গাজীপুর প্রতিনিধি-
গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী মধ্যপাড়ায় ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দায়ের হওয়া ধর্ষণচেষ্টাসহ একাধিক অভিযোগের মামলা ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একদিকে জমি বায়না করে ১১ লাখ টাকা পরিশোধ ও দখল নেওয়ার দাবি করছেন শাহ আলম রহমান খলিফা। অন্যদিকে তাঁর বিরুদ্ধে বসতবাড়িতে প্রবেশ, মারধর, হত্যাচেষ্টা, ধর্ষণচেষ্টা, চুরি ও হুমকির অভিযোগে মামলা করেছেন আয়েশা আক্তার ও তাঁর স্বামী নজরুল ইসলাম।
প্রাপ্ত বায়নাপত্র, থানায় দেওয়া অভিযোগ, মামলার এজাহার, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জমি নিয়ে বিরোধটি পুরো ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি। তবে ৩১ জুলাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বক্তব্যে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য।
১৪ লাখ টাকার বায়নাপত্র
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ জুলাই পিরুজালী মৌজার এসএ খতিয়ান নং-৯০৬, আরএস খতিয়ান নং-৪৫৯ এবং সিএস ও এসএ দাগ নং-১২৫৬, আরএস দাগ নং-২৫০৬-এর জমি থেকে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি নিয়ে শাহ আলম রহমান খলিফার সঙ্গে আয়েশা আক্তার ও নজরুল ইসলামের একটি বায়নাপত্র সম্পাদিত হয়।
ওই বায়নাপত্রে জমিটির মোট মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে বায়না বাবদ ১১ লাখ টাকা এবং অবশিষ্ট ৩ লাখ টাকা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। বায়নাকৃত জমির পরিমাণ ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ।
বায়নাপত্রে এর মেয়াদ তিন মাস নির্ধারণ করা হয়েছিল।
১১ লাখ টাকা দিয়ে জমির দখল নেওয়ার দাবি
শাহ আলম রহমান খলিফার দাবি, বায়নাপত্র সম্পাদনের সময় তিনি ১১ লাখ টাকা পরিশোধ করেন এবং এরপর জমিটির প্রাথমিক দখলও তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
প্রতিবেদকের সরেজমিন অনুসন্ধানে বিরোধপূর্ণ ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি বর্তমানে শাহ আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও জানিয়েছেন, বায়না করার পর শাহ আলম ওই জমির দখল নেন।
তবে ১১ লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়ে স্বতন্ত্র আর্থিক প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী।
আয়েশার দাবি—‘আমি কোনো জমি বায়না করিনি’
মামলার বাদী আয়েশা আক্তারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে জমি ও মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, তিনি কারও সঙ্গে কোনো জমি বায়না করেননি এবং কোনো টাকা-পয়সাও নেননি।
প্রতিবেদকের কাছে ২০২৫ সালের ৯ জুলাইয়ের বায়নাপত্রের কপি থাকার কথা জানানো হলে তিনি সেটিকে ‘মিথ্যা’ বলে দাবি করেন।
এ ছাড়া তাঁর স্বামী নজরুল ইসলামের বায়নাপত্র-সংক্রান্ত বক্তব্যের ভিডিও থাকার বিষয়টি জানানো হলেও আয়েশা সেটিও ‘মিথ্যা’ বলে দাবি করেন।
আয়েশা আরও দাবি করেন, ঘটনার সময় তাঁর কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং পরে ফোনে থাকা বিভিন্ন তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে।
ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ আয়েশার
মামলার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আয়েশা দাবি করেন, শাহ আলম রহমান খলিফা তাঁকে টানাহেঁচড়া করেন এবং ধর্ষণের চেষ্টা করেন।
ঘটনার সময় আর কেউ তাঁকে টানাহেঁচড়া করেছে কি না জানতে চাইলে তিনি শাহ আলমের নাম উল্লেখ করেন।
ঘটনাটি কেউ প্রত্যক্ষ করেছে কি না জানতে চাইলে আয়েশা বলেন, অনেকে দেখেছেন। তবে তাঁদের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট করে কারও নাম বলতে পারেননি।
৩১ জুলাইয়ের ঘটনা নিয়ে দুই পক্ষের দুই বক্তব্য
শাহ আলমের থানায় দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, ৩১ জুলাই ২০২৬ বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে আয়েশা, নজরুলসহ কয়েকজন বায়নাকৃত জমির চারপাশে বাউন্ডারি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এতে বাধা দিলে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, ২ আগস্ট জয়দেবপুর থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ৩১ জুলাই বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে শাহ আলমসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজন আয়েশার বসতবাড়িতে প্রবেশ করে তাঁকে মারধর, হত্যাচেষ্টা ও ধর্ষণচেষ্টা করেন। একই সঙ্গে চুরি ও হুমকির অভিযোগও করা হয়েছে। এজাহারে চুরি যাওয়া সম্পত্তির মূল্য ২৩ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, একই দিনের ঘটনা নিয়ে দুই পক্ষের অভিযোগে সময়, স্থান এবং ঘটনার প্রকৃতি—তিন ক্ষেত্রেই পার্থক্য রয়েছে।
শাহ আলমের দাবি—‘অভিযোগ সাজানো’
