আজ
|| ৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
৫০ হাজার টন অকটেন আমদানির পরিকল্পনা বিপিসির
প্রকাশের তারিখঃ ৩ মে, ২০২৬
চাহিদা অুনযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে এপ্রিল মাসে ৫৩ হাজার ৩৬৪ টন অকটেন আমদানি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আগামী দুই মাসে আরও ৫০ হাজার টন অকটেন আমদানি করবে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ডিজেল ও ক্রুড অয়েল আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বিপিসি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চ মাসের শুরু থেকে দেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট তৈরি হয়। বিশেষ করে অকটেনের স্বল্পতা চোখে পড়ে বেশি। অধিকাংশ রিফুয়েলিং স্টেশন তেলশূন্য হয়ে পড়ে। পাশাপাশি যেসব পাম্পে তেল ছিল, সেসব পাম্পে তৈরি হয় লম্বা লাইন। ১০-১২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে গিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তি পৌঁছায় চরম পর্যায়ে।
এমতাবস্থায় সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে রেশনিং সিস্টেম চালু করে। পরে তা তুলে নিয়ে ২৫ শতাংশ সরবরাহ বাড়ানো হয়। পাশাপাশি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ফুয়েল পাস চালুসহ নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে তাতে স্টেশনে তেল সংগ্রহের ভোগান্তি কমেনি। যদিও পরিস্থিতির কারণে গ্রাহকরাও ব্যাপকহারে প্যানিক বায়িং করেছিলেন। সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করার পর স্টেশনে লাইনের ভোগান্তি ধীরে ধীরে কমে আসে। বর্তমানে তা অনেকটাই নেই।
এপ্রিল মাসের শুরুতে জ্বালানি তেলের ভোগান্তি ছিল অনেক বেশি। পাশাপাশি বিপিসির মজুতও চাপের মধ্যে ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাসব্যাপী আমদানি কার্যক্রম চালু রাখে প্রতিষ্ঠানটি। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আমদানি করা ১১টি কার্গো যথাসময়ে তেল খালাস সম্পন্ন করেছে।
এর মধ্যে ৩ এপ্রিল ইউনিপ্যাকের এমটি শ্যান গ্যাং ফা হিয়েন ৩৪ হাজার ৪৩ টন ডিজেল ও ইউনিপ্যাকের আরেকটি জাহাজ এমটি ইউয়ান ঝিং হে ২৭ হাজার ৩৭৪ টন ডিজেল খালাস করে।
৮ এপ্রিল নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ৮ হাজার টন ডিজেল, ভিটল এমটি সেন্ট্রাল স্টার ২৬ হাজার ১ টন অকটেন ও বিএসপি এমটি ইস্টার্ন কুইন ২৫ হাজার ৮৬৪ টন ফার্নেস অয়েল খালাস করে।
১৩ এপ্রিল এমটি গ্রেট প্রিন্সেস কার্গো থেকে ১১ হাজার ৯০০ টন জেট ফুয়েল, ১৪ এপ্রিল এমটি লুসিয়া সলিস ৩৪ হাজার ৯৯১ টন ও এমটি টর্ম দামিনি ৩২ হাজার ৯৩৫ টন ডিজেল খালাস করেছে।
এছাড়া ১৬ এপ্রিল নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে আরও ৫ হাজার টন ডিজেল, ১৭ এপ্রিল এমটি নেইভ সিয়েলো থেকে ২৭ হাজার ৩৬৩ টন অকটেন, এমটি অকট্রি কার্গো থেকে ৩৫ হাজার ৩৪৫ টন, ১৮ এপ্রিল এমটি কেইপ বনি জাহাজ থেকে ৩৩ হাজার ৩৯৭ টন ডিজেল এবং ১৯ এপ্রিল এমটি লিয়ান সং হু ৪১ হাজার ৯০৭ টন ডিজেল খালাস করেছে।
খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে ৪১ হাজার ৯০৭ টন ডিজেলবাহী এমটি লিয়ান সং হু ও ২৭ হাজার ৩৬৩ টন অকটেনবাহী এমটি নেইভ সিয়োলো।
দেশে আগমনের পর্যায়ে রয়েছে ৬০ হাজার টন ডিজেলবাহী দুটি কার্গো জাহাজ (ভিটল ও এমটি হাফনিয়া চিতাহ কার্গো)।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দুটি কার্গো ফোর্স ম্যাজিউর (অনির্ধারিত কারণে স্থগিত) হয়েছে। এর মধ্যে ইউনিপ্যাকের কার্গোটির ৩০ হাজার টন ডিজেল এবং থাইল্যান্ডভিত্তিক পিটিএলসিএল কার্গোটির ৮ হাজার টন ডিজেল ও ২৫ হাজার টন জেট ফুয়েল আমদানির কথা ছিল।
সর্বশেষ ২৭ এপ্রিল ওকিটিউএর ৩০ হাজার টন ডিজেলবাহী কার্গো মে মাসে ডেফার করা হয়েছে।
মে-জুনে অপরিশোধিত তেল আমদানির যে পরিকল্পনা
অপরিশোধিত তেল সংকটে গত ১৮ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে এখানে পরিশোধন করা হয়। বাংলাদেশ জিটুজি পদ্ধতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। আমদানি করা অপরিশোধিত তেল পরিবহন করে সরকারি পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। বিএসসি এসব তেল পরিবহনের জন্য বর্তমানে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান নর্ভিক এনার্জি থেকে চার্টারে জাহাজ ভাড়া নেয়।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিএসসির চার্টারার প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কোম্পানি হওয়ায় মার্চ মাসে দুই লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিবহনে ঝুঁকি তৈরি হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবের রাস তানুরা থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল লোড করে হরমুজ প্রণালিতে হামলার আশঙ্কায় গত ৫ এপ্রিল থেকে আটকা পড়ে আছে নর্ডিক পোলাক্স নামে ট্যাংকার জাহাজ। প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও কখন জাহাজটি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে তার নিশ্চয়তা এখনো মেলেনি। তেল সংকটে গত ১২ এপ্রিল থেকে ইআরএলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
