আজ
|| ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৯শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
যুবদল নেতাকে হত্যার পর কারাগারে, জামিনে বেরিয়ে আরেক নেতাকে খুন
প্রকাশের তারিখঃ ১৬ জুন, ২০২৬
গত বছরের ২২ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার সদর ইউনিয়নের যুবদলের নেতা মো. ইব্রাহিমকে দোকানে ডেকে নিয়ে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তদন্তে নেমে দিদারুল আলমকে শনাক্ত করে পুলিশ। অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়। মামলাটিতে উচ্চ আদালত থেকে ওই বছরের ২০ অক্টোবর জামিন পান দিদারুল। তার আগেও ২০২৪ সালে একটি চুরির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বেরিয়ে যান দিদারুল।
গত ১৩ জুন রাউজানের বাগোয়ান এলাকায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরীকে (৪৫) কাছে থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই-বাছাই করে দিদারুলের উপস্থিতি নিশ্চিত হয় পুলিশ।
জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমাদের অভ্যন্তরীণ ওয়েবসাইটে খোঁজ নিয়ে দিদারুলের বিরুদ্ধে অন্তত ৯টি মামলা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাকলিয়া থানার হত্যা এবং বিভিন্ন থানায় ডাকাতি ও চুরির মামলা পাওয়া গেছে। প্রতিবারই এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দ্রুত সময়ে কারামুক্ত হন তিনি।
রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, রাউজানের যুবদল নেতা ইব্রাহিম হত্যা মামলায় দিদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি উচ্চ আদালত থেকে ৬ মাসে জামিনে বেরিয়ে যান।
১৩ জুন গুলিতে নিহত মাকসুদুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পিয়ারুল হক চৌধুরীর ছোট ভাই। আগামী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। এ লক্ষ্যেই এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানায়, রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীর খুব কাছের লোক ছিলেন মাকসুদুল। হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে না জানালেও স্থানীয়ভাবে কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন এবং আধিপত্য বিস্তারের বিরোধের বিষয়টি আলোচনায় আসছে। রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী বাজার-সংলগ্ন চম্পাতলী ঘাট এলাকার একটি বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতেন নিহত মাকসুদুল। একই সঙ্গে রাঙ্গুনিয়ার সীমান্তবর্তী রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলার ঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদীপাড়ের আরেকটি বালুমহালও তার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
বেতাগী ইউনিয়নের বাসিন্দা মোখলেছুর রহমান বলেন, খুনের তদন্তে বালুমহাল সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা উচিত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাকসুদের ওপর হামলাকারীরা সবাই সশস্ত্র ছিলেন। তাদের মধ্যে দুজনের হাতে শটগান এবং তিনজনের হাতে পিস্তল ছিল। গুলির মুখে জীবন বাঁচাতে মাকসুদুল দৌড়ে একটি দোকানের সামনে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। সেখানে তাকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়া হয়। একপর্যায়ে হামলাকারীদের দুজন খুব কাছ থেকে গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।
হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া এক যুবকের মুখে কালো মুখোশ থাকলেও সিসিটিভি ফুটেজে বাকিদের চেহারা স্পষ্ট দেখা গেছে। ফাঁকা গুলি ছোঁড়ার সময় তারা স্থানীয়দের ঘটনাস্থলে আসতে নিষেধ করে এবং দ্রুত দোকানপাট বন্ধ করে চলে যাওয়ার হুমকি দেয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচ অস্ত্রধারীই স্থানীয় শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তারা হলেন- ধামা ইলিয়াস, দিদারুল আলম, মো. আফসার, মো. ইউসুফ ও মো. জাবেদ। এছাড়া সহযোগী হিসেবে মিশনে যোগ দেয় মো. আইয়ুব, মোম ইউসুফ ও মো. পারভেজ নামের স্থানীয় দুই সন্ত্রাসী। চিহ্নিতদের মধ্যে শটগান হাতে থাকা ধামা ইলিয়াস ও আফসারের বাড়ি কদলপুর ইউনিয়নে। পিস্তলধারী দিদারুল আলমের বাড়ি নগরের পাঁচলাইশ এলাকায় এবং মো. ইউসুফের বাড়ি রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে। সহযোগী পারভেজের বাড়ি গশ্চি ইউনিয়নের নোয়াহাট এবং আইয়ুবের বাড়ি কদলপুর ইউনিয়নে। পুলিশ জানায়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুন, সন্ত্রাস ও অপহরণসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
>>মামলা হয়নি, গ্রেপ্তার আসামিকে ৫৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ
মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের দুদিন পার হলেও এখনো মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মুহাম্মদ জাকির (৪২) নামে সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহতের পরিবারের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তারা লিখিত এজাহার দায়ের করতে আসবেন বলে জানিয়েছেন। আশা করছি খুব দ্রুতই মামলা হবে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় জাকির নামে এক ব্যক্তিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় ৪-৫ জন অস্ত্রধারী ছিল। জড়িত সবাইকে শনাক্ত করা হয়েছে, তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পরিবার থানায় এলে এবং পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো খতিয়ে দেখলে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ আরও স্পষ্ট হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই রাউজানে সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাটিতে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হয়। বর্তমানে ফজলে করিম গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকলেও তার পতনের পর সৃষ্ট ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রাউজানকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। দিন-রাত অস্ত্রের মহড়া, প্রকাশ্যে গুলি, বাড়িতে ঢুকে হত্যা, অপহরণের পর মরদেহ উদ্ধার কিংবা চলন্ত গাড়িতে গুলি করে হত্যার মতো ঘটনা এখন অনেকটাই এ জনপদের নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, চাঁদাবাজি এবং পাহাড় ও নদীর বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। আতঙ্কে সন্তানদের বাইরে যেতে দিচ্ছেন না অভিভাবকরা। মাকসুদুলসহ গত ২২ মাসে উপজেলায় অন্তত ২৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডই রাজনৈতিক বিরোধ ও সন্ত্রাসী দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিহতদের বড় একটি অংশ বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।
সবশেষ মাকসুদুল হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি হাসান মোহাম্মদ জসিম বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনো দল-নেতা নেই। তারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপকর্ম করে থাকে। রাজনীতিবিদদেরও বুঝতে হবে, দাগি সন্ত্রাসীদের বুঝেশুনে কাছে টানতে হবে। আমি সন্ত্রাসীদের পক্ষে নই, আমি এসব খুনিকে ঘৃণা করি।
সম্পাদক: মো: রবিউল হক। প্রকাশক: মো: আশ্রাফ উদ্দিন ।
প্রকাশক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২, টয়েনবি সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে মুদ্রিত
দেলোয়ার কমপ্লেক্স, ২৬ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা), ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে প্রকাশিত ।
মোবাইল: ০১৭৯৮৬৫৫৫৫৫, ০১৭১২৪৬৮৬৫৪
ওয়েবসাইট : dailyjanadarpan.com , ই-পেপার : epaper.dailyjanadarpan.com
Copyright © 2026 Daily Janadarpan. All rights reserved.