৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৬২ জন।
আগস্ট মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এ মাসে অন্তত ৩টি নির্যাতনের ঘটনায় কমপক্ষে ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ২৬ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৬ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৭ জন সাংবাদিক। ৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সংবাদ প্রকাশের জেরে ১টি মামলায় একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ এর আওতায় ১টি মামলায় একজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সভা সমাবেশ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে ১৩টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, এতে ৬১ জন আহত ও ৮ জনকে আটক করা হয়েছে।
এছাড়া এ মাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ মাসে অন্তত ৮টি ঘটনায় ১০ জনকে আটক ও ৮টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনায় দুজন, রাজনৈতিক ও অন্যান্য কনটেন্ট তৈরি ১ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটূক্তির অভিযোগে ২ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ৬ জনকে আটক করা হয়েছে।
অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৪টি মামলায় ৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, এসব ঘটনায় ৫ জনকে আটকও করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৬ জন আসামি মারা গেছেন। এর মধ্যে একজন কয়েদি ও ৫ জন হাজতি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের একজন ও পাঁচজন জন্য সাধারণ কয়েদি ছিলেন।
সারা দেশে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে হতাহতের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্ট মাসে সারা দেশে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডের ৮২টি ঘটনায় ৮৭টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে বস্তাবন্দি অবস্থায় ১২টি, ঝুলন্ত অবস্থায় ১৭টি, শরীরে একাধিক আঘাতসহ ২৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া গলা কেটে হত্যা ৯টি, হাত-পা বাঁধা ৮টি লাশ পাওয়া গেছে। এর বাইরে নানা ধরণের পরিস্থিতিতে আরো ১৫টি লাশ পাওয়া গেছে।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্ট মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৮টি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় নিহত হয়েছেন ২ জন এবং আহত হয়েছেন ১ জন, যাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে হয়েছেন ৩ জন। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ৫ জনকে পুশ ইন এবং ১৮ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা করা হয়েছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে একজন বাংলাদেশি যুবক নিহত, একজন আহত ও ৩ জনকে জলসীমা থেকে আটক হয়েছে।
শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্ট মাসে অন্তত ৮৪টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬৭ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৩ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এছাড়া পৃথক দুইটি ঘটনায় ২ জন গৃহকর্মীর মৃত্যু ও ১ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
এ মাসে ২৪৯ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্ট মাসে কমপক্ষে ২৪৯ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে অন্তত ৭৯ জন, যাদের মধ্যে ৪৬ (৫৮%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১৮ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে ৯৩ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে এর মধ্যে শিশু ৩৮ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৬ জন, আহত হয়েছেন ৭ জন নারী এবং ১ জন আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৪৯ জন, আহত হয়েছেন ৩১ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২৩ জন নারী।
অন্যদিকে, ২৮২ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২০৫ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, এ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায় অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে।
তিনি আরো বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, বিশেষ করে ক্যাম্পাসে সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা, শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে ঘটেছে। তবে এ মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
এ সময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সব নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।
সম্পাদক: মো: রবিউল হক। প্রকাশক: মো: আশ্রাফ উদ্দিন ।
প্রকাশক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২, টয়েনবি সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে মুদ্রিত
দেলোয়ার কমপ্লেক্স, ২৬ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা), ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে প্রকাশিত ।
মোবাইল: ০১৭৯৮৬৫৫৫৫৫, ০১৭১২৪৬৮৬৫৪
ওয়েবসাইট : dailyjanadarpan.com , ই-পেপার : epaper.dailyjanadarpan.com
Copyright © 2026 Daily Janadarpan. All rights reserved.