দেশের জ্বালানি চাহিদার ২২ শতাংশের সরবরাহ আসে ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে। অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে ইআরএল থেকে ডিজেল, জেট ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন উৎপাদন করা হয়। পরিশোধনের ৩টি পর্যায়ে এ জ্বালানিগুলো পাওয়া যায়। এর মধ্যে লাইট ডিস্টিলেটে (পাতন প্রক্রিয়া) পাওয়া যায় এলপিজি, ন্যাফথা, এসবিপিএস (ইন্ডাস্ট্রিয়াল অয়েল), পেট্রোল ও অকটেন। মিড ডিস্টিলেটে পাওয়া যায় ডিজেল, কেরোসিন, জুট ব্যাচিং অয়েল, এমটিটি (তারপিন তেল), জেট ফুয়েল ও লাইট ডিজেল অয়েল। আর বটম ডিস্টিলেটে পাওয়া যায় রিডিউসড ক্রুড অয়েল- আরসিও (জাহাজ,শিল্পে ব্যবহৃত তেল) ও ফার্নেস অয়েল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইআরএল থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার ৩৫০ টন লাইট ডিস্টিলেট, ৫ লাখ ৮৮ হাজার ২৫১ টন মিড ডিস্টিলেট ও ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৬৮৫ টন বটম ডিস্টিলেট পাওয়া গেছে।
দেশে সর্বশেষ ক্রুড অয়েলের চালান আসে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। তখন দুবাই থেকে এক লাখ টন মারবান ক্রুড অয়েল আসে। এরপর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হলে দেশের অপরিশোধিত তেল আমদানি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
বিপিসির আমদানি পরিকল্পনায় দেখা যায়, সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে বিকল্প পথে গত ২১ এপ্রিল এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে 'এমটি নিনেমিয়া' নামে একটি জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে।
অপরদিক মে এবং জুন মাসে দুই লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বিপিসি। এর মধ্যে মে মাসে দুবাই থেকে ১ লাখ টন মারবান ক্রুড অয়েল ও জুন মাসে সৌদি আরব থেকে ১ লাখ টন এএলসি ক্রুড অয়েল আমদানি করা হবে।
পরিশোধিত তেল কী পরিমাণ আমদানির পরিকল্পনা
ক্রুড অয়েলের পাশাপাশি দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে বিপিসি ৮টি দেশ থেকে রিফাইন্ড বা পরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে। এর মধ্যে মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং, চীনের পেট্রোচায়না, সিঙ্গাপুরের ইউনিপ্যাক, দুবাইয়ের এমিরাটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকো যাপিন, থাইল্যান্ডের পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি ও ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া ও সিনোচেন ইন্টারন্যাশনাল এবং ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড থেকে এই তেল সংগ্রহ করা হয়।
এপ্রিল মাসের আমদানি পরিকল্পনাসূচি অনুযায়ী ইতোমধ্যে বিপিসি ৪ লাখ ৭২ হাজার টন ডিজেল, ৬০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ৫০ হাজার টন অকটেন ও ৫০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানি করেছে।
২৮ এপ্রিলের পর বিপিসির মজুতে ১ লাখ ৮১ হাজার টন ডিজেল, ৪২ হাজার ৯৩৩ টন অকটেন ও ১৭ হাজার ৬৪০ টন পেট্রোল রয়েছে। এ পরিমাণ ডিজেলে ১৫ দিন, অকটেনে ৩৫ দিন ও পেট্রোলে ১২ দিন চলবে।
মে মাসে বিপিসি ৩ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল, ৪০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন ও ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
পাশাপাশি জুন মাসে ২ লাখ ৭০ হাজার টন ডিজেল, ৬০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন ও ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানি করবে।
এপ্রিল মাসে দেশীয় খাত/উৎস থেকে ৫ হাজার টন ডিজেল, ২৪ হাজার ৭০০ টন অকটেন, ৩৫ হাজার ৪০০ টন পেট্রোল ও ৩ হাজার টন ফার্নেস তেল পাওয়া গেছে।
এখান থেকে মে মাসে ৫৫ হাজার টন ডিজেল, ২৪ হাজার টন অকটেন, ৩০ হাজার টন পেট্রোল ও ৩০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেছে বিপিসি। পাশাপাশি জুন মাসে ৬০ হাজার টন ডিজেল, ২৪ হাজার টন অকটেন, ৩০ হাজার টন পেট্রোল ও ৩৩ হাজার টন ফার্নেস অয়েল পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে বিপিসির এক ঊর্ধতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বিপিসি লং-টার্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর আওতায় আমদানি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, সামনে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট হবে না।
সম্পাদক: মো: রবিউল হক। প্রকাশক: মো: আশ্রাফ উদ্দিন ।
প্রকাশক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২, টয়েনবি সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে মুদ্রিত
দেলোয়ার কমপ্লেক্স, ২৬ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা), ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে প্রকাশিত ।
মোবাইল: ০১৭৯৮৬৫৫৫৫৫, ০১৭১২৪৬৮৬৫৪
ওয়েবসাইট : dailyjanadarpan.com , ই-পেপার : epaper.dailyjanadarpan.com
Copyright © 2026 Daily Janadarpan. All rights reserved.