ভূমি সেবায় ‘জিরো টলারেন্স’নীতি ঘোষণা ও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ সহ অনিয়মে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিসির
প্রকাশের তারিখঃ ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
নাগরিক সেবার প্রথম ধাপ ভূমি অফিস। অথচ নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা ভূমি অফিস ও এর অধীন ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপস্থিতি, সময়মতো অফিস না খোলা, হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষর এবং দালাল ও ঘুষের দৌরাত্ম্য বন্ধ হচ্ছে না। মন্ত্রী ও জেলা প্রশাসকের একাধিক আকস্মিক পরিদর্শনের পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সেবাগ্রহীতারা।
এ অবস্থায় ভূমি সেবাকে জনবান্ধব ও হয়রানিমুক্ত করতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির। অনিয়ম প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। বুধবার এক সাক্ষাৎকারে কথাগুলি বলেছেন জেলা প্রশাসক মো: রায়হান কবির।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরে সদর উপজেলা ভূমি অফিস পরিদর্শনে যান ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। সেখানে অফিসের বড় অংশের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অনুপস্থিত এবং হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষরের প্রমাণ পাওয়া যায়। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দুই সহকারী কমিশনার (ভূমি) সহ ২০ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
এর কয়েক মাস আগে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শনেও একই চিত্র দেখা যায়। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও অফিস তালাবদ্ধ ছিল এবং কর্মীরা অনুপস্থিত ছিলেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই মন্ত্রীর পরিদর্শনে একই চিত্র ধরা পড়ায় প্রশাসন ও সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির ও ভূমি সেবার মান নিশ্চিত ও হয়রানি বন্ধে জেলার বিভিন্ন ভূমি অফিসে একাধিকবার আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন। দালালমুক্ত ভূমি অফিস গড়তে কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৪ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে নিয়মিত মনিটরিং করছেন।
নামজারি, খতিয়ান সংশোধন, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ কিংবা রেকর্ড সংশোধন—প্রতিটি কাজেই দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। নিয়ম মেনে আবেদন করেও বিভিন্ন অজুহাতে বারবার অফিসে ডাকা হয়।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ঘুষ লেনদেন নিয়ে। একাধিক সেবাগ্রহীতার দাবি, আর্থিক সুবিধা না দিলে ফাইল নড়ে না। অনলাইনে আবেদন করেও শেষ পর্যন্ত অফিসে গিয়ে কর্মকর্তার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়।
একজন সেবাগ্রহীতা বলেন,সরকার ডিজিটাল সেবা চালু করেছে, অনলাইনে আবেদনও করছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অফিসে গিয়ে সেই আগের মতোই ঘুরতে হয়।
নারায়ণগঞ্জ শিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হওয়ায় এখানে জমির লেনদেন ও রেকর্ড সংক্রান্ত সেবার চাপ বেশি। ভূমি অফিসের অনিয়ম শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তি নয়, এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতেও।
ভূমি সেবায় শৃঙ্খলা ফেরাতে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন,ভূমি সেবাকে জনবান্ধব ও হয়রানিমুক্ত করতে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি হাতে নিয়েছি। অনিয়মের প্রমাণ পেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। নাগরিক যেন কর্মকর্তার দয়ার ওপর নির্ভরশীল না হন, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি সেবাগ্রহীতাদের উদ্দেশে বলেন, যদি আপনাদের কাছ থেকে ফাইল আটকিয়ে কেউ তালবাহানা করে, টাকার বিনিময়ে কাজ করে দেওয়ার কথা বলে বা দালালের মাধ্যমে আসতে বলে, তাহলে সাথে সাথে আমার সাথে যোগাযোগ করে অভিযোগ দিন। আমি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।আপনাদের অভিযোগেই পারে দুর্নীতিমুক্ত শতভাগ ভূমি সেবা বাস্তবায়ন করতে।
ডিসি আরও জানান,জেলার প্রতিটি ভূমি অফিসে আমার মোবাইল নম্বর টাঙিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে সেবাগ্রহীতারা কোনো অনিয়ম দেখলেই তাৎক্ষণিক ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারেন আমাকে।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি নির্দেশ দেন,নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকা, নামজারি-খতিয়ান-মিউটেশন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা, দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা।একজন নাগরিক ভূমি অফিসে কোনো ব্যক্তির কাছে নয়, রাষ্ট্রের কাছে সেবা নিতে আসেন। তাই তাঁকে যথাযথ সেবা দেওয়া সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও নৈতিক দায়বদ্ধতা। ভূমি সেবায় কোনো ধরনের গাফিলতি, অনিয়ম বা হয়রানি গ্রহণযোগ্য নয়, বলেন জেলা প্রশাসক।
বিশেষজ্ঞ ও সেবাগ্রহীতারা মনে করেন, শুধু শোকজ ও তদন্ত দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন স্থায়ী নজরদারি ও জবাবদিহি। তাদের প্রস্তাব—নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শন, বায়োমেট্রিক হাজিরা ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ যাচাই, নামজারি-খতিয়ান নিষ্পত্তিতে নির্ধারিত সময়সীমা কঠোরভাবে মানা এবং ‘ভূমিসেবায় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম’ কার্যকর করা।
দুই প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শনে ধরা পড়া চিত্র প্রশাসনের জন্য বড় সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, শোকজ ও তদন্তের পর দৃশ্যমান ব্যবস্থা আসে কিনা এবং নারায়ণগঞ্জের ভূমি অফিসগুলোতে সাধারণ মানুষ সত্যিকার অর্থে স্বচ্ছ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা পায় কিনা।
সম্পাদক: মো: রবিউল হক। প্রকাশক: মো: আশ্রাফ উদ্দিন । প্রকাশক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২, টয়েনবি সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে মুদ্রিত দেলোয়ার কমপ্লেক্স, ২৬ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা), ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে প্রকাশিত । মোবাইল: ০১৭৯৮৬৫৫৫৫৫, ০১৭১২৪৬৮৬৫৪ ওয়েবসাইট : dailyjanadarpan.com , ই-পেপার : epaper.dailyjanadarpan.com