আজ
|| || ||
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থে অবৈধভাবে রাস্তা কেটে ড্রেন নির্মাণ: চরম ভোগান্তিতে হাজার হাজার মানুষ
প্রকাশের তারিখঃ ২৪ আগস্ট, ২০২৬
গাজীপুর প্রতিনিধি:: গাজীপুর সদরের ভাওয়ালগড় ইউনিয়নে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থে সরকারি একাধিক রাস্তা অবৈধভাবে কেটে ড্রেন নির্মাণ করায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা ও পোশাক শ্রমিক। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অনুমোদন ছাড়াই বর্জ্য পানি নিষ্কাশনের ড্রেন তৈরিতে কার্পেটিং করা রাস্তাসহ একাধিক রাস্তা কেটে ফেলা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সড়কগুলো সংস্কার না করায় বর্তমানে তা সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় জেএল ফ্যাশন সহ একাধিক কারখানার বর্জ্য নিস্কাশনের ড্রেন নির্মাণ করার জন্য অবৈধভাবে এসব রাস্তা কাটা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবু বকর ছিদ্দিক প্রভাব খাটিয়ে এ রাস্তাগুলো কাটান। শুধু কারখানাই নয়, আশপাশের বসতবাড়ির ড্রেনে লাইন সংযোগের নামেও বাড়িপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এলজিইডির গাজীপুর সদর ও জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বাঘের বাজার থেকে গাজীপুর সাফারি পার্কের কার্পেটিং রাস্তাসহ মোট তিনটি সড়ক কাটা হয়েছে। এর মধ্যে একটি সড়কের উন্নয়ন প্রকল্প চলমান থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে। সেই রাস্তার ঠিকাদার বাঁধন। বাঁধনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি তখন মোটা অংকের টাকা নিয়ে রাস্তার উপর দিয়ে ড্রেন নির্মাণ করার সুযোগ দিয়েছেন। এই বিষয়ে জানতে চাইলে বাঁধন মুঠোফোনে জানান,তিনি এই বিষয়ে এলজিইডিতে অভিযোগ করেছেন। তবে অভিযোগ ঘেটে দেখা যায় তিনি গত মাসে সরকারের কাছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা জোর করে ড্রেন নির্মাণে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। রাস্তা কাটার ঘটনা অনেক আগের হলেও সম্প্রতি কেন সরকারকে তিনি জানিয়েছেন এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেনি ঠিকাদার।
তবে বাকি সড়কগুলোর কোনো সংস্কার প্রকল্প না থাকায় চলাচলের পথজুড়ে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। বর্ষার দিনে এসব গর্তে বসতবাড়ি ও বাথরুমের বর্জ্য মিশ্রিত পানি জমে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো এলাকায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খানাখন্দে ভরা এসব রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার পোশাকশ্রমিক ও সাধারণ মানুষ জীবন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। একটু বৃষ্টিতেই ড্রেনের বিষাক্ত বর্জ্য ও ময়লা পানি রাস্তায় ভেসে উঠে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
রাস্তা কেটে জনভোগান্তি তৈরির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হয়েছিল। এখন নতুন প্রেক্ষাপটেও যদি ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় দিয়ে কেউ একই অপকর্ম অব্যাহত রাখে, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?
