আজ বুধবার, সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শুভ জন্মঃ মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবন দানকারী, যুগের ইমাম, মহান সংস্কারক, আম্বিয়ায়ে কেরামের ধর্মের দায়িত্ব ও বেলায়েত লাভকারী, আল্লাহর দেয়া পুরস্কারঃ পুর্ণিমার চাঁদে বাবা দেওয়ানবাগীর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, আখেরী জমানার শ্রেষ্ঠ মহামানব ও মোহাম্মদী ইসলামের একমাত্র মোর্শেদ, আল্লাহর মহান বন্ধু সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী হুজুর ক্বেবলাজান এবং রত্নগর্বা মা জননী, কুতুবুল আকতাব, দুররে মাকনুন, খাতুনে জান্নাত হযরত সৈয়দা হামিদা বেগম দয়াল মা (রহ.)-এর জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা ইমাম ড. সৈয়দ এ. এফ. এম. নূর-এ-খোদা আল আযহারী (রহ.) ৩রা সেপ্টেম্বর, ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে নিজ নানাবাড়ী ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলাধীন চন্দ্রপাড়া গ্রামে তাঁর শ্রদ্ধেয় নানাজি সুলতানিয়া-মোজাদ্দেদিয়া তরীকার ইমাম সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ চন্দ্রপুরী (রহঃ)-এর দরবার শরীফে জন্মগ্রহণ করেন। প্রিয় নানাজী তাঁর নাম রাখেন ‘নূর-এ-খোদা’। অর্থাৎ খোদার নুর।

শৈশবকালঃ শৈশবকাল থেকেই লেখাপড়ার প্রতি ইমাম ড. সৈয়দ এ. এফ. এম. নূর-এ-খোদা আল আযহারীর প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল। প্রখ্যাত সূফী পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় সূফীবাদ তথা এলমে তাসাউফ তাঁর রক্তে মিশেছিল। তাই এলমে তাসাউফকে জগতের বুকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য ক্বালবী বিদ্যার পাশাপাশি জাহেরী বিদ্যার গুরুত্বকে তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন। তিনি ছিলেন তুখোড় মেধাবী ও অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী একজন কৃতি শিক্ষার্থী। যে কোনো বিষয় একবার শুনলেই তা তাঁর মনে তা গেঁথে যেত।

শিক্ষা জীবনঃ ইমাম ড. নুর-এ-খোদা আল-আযহারী প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন বাংলাদেশ ব্যাংক হাই স্কুল থেকে। পরবর্তীতে দিলকুশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় এক বছর অধ্যায়ন করেন। অতঃপর বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল (এসএসসি) ও আলিম (এইচএসসি) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। তারপর সূফী সম্রাট হুজুর ক্বেবলাজানের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে মিশরে গমন করে, সেখানকার বিশ্ববিখ্যাত আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ধর্মতত্ত্বের উপর উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করেন। অতঃপর তিনি মিশর হতে দেশে প্রত্যাবর্তন করে পুনরায় বাংলাদেশের অন্যতম স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দি পিপলস ইউনিভার্সিটি থেকে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে বি.এ (অনার্স) ও এম.এ পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। দি পিপলস ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সূচনালগ্ন থেকে আজ অবধি তিনিই একমাত্র শিক্ষার্থী, যিনি তাঁর সবগুলো কোর্সের পরীক্ষার উত্তর সম্পূর্ণ আরবি ভাষায় লিখেছেন। এম.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইমাম ড. নুর-এ-খোদা আল-আযহারী সম্মানিত পিতার নির্দেশে পিএইচ.ডি গবেষণা শুরু করেন। দীর্ঘদিন গবেষণার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ‘আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি’ থেকে পিএইচ.ডি ডিগ্রী লাভ করেন। তাঁর গবেষণার শিরোনাম ছিল “এজিদের চক্রান্তে মোহাম্মদী ইসলাম : একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ।
ইমাম ড. নুর-এ-খোদা আল-আযহারী আলিম ক্লাসের (এইচএসসি) ছাত্র থাকা অবস্থায় আন্তর্জাতিক ধর্মীয় পত্রিকা ‘দ্যা মেসেজ”-এ মোহাম্মদী ইসলামের আদর্শ তুলে ধরে ইংরেজি ভাষায় বেশ কিছু প্রবন্ধ লেখেন। ছাত্রাবস্থায় তাঁর লেখা ইংরেজী আর্টিকেল বিদেশি পাঠক মহলে অনেক প্রশংসিত হয়। এছাড়াও তিনি মাসিক আত্মার বাণী, সাপ্তাহিক দেওয়ানবাগ, দৈনিক ইনসানিয়াত পত্রিকায় নিয়মিত ধর্মীয় প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখতেন, যা ছিল জ্ঞান অন্বেষণকারী ও ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্যে আত্মার খোরাক।

