দেশের জ্বালানি খাতের ওপর জেঁকে বসা অনিশ্চয়তার মেঘ কাটতে শুরু করেছে। ডলার সংকট আর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েছে সরকার। গত এপ্রিল মাসে দেশে রেকর্ড পরিমাণ ছয় লাখ পাঁচ হাজার ২২৭ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছে। আমদানির এই জোয়ার অব্যাহত থাকছে মে মাসেও।
চলতি মাসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তিন ধাপে তিন লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর ফলে দীর্ঘ তিন সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর আগামী সপ্তাহেই উৎপাদনে ফিরছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল)।
ক্রুড অয়েলের অভাবে গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি থেকে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত ইআরএল। দেশের একমাত্র এই শোধনাগারটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে টান পড়ার উপক্রম হয়েছিল।
তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) সমন্বিত তৎপরতায় সেই সংকট এখন কাটার পথে।
বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন ‘এরাবিয়ান লাইট ক্রুড’ নিয়ে বিশাল ট্যাংকার ‘এমটি নিনেমিয়া’ গত ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। বর্তমানে জাহাজটি ভারত মহাসাগর অতিক্রম করছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল বুধবার জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এসে পৌঁছাবে।
বিএসসির মহাব্যবস্থাপক (চার্টারিং অ্যান্ড ট্রাম্পিং) ক্যাপ্টেন মো. মুজিবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ৬ মে থেকেই জাহাজটি থেকে লাইটারিং (ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তর) শুরু হবে এবং ৭ মে নাগাদ ইস্টার্ন রিফাইনারি পুনরায় তাদের রিফাইনিং ইউনিট চালু করতে পারবে।
শুধু সৌদি আরব নয়, জ্বালানি আমদানির উৎস হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও বড় পরিসরে যুক্ত করা হয়েছে। আগামী ১০ মে আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকে আরো এক লাখ টন ‘মারবান ক্রুড’ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হবে ‘এমটি ফসিল’ নামের একটি জাহাজ। এরই মধ্যে জাহাজটি ফুজাইরা বন্দরের পথে রয়েছে। এ ছাড়া চলতি মে মাসের শেষ সপ্তাহে সৌদি আরবের ইয়ানবু থেকে আরো এক লাখ টনের একটি চালানের শিডিউল চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
অর্থাৎ মে মাসেই মোট তিন লাখ টন অপরিশোধিত তেল দেশে আসছে, যা দিয়ে আগামী কয়েক মাস ইস্টার্ন রিফাইনারি নির্বিঘ্নে চলতে পারবে।
বিপিসির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত মার্চ মাসে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে এবং লজিস্টিক সমস্যার কারণে জ্বালানি আমদানিতে কিছুটা ধীরগতি ছিল। সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়। ফলে গত মাসে ২০টি জাহাজের মাধ্যমে মোট ছয় লাখ পাঁচ হাজার ২২৭ টন বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে। এর মধ্যে চার লাখ ৬৩ হাজার টন তেল এরই মধ্যে বিপিসি গ্রহণ করে বিভিন্ন ডিপোতে মজুদ করেছে।
মে মাসেও একই গতি বজায় থাকছে। বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ও বাণিজ্য) মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন বলেন, ‘মে মাসে আমরা ১৭টি জাহাজে করে প্রায় তিন লাখ টন পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনার পরিকল্পনা করেছি। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির কোনো ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে।’


