# জলবায়ু লাল সংকেত ‘পরম রক্ষাকর্তা নীরবে মৃত্যুর প্রহর গুনছে’# প্রকৃতিও নিচ্ছে পাল্টা প্রতিশোধ- ‘সে কাউকে ক্ষমা করেনি’এসএম শামসুজ্জোহা : ‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো, তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছো ভালো?’ পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ থেকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন প্রশ্ন রেখেছিলেন তাঁর ‘প্রশ্ন’ কবিতায়। এখন চারপাশের প্রকৃতির রুদ্র রূপে বোঝা যায়, প্রকৃতি কাউকে ক্ষমা করেনি। বৃষ্টি, বন্যা, খরা, দাবানল, শুষ্কতা মিলে সারা বিশ্বে প্রকৃতির যে অদ্ভুতুড়ে অবস্থা, তা যেন প্রকৃতির প্রতিশোধ। জলবায়ুর গ্যাঁড়াকলে প্রকৃতি ভুলেছে তার নিয়ম। প্রকৃতি এখন তাই এমন পাগলাটে। এর আগে এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘আমরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। এখন প্রকৃতিও পাল্টা প্রতিশোধ নিচ্ছে। এসব কারণে ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে’।
জানা যায়, বাংলাদেশ প্রকৃতিগতভাবেই নদীমাতৃক ও দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দেশের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে মাত্রায় দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, তা শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের জীবনযাত্রা, প্রকৃতি, অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক কাঠামোকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। জলবায়ুর অভিঘাতে বাংলাদেশ আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতির পরম রক্ষাকর্তা গাছ আজ মানুষের লোভ ও অবিচারের কারণে সত্যিই নীরবে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। বন উজাড়, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর সবুজ ফুসফুস আজ ধ্বংসের মুখে।
বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ। ঋতুভেদে আলাদা আমেজ উপভোগ করা যায় বাংলাদেশে। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ছাড়াও ঋতুভেদে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, নদীভাঙন, ভূমিধস ইত্যাদি মিলিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য ঝুঁঁকিপূর্ণ এলাকা বলা হয় বাংলাদেশকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের ঋতুচক্রের হেরফেরের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও হেরফের ঘটছে। অর্থাৎ, আগের মতো দুর্যোগের সেই স্বাভাবিক চিত্রটি এখন আর নজরে পড়ছে না। এর প্রধান কারণই হচ্ছে তাপমাত্রার পরিবর্তন বা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। যার প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রস্তরের উচ্চতা, মরুকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাদেশে জলবায়ুগত স্থূল পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে। ফলে বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে নদ-নদীর পানিপ্রবাহ শুকিয়ে যাচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সাবরিনা নাজ এ প্রতিবেদকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের মরুকরণ প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্বখ্যাত মরুভূমি গবেষকরা বাংলাদেশকে সতর্কও করে আসছেন বারবার। দেশের এ সমস্যাগুলোকে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’ বা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অধ্যাপক ড. সাবরিনা আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের গতি দ্রুততর হচ্ছে এবং আমাদের গ্রহের উষ্ণায়ন এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল রেকর্ডকৃত সর্বোচ্চ উষ্ণ বছরগুলোর একটি এবং অক্টোবর ২০২৫ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক ইতিহাসের সর্বাধিক উষ্ণ অক্টোবরগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সম্প্রতি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু’ শীর্ষক নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের জলবায়ু সংকট নিয়ে গভীর এসব উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, প্রকৃতির বিরুপ প্রভাব ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। এদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণ ও লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে বাইন ও সুন্দরীগাছসহ অন্যান্য গাছের আগামরা রোগ দেখা দিয়েছে। তাতে আবার নানান ধরনের পাতাখেকো কীটের আবির্ভাবও ঘটছে। এখানে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে কীটপতঙ্গের সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গ কেন টানা হচ্ছে। আসলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ইকোসিস্টেমের বিষয়টি জড়িত রয়েছে। কোনো অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তন হলে সেই অঞ্চলের প্রকৃতি, প্রাণিকুল অথবা কীটপতঙ্গের জীবনধারায়ও পরিবর্তন চলে আসে। এমনও হয়, সেই অঞ্চলের প্রাণিকুলের বিলুপ্তি ঘটে নতুন প্রাণিকুলের সৃষ্টি হয়।