সূফী সম্রাট হুজুর ক্বেবলাজানের প্রতিনিধি হিসেবে মিশর যাত্রার প্রাক্কালে মদিনায় হযরত রাসুল (সাঃ)-এর রওজা শরীফ জিয়ারতঃ ২০০২ ইং সালে মিশরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে মিশর গমনের প্রাক্কালে সম্মানিত পিতা হযরত দেওয়ানবাগী (রহ.) হুজুর ইমাম ড. নুর-এ-খোদা আল-আযহারীকে তাঁর প্রতিনিধি নিযুক্ত করে মিশরে প্রেরণ করেন। অতঃপর তিনি সম্মানিত পিতার অনুমতিক্রমে হযরত রাসুল (সাঃ)-এর রওজা শরীফ জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদিনা শরীফে গমন করেন। মদিনা শরীফ গিয়ে হযরত রাসুল (সাঃ)-এর পবিত্র রওজা শরীফ জিয়ারত প্রসঙ্গে তিনি বলেন–“মহান মোর্শেদ সূফী সম্রাট হুজুর ক্বেবলাজানের অনুমতি নিয়ে মদিনায় গমন করে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা প্রত্যক্ষ করি। পবিত্র মক্কা হতে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মদিনা শরীফে যাওয়ার সময় হযরত রাসূল (সাঃ)-কে মদিনাবাসীদের অভ্যর্থনা প্রদানের সেই দৃশ্যগুলো আমার চোখে ভেসে উঠে। সে সময় মদিনাবাসীদের দফ বাজিয়ে সুললিত কণ্ঠে গাওয়া “তালাআল বাদরু আলাইনা/ মিনছানি ইয়াতিল বিদায়ী/ ওয়াজাবাশ শুকরু আলাইনা/ মাদাআ লিল্লাহি দায়ী” কাসিদা আমার কানে ভেসে আসছিল। আমার মনে হচ্ছিল- আমি হযরত রাসূল (সাঃ)-এর হিজরতের কাফেলার সাথে একাত্ম হয়ে মদিনা শরীফে যাচ্ছি। মদিনায় পৌঁছে আমি হযরত রাসূল (সাঃ)-এর কদম মোবারকের কাছে অবস্থান নিয়ে মৃদু স্বরে মিলাদ পড়ে হযরত রাসূল (সাঃ)-এর রওজা শরীফ জিয়ারত করি। সে সময় আমি দেখি, দয়াল রাসূল (সাঃ) দয়া করে আমার সামনে এসে তশরীফ নিয়েছেন, তখন আমি তাঁকে কদমবুসি করি। হযরত রাসুল (সাঃ)-এর সান্নিধ্যে দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টা সময় যে কিভাবে কেটে গেল তা একটুও টের পেলাম না। আমি কখনো হযরত রাসূল (সাঃ)-কে রওজা শরীফের বেষ্টনীর ভিতরে, আবার কখনো বেষ্টনীর বাইরে দেখতে পাই। সেখানে গিয়ে হযরত রাসূল (সাঃ)-কে আমি এতটাই আনন্দিত দেখেছি, যা জীবনে কখনো ভুলবো না!”