এলাকার এক স্থানীয় বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, সরকারি রাস্তা কেটে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করা হচ্ছে, অথচ আমাদের প্রতিদিন পচা পানির ওপর দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। বৃষ্টির দিনে বাথরুমের ময়লা পানি রাস্তায় উঠে আসে। বারবার বলা সত্ত্বেও কোনো সংস্কার করা হচ্ছে না।
স্থানীয় এক পোশাকশ্রমিক বলেন, আমরা দিনরাত খেটে কারখানায় কাজ করতে যাই। এই ভাঙা আর নোংরা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে, জামাকাপড় নষ্ট হয়। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের জোর দেখিয়ে এভাবে জনদুর্ভোগ তৈরি করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অনিয়ম ও সরকারি সম্পদ ধ্বংস করার এই সংস্কৃতি দ্রুত বন্ধ করা উচিত।
সুশীল সমাজের এক প্রতিনিধি বলেন, আওয়ামী লীগের বিগত শাসনামলে আমরা ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনের শাসনহীনতা দেখেছি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও যদি নতুন করে কেউ ক্ষমতার জোর খাটিয়ে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করে বা জনগণের ভোগান্তি বাড়ায়, তবে তারা জনগণের আস্থা সম্পূর্ণ হারাবে। দলমত-নির্বিশেষে এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত এবং এলজিইডির অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো চলাচলের উপযোগী করা প্রয়োজন।
স্থানীয় পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সাফারি পার্কের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রের সড়ক এভাবে কেটে ফেলে রাখা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পর্যটন ব্যবস্থা সম্পর্কে অত্যন্ত বাজে বার্তা দিচ্ছে। সাফারি পার্কের দায়িত্বে থাকা এসিএফ তারেক রহমান জানিয়েছেন আমরা ঈদে ছুটিতে থাকা অবস্থায় রাস্তাটি কাটা হয়েছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবু বকর ছিদ্দিক বলেন,কোম্পানীর স্বার্থে নয় বরং এলাকার মানুষের স্বার্থে রাস্তা কাটা হয়েছে। অনুমোদন নেয়া হয়নি স্বীকার করে তিনি বলেন রাস্তা কাটার সময় এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী এসেছিলেন কেন অনুমোদন নেয়া হয়নি জিজ্ঞেস করেছিল তবে এলাকার স্বার্থে করা হচ্ছে বললে তিনি আর কিছু বলেনি। একটি রাস্তার কাজ হচ্ছে জানালেও বাকী রাস্তাগুলোর কি অবস্থা সে বিষয়ে মন্তব্য করেননি তিনি এছাড়াও অনৈতিক অর্থ লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।
সূত্রে জানা যায় রাস্তা কাটার সময় জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী সরেজমিনে এসেছিলেন কিন্তু পরে আর সে বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়নি এলজিইডি। তাদের এই নিরবতার পেছেন অনৈতিক অর্থ লেনদেনের হয়েছে বলেও সূত্রটি নিশ্চিত করেছে। উপজেলা সহকারি প্রকৌশলী হেলালের মাধ্যমে তৎকালীন উপজেলা ও জেলা প্রকৌশলীরা ম্যানেজ হয়েছেন বলেও সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
তবে হেলাল সে দাবি অস্বীকার করে বলেন ছিদ্দিক সাহেব যখন রাস্তা কাটেন তখন আমি ভেকুর সামনে দাঁড়িয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী স্যার কে বার বার কল দিছি, উনি কোন ব্যবস্থা না নিলে তো আমি মরতে পারবো না।
বর্তমান উপজেলা ও জেলা এলজিইডি কর্মকর্তা দুজনই নতুন। তবে এলজিইডির জেলা প্রকৌশলী এমদাদুল হক জানিয়েছেন আমরা রাস্তা কাটার বিষয়ে নোটিশ করেছি পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এসব বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক হোসেন নামে একজন প্রশাসন বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছে দাবি করে তখন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে জানান তিনি। এবিষয়ে দুদকের গাজীপুর সমন্বিত কার্যালয় অভিযোগ পেলে তদন্ত করবেন বলেও জানিয়েছেন।
সরকারি আইন অমান্য করে রাস্তা কাটার ফলে তৈরি হওয়া এই জনদুর্ভোগ নিরসনে এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ।
সম্পাদক: মো: রবিউল হক। প্রকাশক: মো: আশ্রাফ উদ্দিন ।
প্রকাশক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২, টয়েনবি সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে মুদ্রিত
দেলোয়ার কমপ্লেক্স, ২৬ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা), ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে প্রকাশিত ।
মোবাইল: ০১৭৯৮৬৫৫৫৫৫, ০১৭১২৪৬৮৬৫৪
ওয়েবসাইট : dailyjanadarpan.com , ই-পেপার : epaper.dailyjanadarpan.com
Copyright © 2026 Daily Janadarpan. All rights reserved.