ধর্ষণচেষ্টাসহ সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাহ আলম রহমান খলিফা।
তাঁর দাবি, তিনি ১১ লাখ টাকা দিয়ে জমি বায়না করেছেন। এখন তাঁকে জমিটি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হচ্ছে না, আবার তাঁর টাকা ফেরতও দেওয়া হচ্ছে না। জমির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় তাঁকে জমি থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ প্রসঙ্গে শাহ আলম বলেন, তিনি একজন জনপ্রতিনিধি। এলাকায় তাঁর সম্পর্কে খোঁজ নিলেই প্রকৃত বিষয় জানা যাবে।
মোবাইল ফোন নিয়ে শাহ আলমের বক্তব্য
মোবাইল ফোনের বিষয়ে শাহ আলম দাবি করেন, পাশের আবুল মার্কেট এলাকা থেকে প্রায় ৫০-৬০ জন লোক নিয়ে এসে বিরোধপূর্ণ জমিতে বাউন্ডারি নির্মাণের চেষ্টা করা হয়। তিনি বাধা দিলে সেখানে কথা-কাটাকাটি হয়।
তাঁর দাবি, ওই পক্ষের লোকজনের মধ্য থেকেই একজন আয়েশার কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে দৌড়ে চলে যায়। পরে তিনি লোকজনের মাধ্যমে ফোনটি উদ্ধার করেন এবং এলাকাবাসীর সামনে সেটি ফেরত দেন।
শাহ আলমের ভাষ্য, তাঁকে ফাঁসাতেই পুরো ঘটনাটি সাজানো হয়েছে।
সরেজমিনে স্থানীয়দের বক্তব্য
প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে পিরুজালী মধ্যপাড়ায় সরেজমিনে গিয়ে বিরোধপূর্ণ জমি পরিদর্শন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলা হয়।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, বিরোধের মূল কারণ জমি। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, জমির বায়না, টাকা লেনদেন ও দখলকে কেন্দ্র করেই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ আরও দাবি করেন, ধর্ষণচেষ্টাসহ অন্যান্য অভিযোগের ঘটনাটিও মূল জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁদের ধারণা, এসব অভিযোগ সাজানো হতে পারে।
তবে স্থানীয়দের এমন দাবির পক্ষে স্বাধীন কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। ফলে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত ও দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় কয়েকজন আরও দাবি করেন, নজরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী আয়েশার সঙ্গে এর আগেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্থানীয়দের বিরোধ হয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষেও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নথি বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
নজরুলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
মামলার বাদী নজরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে ১১ লাখ টাকা লেনদেন, বায়নাপত্র, জমির দখল এবং তাঁর দায়ের করা মামলার অভিযোগের বিষয়ে তাঁর সরাসরি বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফুল আলমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মামলা রুজু হওয়ার দ্বিতীয় দিন তাঁকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি ঘটনাস্থলেও গেছেন।
তবে তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে মামলার বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
এসআই আশরাফুল আলম বলেন, মামলাটি গভীরভাবে তদন্ত করতে হবে। তদন্ত শেষে কে দোষী এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য কী, তা বলা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।
পুলিশের তদন্তেই মিলবে প্রকৃত সত্য
পুরো ঘটনায় একদিকে রয়েছে ২০২৫ সালের ৯ জুলাইয়ের বায়নাপত্র, যেখানে ১৪ লাখ টাকা মূল্য এবং ১১ লাখ টাকা বায়না দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে আয়েশা আক্তার ওই বায়নাপত্র ও টাকা লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করছেন। আবার শাহ আলমের দাবি, বায়না করার পর তিনি জমিটির দখল নেন।
অন্যদিকে আয়েশার পক্ষ থেকে শাহ আলমের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টাসহ গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে, যা শাহ আলম সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
এ অবস্থায় ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে বায়নাপত্রের বৈধতা, ১১ লাখ টাকা লেনদেনের প্রমাণ, জমির দখলের ইতিহাস, ৩১ জুলাইয়ের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের তথ্য, ভিডিও ফুটেজ বা অন্যান্য আলামত এবং পুলিশের তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা নিজেও জানিয়েছেন, গভীর তদন্তের পরই কে দোষী বা ঘটনার প্রকৃত সত্য কী, তা বলা সম্ভব হবে।
তাই জমি নিয়ে বিরোধের জেরেই মামলা হয়েছে, নাকি অভিযোগ অনুযায়ী সত্যিই ধর্ষণচেষ্টা ও অন্যান্য অপরাধের ঘটনা ঘটেছে—এ মুহূর্তে কোনো একটি পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তদন্তে পাওয়া নথি, সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণই নির্ধারণ করবে এ ঘটনার প্রকৃত সত্য।