মূলতঃ এভাবে অত্র অঞ্চলের জলবায়ুর প্রভাবে বিভিন্ন প্রজাতির কীটের আবির্ভাব হচ্ছে। যেমন- সুন্দরবনেও বিভিন্ন প্রজাতির কীট জন্মেছে। আর গাছগাছালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ ও জলবায়ু অর্থায়ন বিশ্লেষক এম জাকির হোসেন খান ফোনে বলেন, জলবায়ুর প্রভাবে এভাবে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে বাংলাদেশে ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় পৌনে ২ কোটি মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গৃহহীন হয়ে পড়তে পারে। শিল্পোন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে ১০ হাজার কোটি ডলার বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করা হয়নি বলেন এই বিশ্লেষক।
প্রকৃতির এমন অদ্ভুত আচরণে বিপর্যস্ত মানুষ। আর এই মানুষই প্রকৃতিকে এমন করে তুলেছে। সেই কবে রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর, লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর’। এরপরও কেটেছে কত যুগ। অরণ্য আর ফেরেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শুধু সুন্দরবনেই নয়, দেশের বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, তেমনি অনেক প্রজাতির পাখপাখালি, জীবজন্তু, ফুলফল, গাছগাছালি দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। ইউনেসকোর ‘জলবায়ুর পরিবর্তন ও বিশ্ব ঐতিহ্যের পাঠ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের প্রায় ৭৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, তাতে দেশের বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাসের কারণে পরিবেশের ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা বলছে, দেশের উপকূলবর্তী প্রায় ৫৩ শতাংশ অঞ্চল লবণাক্ততা দ্বারা সরাসরি আক্রান্ত। চিরসবুজ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপর লবণাক্ততার প্রভাব বেড়েই চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃহৎ ও পুরোনো গাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। যে হারে বৃহৎ ও প্রাচীন গাছগুলোর সংখ্যা কমছে, তাতে বনাঞ্চলগুলোতে কম বয়সি গাছের প্রাধান্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছোট হয়ে যাচ্ছে বনাঞ্চলের আকারও। ফলে জলবায়ুর পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় জানিয়েছেন, প্রাচীন গাছগুলো হলো মাইকোরাইজাল সংযোগের উত্তম কেন্দ্র এবং হটস্পট। ভূগর্ভস্থ ছত্রাকের সঙ্গে সিম্বিওটিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে শতাব্দীর প্রাচীন গাছ ভূগর্ভস্থ ছত্রাককে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি সরবরাহ করে। ছত্রাকের সঙ্গে শতাব্দীর প্রাচীন গাছ সিম্বিওটিক সম্পর্ক খরা কমাতে সাহায্য করে। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এ শতাব্দীতে প্রাচীন গাছগুলোকে সংরক্ষণের জন্য কোনো ভূমিকা নেয়া হচ্ছে না। যার ফলে পৃথিবীর বুক থেকে এ দীর্ঘজীবী গাছগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। অনেক আগেই লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাস দিয়ে ‘আরণ্যক’-এর সমাপ্তি টেনেছেন এভাবে, ‘হে অরণ্যাণীর আদিম দেবতারা, ক্ষমা করিও আমায়।’ দৈনন্দিন প্রয়োজনে, প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে যুগের পর যুগ ধরে প্রকৃতিকে আমরাও ধ্বংস করছি। আর তাই এবার প্রকৃতির শোধ নেওয়ার পালা।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন ড. ফাতিমা আকতার জনদর্পণ’কে বলেন, ‘শুধু গবেষণার পরিসংখ্যান নয়, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রভাব প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছি। আমাদের কৃষি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। ভবিষ্যতে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, অবকাঠামো আরও ঝুঁঁকির মুখে পড়তে পারে।’ জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশের পরিবেশ হুমকি মুখে পড়ছে। একদিকে উন্নত রাষ্ট্রগুলো মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছপালা কাটা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে পাঁচ হাজার প্রজাতির দেশীয় গাছ থাকলেও বর্তমানে তা তিন হাজার ৮২৮ প্রজাতিতে এসে দাঁড়িয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ প্রাচীন গাছগুলোকে সংরক্ষণের জন্য কোনো ভূমিকা নেয়া হচ্ছে না। যার ফলে পৃথিবীর বুক থেকে দীর্ঘজীবী গাছ হারিয়ে যাচ্ছে এবং অপরিকল্পিত সবুজায়ন’। এছাড়াও বিদেশ থেকে দ্রুত বর্ধনশীল বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ আমদানি করা হচ্ছে জানিয়ে ফাতিমা আকতার বলেন, এসব বৃক্ষ জ্বালানি সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখছে ঠিকই, কিন্তু ক্রমাগত মাটি ও পরিবেশের সর্বনাশ করে চলছে।
নি- ০৫/২৬
সম্পাদক: মো: রবিউল হক। প্রকাশক: মো: আশ্রাফ উদ্দিন । প্রকাশক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২, টয়েনবি সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে মুদ্রিত দেলোয়ার কমপ্লেক্স, ২৬ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা), ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে প্রকাশিত । মোবাইল: ০১৭৯৮৬৫৫৫৫৫, ০১৭১২৪৬৮৬৫৪ ওয়েবসাইট : dailyjanadarpan.com , ই-পেপার : epaper.dailyjanadarpan.com