মদিনা শরীফ থেকে মিশর গমনঃ হযরত রাসুল (সাঃ)-এর রওজা শরীফ জিয়ারত শেষে জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুর মিশরে যান এবং মিশরে গিয়ে তিনি প্রথমেই সাইয়্যেদেনা হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর মাথা মোবারকের রওজা শরীফ জিয়ারত করেন। এ প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুর বলেন-“আমি যখন শহিদকুল শিরোমণি ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর মাথা মোবারকের রওজা শরীফ জিয়ারত শুরু করলাম, তখন এক পর্যায়ে আমি অন্তর্দৃষ্টিতে দেখতে পেলাম- সাইয়্যেদেনা হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) আমার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছেন এবং আমাকে ভাই বলে সম্বোধন করে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। ঐ মুহূর্তে আমার চোখের সামনে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীসাথীগণের নিষ্ঠুর এজিদ বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদতবরণের দৃশ্যগুলো একের পর এক ভেসে উঠতে লাগল আর এসব দৃশ্য অবলোকন করে আমি অঝোর নয়নে কাঁদতে লাগলাম।”

মিশরে আল্লাহওয়ালাগণদের সাথে সাক্ষাতঃ সম্মানিত জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুর ধর্মতত্ত্বের উপর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য মিশরে বেশ কয়েক বছর অবস্থান করেছিলেন। মিশরে থাকাকালীন সময়ে সেখানকার পীর মাশায়েখ ও সুধীজন তাঁকে যথেষ্ট ভালোবাসতেন ও শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। এমনকি সেখানকার একজন বিশিষ্ট পীর জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুরের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মানের নিদর্শন হিসেবে তাঁকে নিয়মিত নজরানা প্রদান করতেন। আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দও জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুরকে খুবই স্নেহ করতেন। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত শিক্ষার্থীদের সাথে তাঁর ছিল আন্তরিক সুসম্পর্ক। মিশরের তুর পাহাড় পরিদর্শনের সময় বহু দেশ থেকে আগত ১০৩ জন দর্শনার্থী জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুর-এর ইমামতিতে সেখানে যোহরের নামাজ আদায় করেন। এছাড়াও জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুর আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে একাধিক বার যোহরের নামাজের জামাতে ইমামতি করেন। জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুর ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর রওজা শরীফ জিয়ারত করতে গেলে সেখানেও কয়েকবার তাঁর ইমামতিতে মুসুল্লীরা যোহরের নামাজ আদায় করেন। মিশর ও সৌদি আরবের পাশাপাশি তিনি ভারত, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশে ভ্রমণ করে এ সমস্ত দেশের কৃষ্টি ও সভ্যতা সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন।

আরবী ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জনঃ পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ইসলামি বিদ্যাপিঠ মিশরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুবাদে ইমাম ড. নুর-এ-খোদা আল-আযহারী আরবি ভাষায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি আরবি ভাষায় এতটাই দক্ষ ছিলেন যে, ঘন্টার পর ঘন্টা আরবি ভাষায় একটানা বক্তব্য প্রদান করতে পারতেন। তাঁর আরবি ভাষণ শুনলে মনে হতো, যেন কোনো আরব দেশীয় ব্যক্তি কথা বলতেছেন। শুধু আরবি ভাষাই নয়, তিনি ইংরেজি, উর্দু ও হিন্দি ভাষাতেও অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন এবং অনর্গল কথা বলতে পারতেন।

