আজ বৃহস্পতিবার, জুলাই ৯, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশ রেলওয়ের বহুল আলোচিত “Rolling Stock Operations Improvement Project”-এ লাগেজ ভ্যান ক্রয়কে কেন্দ্র করে শত শত কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় প্রকৃত চাহিদা ও বাজার বিশ্লেষণ উপেক্ষা করে অতিরিক্ত মূল্যে লাগেজ ভ্যান ক্রয়, আর্থিক সুবিধা আদায় এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি সাধনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় রাষ্ট্রের প্রায় ৩৮৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকের প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ মাহবুব চৌধুরী, প্রকল্প পরিচালক আবুল মজিদ চৌধুরী, সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. হুমায়ুন কবির, সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. মিন্টুর রহমান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. রোকন-উর-রব্বানী, সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামানসহ একাধিক কর্মকর্তা।

অভিযোগ কী?

দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রকল্পের আওতায় ৫০টি ব্রডগেজ ৭৫টি মিটারগেজ লাগেজ ভ্যান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, এই ক্রয়ের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বাজার সমীক্ষা, প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ এবং আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাই যথাযথভাবে করা হয়নি। বরং অপ্রয়োজনীয়ভাবে অধিকসংখ্যক লাগেজ ভ্যান ক্রয়ের মাধ্যমে বিপুল ব্যয় অনুমোদন করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব লাগেজ ভ্যান থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব অর্জিত হয়নি। বরং বিপুলসংখ্যক ভ্যান দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত থাকায় সরকারের বিনিয়োগ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়।

আহমেদ মাহবুব চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ

দুদকের প্রতিবেদনে আহমেদ মাহবুব চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মে সহযোগিতা করেছেন। এতে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলা সুপারিশ

দুদক তাদের অনুসন্ধান শেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির প্রতারণা জালিয়াতিসংক্রান্ত ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়েরের সুপারিশ করেছে। তদন্তে আরও তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও আসামি করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

আইনি অবস্থান

এ বিষয়ে মনে রাখা প্রয়োজন, দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন অভিযোগের ভিত্তিতে প্রস্তুত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তারা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী নন। প্রতিবেদনে তাদের বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া থাকলে সেটিও প্রকাশ করা সাংবাদিকতার ভারসাম্যপূর্ণ চর্চার অংশ।

এদিকে রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে নাম আসার পরও আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বর্তমানে রেলওয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রেলওয়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষ্য, যাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের মামলা সুপারিশ রয়েছে, তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পদায়ন করা হলে প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, জবাবদিহি ও জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা মনে করেন, অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এমন কোনো কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত হবে না।

তবে এ বিষয়ে আহমেদ মাহবুব চৌধুরীর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

Exit mobile version