
ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে খারিজ ও বিক্রির অভিযোগ; তদন্ত দাবি ভুক্তভোগীদের।
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় জাল দলিল তৈরি করে প্রায় ৭০ বিঘা জমি নামজারি (খারিজ) ও বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অন্তত ১৮ জনের জমি পরিকল্পিতভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) উপজেলার টোক ইউনিয়নের উলুসারা গ্রামের ভুক্তভোগীরা সাংবাদিকদের কাছে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে সংগঠিতভাবে জাল দলিল তৈরি করে একের পর এক জমি দখল ও বিক্রি করা হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন টোক ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম কবির। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তিনি প্রভাব খাটিয়ে জাল দলিল তৈরি, নামজারি সম্পন্ন এবং পরে সেই জমি বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর বক্তব্য জানতে বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরগুলোতেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের দাবি, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
এদিকে, এত বড় পরিসরের জমি জালিয়াতির পরও কীভাবে নামজারি সম্পন্ন হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে জানতে টোক নয়ন বাজার ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে উপসহকারী কর্মকর্তা (নায়েব) বাবলু মিয়াকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ওই খারিজগুলো দিইনি। অন্য একজনের আইডি ব্যবহার করে এগুলো করা হয়েছে।” শুনানিতে বিলম্বের বিষয়ে তিনি বলেন, “শুনানি করার ক্ষমতা আমার নেই। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শুনানি করেন। আমি শুধু প্রতিবেদন তৈরি করে দিই।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, একই অফিসের আইডি ব্যবহার করে নামজারি সম্পন্ন হলে সেটি কীভাবে নজর এড়াল, এবং তদারকি কোথায় ছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, জালিয়াতির শিকারদের একজন উলুসারা গ্রামের মনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, অনিয়মের প্রতিবাদ ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পর তাঁর পরিবারের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। “কবির মেম্বারের নেতৃত্বে হামলায় আমাদের পরিবারের তিনজন গুরুতর আহত হন”। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।
উলুসারা আ. কাদির ভূঞা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান, সহকারী শিক্ষক কাঞ্চন কুমার ভৌমিক ও সহকারী শিক্ষক মো. কাজল জানান, বিদ্যালয়ের মাঠসহ জমিও খারিজ করে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, ১৯৯৪ সালের ৫ জানুয়ারি ফাতেমা খাতুন বিদ্যালয়ের জন্য দান করা জমিও এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং পরে একটি গ্রুপ কোম্পানির কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
আরেক ভুক্তভোগী লুৎফা ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, ঢাকায় বসবাসের সুযোগে তাঁর দুই বিঘা জমি জালিয়াতির মাধ্যমে নামজারি করা হয়েছে। “নামজারি বাতিলের আবেদন করার পর চার থেকে পাঁচ মাস ধরে শুনানির তারিখ দেওয়া হলেও কার্যকর অগ্রগতি নেই”।
স্থানীয় পোস্টমাস্টার ইমরান হোসেন আবল বলেন, “গ্রামের প্রায় ১৮ জনের ৭০ বিঘা জমি এভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।” এদিকে, অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের চাচাতো ভাই সাব্বির হোসেন দাবি করেন, জালিয়াতির প্রতিবাদ করায় তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট একাধিক দপ্তরের তদারকি থাকা সত্ত্বেও এত বড় জালিয়াতি কীভাবে ঘটল এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত। ভুক্তভোগীরা দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