মোহাম্মদী ইসলাম প্রচারঃ ইমাম ড. নুর-এ-খোদা আল-আযহারী সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী হুজুর ক্বেবলাজানের বর্ণাঢ্য জীবনী মোবারকের উপর গবেষণা ও পরীক্ষা পদ্ধতি প্রচলন করেন। আশেকে রাসূল ওলামা পরিষদের সদস্যবৃন্দ অত্যন্ত আনন্দ ও আগ্রহের সাথে উক্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সূফী সম্রাট হুজুর ক্বেবলাজানের গৌরবোজ্জ্বল জীবনের নানা বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ লাভ করেন। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে মহান মোর্শেদ কেবলাজানের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ প্রচার করতেন। তিনি চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, রুপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ-সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে মাহফিল করে মোহাম্মদী ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। মোর্শেদ ক্বেবলাজানের পক্ষ থেকে মোহাম্মদী ইসলামের ইমাম ও দেওয়ানবাগ শরীফের পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে ওফাত লাভের পূর্ব পর্যন্ত জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা ইমাম ড. সৈয়দ এ. এফ. এম. নূর-এ-খোদা আল আজহারী (রহঃ) হুজুর নজিরবিহীন নিষ্ঠার সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তিনি একাধারে দেওয়ানবাগ শরীফের ধর্মতত্ত্ব বিভাগ, নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত বাবে জান্নাত দেওয়ানবাগ শরীফ এবং চট্টগ্রামে অবস্থিত বাবে মাগফিরাত দেওয়ানবাগ শরীফের পরিচালক ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন আশেকে রাসুল ওলামা পরিষদের মান্যবর প্রেসিডেন্ট। তাঁর দিকনির্দেশনা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আশেকে রাসূল ওলামা পরিষদের সদস্যবৃন্দ সূফী সম্রাট হুজুর কেবলার আদর্শ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তরুণদের নিয়ে মোহাম্মদী ইসলাম প্রচারঃ মহান মোর্শেদ সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী হুজুর ক্বেবলাজানের শিক্ষা ও আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুর ২০০৫ ইং সালে একদল তরুণকে নিয়ে আশেকে রাসুল সংঘ (ARS) নামক একটি ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এ ডিপার্টমেন্টের কর্মীদেরকে তিনি মোহাম্মদী ইসলামের ওয়াজিফার উপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে তরিকত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তাঁর এ উদ্যোগের ফলে তরুণ সমাজ মোহাম্মদী ইসলামের ওয়াজিফা এবং তরিকতের বিভিন্ন বিষয়ে সম্যক জ্ঞান অর্জনে সক্ষম হয় এবং তরিকতের আমলের প্রতি তাদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুর ইম্পেরিয়াল গার্ড (IG) নামক আরেকটি ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করে আশেকে রাসুল তরুণদেরকে দরবার শরীফে খেদমত করার সুযোগ করে দেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এ দুটি ডিপার্টমেন্টে যোগ দিয়ে অসংখ্য আশেকে রাসুল মহান মোর্শেদ ক্বেবলাজানের শিক্ষা ও আদর্শ নিজ নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়।
ইমাম ড. নুর-এ-খোদা আল-আযহারী সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী হুজুর কতৃ‍‍র্ক প্রণীত পবিত্র কুরআনের ৮ খণ্ডের তাফসীর-এর গবেষণায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।

ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মোহাম্মদী ইসলাম প্রচারঃ জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা ইমাম ড. সৈয়দ এ. এফ. এম. নূর-এ-খোদা আল আজহারী (রহ.) হুজুর ছিলেন মাই টিভিতে প্রচারিত আশেকে রাসুল জলসা এবং মোহনা টিভিতে প্রচারিত আশেকে রাসুল মজলিস নামক দুটি জনপ্রিয় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক। তাঁর উপস্থাপনায় এ দুটি টিভি চ্যানেলে প্রায় দুই শতাধিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় এ অনুষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে সারা দেশে মোহাম্মদী ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের ব্যাপক প্রচার-প্রসার হয়।

বহির্বিশ্বে মোহাম্মদী ইসলাম প্রচারঃ তিনি যে শুধু বাংলাদেশে মোহাম্মদী ইসলাম প্রচারের কাজ করেছেন, তা নয়, বরং মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব প্রভৃতি দেশেও তিনি মোহাম্মদী ইসলামের সুমহান বাণী প্রচার করেছেন এবং তাঁর দাওয়াতে এ সকল অঞ্চলের বহু মানুষ মোহাম্মদী ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেন।

