আজ
|| ১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৭শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
রেমিট্যান্সের প্রশংসা দেশের অর্থনীতির নীরব নায়ক প্রবাসীরা আজ কতটা নিরাপদ? মোস্তানছিরুল হক চৌধুরী
প্রকাশের তারিখঃ ১৪ জুন, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা লাখো প্রবাসী দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে যে রেমিট্যান্স দেশে পাঠান, তা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করে এবং জাতীয় উন্নয়নের ধারাকে সচল রাখে। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পেছনে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য।
প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। অনেক সময় বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলায়ও প্রবাসীদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের লাখো পরিবার তাদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল। একজন প্রবাসীর ঘাম, শ্রম এবং ত্যাগের বিনিময়ে একটি পরিবার যেমন বেঁচে থাকে, তেমনি দেশের অর্থনীতিও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দেশের অর্থনীতির এই অক্লান্ত যোদ্ধারাই আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলা, হয়রানি, প্রতারণা এবং নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। প্রবাসীদের নিয়ে আমরা গর্ব করি, তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের হিসাব তুলে ধরি, কিন্তু তাদের কষ্ট, বেদনা, সংগ্রাম এবং অধিকার নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়। প্রশ্ন হলো যারা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে, তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?
বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় অনেক মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে কিংবা ধারদেনা করে বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তারা দালাল চক্রের প্রতারণার শিকার হন। বিদেশে যাওয়ার আগে তাদের সামনে যে স্বপ্ন দেখানো হয়, বাস্তবে গিয়ে তার সঙ্গে অনেক সময় কোনো মিল পাওয়া যায় না। ভালো বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাঠানো হলেও সেখানে গিয়ে দেখা যায় বেতন কম, কাজ বেশি এবং পরিবেশ অমানবিক।
অনেক প্রবাসী শ্রমিক অভিযোগ করেন, তাদের নিয়োগপত্রে উল্লেখিত শর্তগুলো মানা হয় না। চুক্তি অনুযায়ী বেতন দেওয়া হয় না, অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয় এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মাসের পর মাস বেতন আটকে রাখা হয়। শ্রমিকরা ন্যায্য পাওনা চাইলে হুমকি, ভয়ভীতি কিংবা চাকরি হারানোর ঝুঁকির মুখে পড়েন।
প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর মধ্যে একটি হলো দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে যেখানে শ্রমিকরা বছরের পর বছর দেশে আসতে পারেন না। কেউ কেউ পাঁচ-ছয় বছর কিংবা তারও বেশি সময় ছুটি না পেয়ে বিদেশে মানবেতর জীবনযাপন করেন। পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতা, সন্তানের জন্ম, মা-বাবার মৃত্যু কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক মুহূর্তেও তারা পাশে থাকতে পারেন না। একজন প্রবাসীর এই মানসিক যন্ত্রণা কোনো পরিসংখ্যানের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক প্রবাসী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত কিছু শ্রমিক এবং গৃহকর্মী নারী নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই উঠে আসছে। গৃহকর্মী নারীরা অনেক সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকেন। তাদের কাজের নির্দিষ্ট সময় থাকে না, অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগের স্বাধীনতা সীমিত থাকে এবং নির্যাতনের শিকার হলেও অভিযোগ জানানোর সুযোগ পান না।
প্রবাসীদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভিসা, আকামা বা ওয়ার্ক পারমিট সংক্রান্ত জটিলতা। অনেক সময় নিয়োগকর্তার গাফিলতি বা অসাধু আচরণের কারণে শ্রমিকরা আইনি জটিলতায় পড়ে যান। তখন তারা দেশে ফিরতেও পারেন না, আবার স্বাভাবিকভাবে কাজও করতে পারেন না। অনেকেই অবৈধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন, যা তাদের জীবনে নতুন সংকট তৈরি করে।
আইনি সহায়তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে একজন শ্রমিক যখন অন্যায়ের শিকার হন, তখন তার প্রথম আশ্রয় হওয়ার কথা বাংলাদেশ দূতাবাস। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রবাসী অভিযোগ করেন, তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান না বা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। একজন নির্যাতিত প্রবাসীর জন্য দ্রুত আইনি সহায়তা, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত।
বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও অনেক প্রবাসী চরম ভোগান্তির শিকার হন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসংখ্য বাংলাদেশি শ্রমিক গাদাগাদি করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হন। বিশুদ্ধ পানি, পর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং নিরাপত্তা সুবিধার অভাব তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। অসুস্থ হয়ে পড়লেও অনেক সময় যথাযথ চিকিৎসা পান না।
দেশে আসা-যাওয়ার সময়ও অনেক প্রবাসী হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন। বিমানবন্দর, ইমিগ্রেশন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। যারা বছরের পর বছর দেশের বাইরে থেকে দেশের জন্য অর্থ পাঠান, তাদের জন্য দেশে ফেরার অভিজ্ঞতা কখনোই হয়রানির হওয়া উচিত নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু অসাধু ব্যক্তি ও চক্র প্রবাসীদের অসহায়ত্বকে ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। নিজেদের দেশের মানুষ হয়েও তারা প্রবাসীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে, তাদের অধিকার হরণ করছে এবং কষ্টকে পুঁজি করে লাভবান হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, যারা প্রবাসীদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়? কেন বারবার অভিযোগ ওঠার পরও অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান বিচার পাওয়া যায় না?
বাংলাদেশের প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ নন; তারা দেশের অর্থনৈতিক যোদ্ধা। তাদের শ্রম, ঘাম এবং ত্যাগের বিনিময়ে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। তাই তাদের সমস্যাকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে নয়, জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আমি মনে করি, প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, বিদেশগামী কর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং প্রবাসীবান্ধব করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রবাসীদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত সমাধানের জন্য একটি আধুনিক, স্বচ্ছ এবং সহজলভ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, নির্যাতিত শ্রমিকদের আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। পঞ্চমত, দেশে আসা-যাওয়ার সময় প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আজ সময় এসেছে শুধু রেমিট্যান্সের পরিসংখ্যান নিয়ে গর্ব করার নয়, বরং যারা সেই রেমিট্যান্স অর্জন করছেন তাদের জীবন, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং অধিকার নিশ্চিত করার। রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ সবার সম্মিলিত দায়িত্ব হলো প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানো।
প্রবাসীদের কান্না, কষ্ট ও ত্যাগ কখনোই অবহেলার বিষয় হতে পারে না। যারা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছেন, তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। প্রভাবশালী ব্যক্তি, অসাধু নিয়োগদাতা কিংবা দালাল চক্র যেই অন্যায় করুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে কোনো প্রবাসী শ্রমিক প্রতারণার শিকার হবেন না, কোনো প্রবাসী নারী নির্যাতনের ভয় নিয়ে কাজ করবেন না, কোনো শ্রমিক মাসের পর মাস বেতন থেকে বঞ্চিত হবেন না এবং কোনো প্রবাসী ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরবেন না।
প্রবাসীরা দেশের গর্ব, অর্থনীতির প্রাণশক্তি এবং উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা মানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করা। তাই আসুন, আমরা প্রবাসীদের শুধু অর্থনীতির অবদানকারী হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের প্রকৃত অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করি এবং তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে একযোগে কাজ করি।
লেখক:
মোঃ মোস্তানছিরুল হক চৌধুরী
যুগ্ম সদস্য সচিব, নাগরিক ছাত্র ঐক্য কেন্দ্রীয় সংসদ
ই-মেইল: mostansirolhoque@gmail.com
সম্পাদক: মো: রবিউল হক। প্রকাশক: মো: আশ্রাফ উদ্দিন ।
প্রকাশক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২, টয়েনবি সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে মুদ্রিত
দেলোয়ার কমপ্লেক্স, ২৬ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা), ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে প্রকাশিত ।
মোবাইল: ০১৭৯৮৬৫৫৫৫৫, ০১৭১২৪৬৮৬৫৪
ওয়েবসাইট : dailyjanadarpan.com , ই-পেপার : epaper.dailyjanadarpan.com
Copyright © 2026 Daily Janadarpan. All rights reserved.