আজ
|| ৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২২শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১৭ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
শুধু সরকারি নয় সব বাসেই শিক্ষার্থীদের হাফ পাস নিশ্চিত করতে হবে: মোস্তানছিরুল হক চৌধুরী
প্রকাশের তারিখঃ ৪ মে, ২০২৬
বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য গণপরিবহনে হাফ পাস কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক প্রয়োজন। শিক্ষা গ্রহণের জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে বাসে চলাচল করতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সরকারি বাসে সীমিতভাবে হাফ পাস চালু থাকলেও বেসরকারি পরিবহনগুলোতে এই সুবিধা কার্যত উপেক্ষিত। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তি, হয়রানি এবং আর্থিক চাপের শিকার হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকায় কিছু পরিবহন হাফ পাস দিলেও সেটিও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর নয়। অনেক বাসে সর্বনিম্ন ২০ টাকা ভাড়া নেওয়ার অজুহাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া না নিয়ে প্রায় পূর্ণ ভাড়া আদায় করা হয়। এতে হাফ পাসের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই সুবিধা শুধু ঢাকার কিছু রুটেই সীমাবদ্ধ, চট্টগ্রামসহ দেশের অধিকাংশ জেলায় শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো হাফ পাস ব্যবস্থা নেই।
একজন শিক্ষার্থীর আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিজস্ব আয়বিহীন, পরিবারের উপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য যদি পূর্ণ ভাড়া দিতে হয়, তাহলে মাস শেষে সেই ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এটি শিক্ষার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে।
সরকার ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের হাফ পাস নিয়ে নীতিগত কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। বেসরকারি বাস মালিক ও শ্রমিকরা অনেক ক্ষেত্রে এই নির্দেশনা মানতে অনাগ্রহী। ফলে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ না থাকায় শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে গণপরিবহন কি শুধুই ব্যবসার জন্য, নাকি এটি জনসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ? বাস্তবতা হলো, গণপরিবহন একটি পাবলিক সার্ভিস, যেখানে সামাজিক দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ পাস চালু করা কোনো ক্ষতি নয়; বরং এটি একটি বিনিয়োগ, যা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়ক।
বিশ্বের অনেক দেশেই শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহনে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। এমনকি অনেক উন্নত দেশে শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে বা অত্যন্ত কম ভাড়ায় যাতায়াত করতে পারে। বাংলাদেশেও যদি একটি শিক্ষাবান্ধব সমাজ গড়ে তুলতে চাই, তাহলে এই ধরনের উদ্যোগগুলোকে সর্বজনীন করতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে নীতির অভিন্নতা নেই। কোথাও হাফ পাস আছে, কোথাও নেই; কোথাও আছে কিন্তু সঠিকভাবে প্রয়োগ হয় না। এই বৈষম্য দূর করতে হলে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে দেশের সব গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক হাফ পাস কার্যকর করতে হবে।
এছাড়া মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন। বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। হাফ পাস না দিলে বা শিক্ষার্থীদের হয়রানি করলে সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিক ও চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার মতো কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
শুধু আইন করলেই হবে না, শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তাদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে এবং অন্যায় হলে প্রতিবাদ করতে হবে। একই সঙ্গে ছাত্র সংগঠনগুলোকে এই ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যাতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নেয়।
এক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেমন ডিজিটাল স্টুডেন্ট আইডি কার্ড বা স্মার্ট কার্ড চালু করে সহজেই যাচাই করা যেতে পারে কে শিক্ষার্থী। এতে করে ভাড়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক বা হয়রানির সুযোগ কমে যাবে। একই সঙ্গে বাসে নির্দিষ্ট নির্দেশনা ও হেল্পলাইন নম্বর থাকলে শিক্ষার্থীরা দ্রুত অভিযোগ জানাতে পারবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাস মালিকদের আশঙ্কা দূর করা। অনেক মালিক মনে করেন হাফ পাস চালু করলে তাদের আয় কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় যাত্রীসংখ্যা বাড়ে এবং মোট আয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে না। বরং একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের জন্য লাভজনক।
সর্বোপরি, শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ পাস নিশ্চিত করা মানে শুধু ভাড়া কমানো নয়; এটি শিক্ষার সুযোগকে সহজ করা, সামাজিক বৈষম্য কমানো এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তাই এই দাবি শুধু একটি সংগঠনের নয়, এটি দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকের দাবি হওয়া উচিত।
সরকার, বাস মালিক, শ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি আহ্বান শিক্ষার্থীদের এই ন্যায্য দাবিকে গুরুত্ব দিন। শুধু সরকারি বাস নয়, দেশের প্রতিটি বাসে হাফ পাস বাধ্যতামূলক করুন। শিক্ষার্থীদের হয়রানি বন্ধ করুন এবং একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলুন।
আজকের শিক্ষার্থীই আগামীর বাংলাদেশ। তাদের জন্য সামান্য এই সুবিধা নিশ্চিত করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করানো।
সম্পাদক: মো: রবিউল হক। প্রকাশক: মো: আশ্রাফ উদ্দিন ।
প্রকাশক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২, টয়েনবি সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে মুদ্রিত
দেলোয়ার কমপ্লেক্স, ২৬ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা), ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে প্রকাশিত ।
মোবাইল: ০১৭৯৮৬৫৫৫৫৫, ০১৭১২৪৬৮৬৫৪
ওয়েবসাইট : dailyjanadarpan.com , ই-পেপার : epaper.dailyjanadarpan.com
Copyright © 2026 Daily Janadarpan. All rights reserved.