বিবাহিত জীবনঃ ইমাম ড. সৈয়দ এ. এফ. এম. নূর-এ-খোদা আল আজহারী (রহঃ) হুজুর ৩১শে অক্টোবর ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে সাবেক জেলা জজ ও যুগ্ম সচিব গাজী আবদুল হান্নান সাহেবের কন্যা হযরত নুসরত শবনম টুম্পা-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ বিয়েতে উকিল ছিলেন সাবেক বিচারপতি আব্দুর রউফ। আর বিবাহিত জীবনে তিনি কন্যা সৈয়দা নাফিসা-এ-খোদা এবং পুত্র সৈয়দ মাহাদি হাসান-এর জনক ছিলেন।

প্রকৃতিপ্রেমীঃ ইমাম ড. নুর-এ-খোদা আল-আযহারী ছিলেন একজন প্রকৃতিপ্রেমী। মহান আল্লাহর সকল সৃষ্টির প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম প্রেম। তিনি গাছগাছালি ও পশুপাখির সাথে সময় কাটাতে খুব পছন্দ করতেন। এবং পশু-পাখি লালন-পালন করতে খুব পছন্দ করতেন। আর পশু-পাখিকে তিনি অত্যন্ত ভালবাসতেন। গৃহপালিত পাখি ছাড়াও নীড়হারা পাখিদের জন্য তিনি নিজের বাসার পাশের গাছগাছালিতে মাটির পাতিল দিয়ে বাসা তৈরি করে দিতেন, যাতে ওরা এসে এ বাসায় থাকতে পারে। তারপর তিনি এসব পাখিদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতেন। অনেক সময় দেখা যেত এসব পাখিরাও জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুরকে এতটাই আপন করে নিত যে, এরা তাঁর হাতে, মাথায় ও কাঁধে বসে কিচিরমিচির শব্দে আনমন যেন কি ভাব বিনিময় করতো!

শিক্ষানুরাগীঃ ইমাম ড. নুর-এ-খোদা আল-আযহারী ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী। আর্থিকভাবে অসচ্ছল অথচ মেধাবী ছাত্রদেরকে তিনি পড়াশোনা করার জন্যে আর্থিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। আবার আর্থিক অসচ্ছলতার পাশাপাশি নেশার ছোবলে আক্রান্ত হয়ে শিক্ষার আলো থেকে ঝরে পড়া অসংখ্য মেধাবী তরুণকে তিনি এসব অন্ধকার পথ হতে আলোর জগতে ফিরিয়ে এনে নিজ খরচে কলেজ-ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দিতেন এবং পড়াশোনার খরচ নিজে বহন করতেন।

মানবতাবাদীঃ তিনি ছিলেন আপন পিতার মত একজন মহান মানবতাবাদী। আত্মীয়-অনাত্মীয় ও বন্ধু মহলের মাঝে যারা ছিলেন অসুস্থ এবং আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে অক্ষম, তিনি নিয়মিত তাদের চিকিৎসার খরচ বহন করতেন। এই মানবতাবাদী ইমাম ড. নুর-এ-খোদা আল-আযহারী অসহায় ছিন্নমুল মানুষের প্রতিও ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। তাই তাদেরকে তিনি অকৃপণ হাতে আর্থিক সহযোগিতা করে যেতেন। পাশাপাশি প্রতি বছর শীতার্ত মানুষের মাঝে তিনি কম্বল ও অন্যান্য শীত বস্ত্র বিতরণ করতেন।

ধার্মিকতাঃ ইমাম ড. নুর-এ-খোদা আল-আযহারী ছিলেন তাসাউফ জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং আল্লাহ ভীরু ও ধার্মিক। তিনি দু’বার ওমরাহ পালন করেছেন এবং নামাজ-রোজা ও ইবাদত-বন্দেগীতে সর্বদা নিমগ্ন থাকতেন। অসুস্থ অবস্থাতে হসপিটালের বেডেও তিনি চোখের ইশারায় নিয়মিত পাঞ্জেগানা নামাজ আদায় করেছেন। পাশাপাশি তিনি নিয়মিত পবিত্র কুরআন পাঠ করতেন এবং সুললিত কণ্ঠে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত শুনতে অত্যন্ত পছন্দ করতেন। সর্বোপরি, তাঁর সুমহান চরিত্র এতটাই মাধুর্যপূর্ণ, কোমল ও মহিমাময় ছিল যে, তা কথার আঁখরে হাজারো শব্দ মালার সুর তরঙ্গে সাজিয়েও লেখনীর ভাষা দিয়ে তুলে ধরা কখনোই সম্ভবপর নয়।

ওফাত লাভঃ যদিও আল্লাহর অলীগণ অমর, তবুও আল্লাহপাকের বিধান অনুযায়ী তাদেরকে ওফাত লাভ করতে হয়। মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে আখেরী নবি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পর্যন্ত যত নবী-রাসুল পৃথিবীর বুকে তশরিফ নিয়েছিলেন, তাঁরা সকলেই ওফাত লাভ করেছেন। নবুয়তের যুগের ধারাবাহিকতার পর বেলায়েতের যুগে প্রেরিত অলী-আল্লাহ্গণও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ধর্মপ্রচার করার পর ওফাত লাভ করেছেন। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এই অমোঘ বিধান অনুযায়ীই মহান পিতা-মাতার স্নেহধন্য ও কলিজার টুকরা, হৃদয়ের ধন ইমাম ড. সৈয়দ এ. এফ. এম. নূর-এ-খোদা আল আজহারী (রহঃ) গত ১৬ই জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ, রোজ সোমবার, ভোররাত ৩.৫৫ মিনিটে অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী ও আশেকগণকে শোকসাগরে ভাসিয়ে দারুল বাকায় তশরিফ নেন। ওফাত লাভের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৪২ বছর ৯ মাস ১৩ দিন।
আজ জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুরের এই পবিত্র শুভ জন্ম বার্ষিকী স্মরণে এ মহামানবের প্রতি হৃদয়ের কন্দরে কন্দরে জমাকৃত ভালবাসার সুললিত শব্দ চয়নে উচ্চারণ করছি-
“হে ইমাম ড. সৈয়দ এ.এফ.এম নুর-এ-খোদা আল-আযহারী জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা হুজুর!
তুমি খোদার হেদায়েতের রাজ্যে এসেছিলে সাথে করে নিয়ে এক অবিনাশী প্রাণ!
তাই পরতে পরতে তা বিলিয়ে গেলে!
তোমার কোমল হৃদয় প্রাণ, সরলতার আবরণে ঢাকা ছিল!
তুমি ছিলে হাজারো ভক্তের প্রাণের স্পন্দন!
তোমার সান্নিধ্যের পরশে তাদের হৃদয়ে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হতো এক উচ্ছ্বসিত মহা প্রেমের নিত্য নিত্য প্রলয়!
তোমার সেই হৃদয় কাঁড়া চাহনী আর অনাবিল হাসির রেশ আজো যেন ভক্তমনে সদা জাগ্রত!
তুমি ভয়-ডরহীন এক অবিনাশী সত্বা!
তোমার মৃত্যু নেই, তুমি আমাদের মাঝ থেকে চলে যাওনি! তুমি যেতে পারো না!
তাই আপন কর্মের মাঝে তুমি বেঁচে থাকবে হাজারো জনম!
হে আল্লাহর প্রিয়পাত্র ইমাম ড. নুর-এ-খোদা আল-আযহারী!
তুমি শত-সহস্র ভক্ত-অনুরাগীর হৃদয় মাজারে অতি সন্তর্পণে গড়ে তুলেছো এক অনিন্দ্যনীয় প্রেমের স্মৃতিসৌধ!
তাই আমরা আমাদের অন্তরের সুপ্ত নগরীতে তোমার ঐ স্মৃতি সৌধকেও অতি সম্মানের সাথে লালন করবো, আর স্মরণ করবো তোমায় আমৃত্যু!
আমিন।

ধর্মীয় গবেষক, লেখক ও কলামিস্ট; সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান- প্লাস্টিক এন্ড রাবার সু মার্চেন্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।

Exit mobile version