
তেলবাজি বা তোষামোদি বাংলাদেশের রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রে যোগ্যতার একটি মহৌষধ হওয়ায় বিষয়টি স্বনামধন্য লেখকদের লেখনী ও বহুল জনশ্রুত প্রবাদটি একটি বেদবাক্য, যা এখন বিনা তর্কে প্রতিষ্ঠিত। বাংলা ভিশনে সম্প্রতি (রমজান-২০২৬ খ্রি.) বিএনপির পরীক্ষিত কেন্দ্রীয় নেতা জনাব আসাদুজ্জামান রিপন যুক্তি দিয়ে ‘যোগ্যতার’ বিষয়টি আরও খোলাসা করেছেন। ছোট্ট একটি বাক্যে তিনি রাজনীতির নভোমণ্ডলে প্রবহমান এই বেদবাক্যটি আরও পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পায়ে ধরা লোকই বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি হতে পারে।’
মতবিরোধ, তর্ক-বিতর্ক যা-ই থাকুক, বাংলাদেশে বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, যাদের দেশ ও জাতির প্রতি অবদান (Contribution) ছিল-যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম), বিচারপতি সাহাবুদ্দীন, অধ্যাপক বি চৌধুরী প্রমুখ। কিন্তু পার্লামেন্টারি সিস্টেমে কিছু ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির আসনে আসীন হয়েছেন, যাদের দেশ ও জাতির প্রতি বিশেষ অবদান থাকা তো দূরের কথা; ক্ষেত্রবিশেষে তাদের ‘জোকার’ বললেও অতিরঞ্জিত হবে না। ছাপোষা লোক, যারা কেতাদুরস্ত বটে, কিন্তু দেশ ও জাতির জন্য কোনো ঝুঁকি (Risk) নেননি; বরং জি হুজুর, জাহাপঁনা বলেই শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মদের না ছিল দেশ-জাতির প্রতি কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা, না ছিল দলের প্রতি অবদান। কিন্তু তাকে সুবোধ বালকের মতো আজ্ঞাবহ একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে পাওয়া যাবে-এই ধারণাটাই হয়তো ছিল তার যোগ্যতার মাপকাঠি। কিন্তু ১/১১-এর সময় ইয়াজউদ্দিন নিয়োগদাতাদের কোনো উপকার তো করতেই পারেননি, বরং নিয়োগকর্তাদের জেল খাটিয়েছেন, রিমান্ডে কোমর ভেঙেছে।
আবদুল হামিদকে শেখ হাসিনা দুবার রাষ্ট্রপতি বানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের অভিভাবক এবং সংবিধানের রক্ষক। কিন্তু সরকারের সকল প্রকার অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ডকে প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা, বরং প্রটেকশন দিয়েছেন। বিনা ভোটে সরকার গঠনে বিরোধী দলের প্রতিবাদকে বিবেচনায় না নিয়ে, বিনা ভোটে নির্বাচনকে কীভাবে বৈধ করা যায়, তার সকল কূটকৌশলের বৈধতা দিয়েছেন। তার সময়ে গৃহপালিত বিরোধী দল (জাতীয় পার্টি)-এর সঙ্গে জোকারি করেই সময় কাটিয়েছেন। জোকারি তার সংসদের ভেতর-বাহির উভয় ক্ষেত্রেই ছিল।
ভারতের এক চিত্রনায়িকার স্বল্পবয়সী ব্যক্তিকে বিয়ের প্রেক্ষিতে তিনি এক সমাবর্তনে আক্ষেপ করে বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রাবাসেই তিনি রাত্রিযাপন করেছেন, একমাত্র রোকেয়া হল ছাড়া। তখন দুষ্টামি করে ঠোঁটকাটা কোনো এক ছাত্রী যদি বলতÑতখন পারেন নাইÑএখন আসেন, কারণ আপনি তো রাষ্ট্রপতি, আপনাকে রোধবে কে? তখন রাষ্ট্রের মুখ কতখানি রক্ষা পেত।
চারবার চেষ্টা করেও প্রধানমন্ত্রীর পা ছুঁতে পারেননিÑহালে নিযুক্ত রাষ্ট্রপতি বারবার এ আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। জনশ্রুতি রয়েছে, জনাব চুপ্পু ছিলেন ব্যাংকখেকো এস আলমের কর্মচারী। এ বিবেচনায় তিনি দুদকের কমিশনার নিযুক্ত হয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের ‘দুধে ধোয়া তুলসী পাতা’ সার্টিফিকেট দিয়েছেন। এ বিবেচনায় একজন ছাপোষা অনুগত হিসেবেই রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ছিল তার অগ্রাধিকার। জনশ্রুতি রয়েছে, বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও নাকি এস আলমের ইচ্ছা/অনিচ্ছা একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে-বাকিটা ঘটনাপ্রবাহ।
জনাব চুপ্পু এতটাই ভাগ্যবান যে তিনি তিনটি সরকারের শপথ পড়িয়েছেন। সংসদে রাষ্ট্রের পক্ষে ভাষণ দিয়েছেন; তিনটি ভাষণই একটির সঙ্গে আরেকটির বিপরীত। জনগণ এই স্ববিরোধী ভাষণের পেছনের কারণ ভালোই বোঝে কিন্তু রাষ্ট্রপতির ভাষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কর্তৃক যখন পর্যালোচিত হবে, তখন স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে কী ধারণা সৃষ্টি হবে? তা ছাড়া যারা বর্তমানে মনে মনে রাষ্ট্রপতি হওয়ার কামনা-বাসনায় রয়েছেন, তাদের মানসিক প্রস্তুতি কী হবে? তারা কি জাতির প্রতি অবদান রাখবেন, নাকি পায়ে ধরার মতো আনুগত্য প্রকাশ করে যোগ্যতার প্রতিযোগিতায় নামবেন? এর সঠিক উত্তর ভবিষ্যতেই পাওয়া যাবে।
বাংলা প্রবাদে আছে, ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’, অর্থাৎ বনে আরও প্রাণী থাকলেও মাংস সুস্বাদু হওয়ায় হরিণই বারবার শিকারিদের টার্গেট। বাঘ শিকার হয় চামড়ার জন্য, খাওয়ার জন্য নয়। বিষয়টি সহজেই অনুমেয়, যোগ্যতাই অনেক সময় অযোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জনাব আসাদুজ্জামান রিপনের ভাষ্যমতে, মি. চুপ্পুর মতো পা ধরার লোকই রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
জনগণ প্রতিবাদী লোক পছন্দ করলেও শাসনকর্তা, অর্থাৎ নিয়োগকর্তার পছন্দ ছাপোষা অনুগতদের, যারা জি-হুজুর, জাহাপঁনা ছাড়া অন্য কোনো কথা বা মাথা নিচু করা ছাড়া উচ্চকণ্ঠে কোনো কথা পছন্দ করে না।
পত্রিকান্তরে স্পিকার পদে নিয়োগ হওয়া সম্পর্কে একজনের নাম প্রথমে শোনা গেলেও পরে নিযুক্ত হয়েছেন আরেকজন। দুজনই ফৌজিÑএকজন আকাশপথের, অন্যজন স্থলপথের। দুজনের সঙ্গেই আমার গভীর সম্পর্ক। আকাশপথের ফৌজির সঙ্গে ১/১১-এর সময় জেল খেটেছি দীর্ঘদিন। ওই সময় স্থলপথের জন ব্যস্ত ছিলেন দলভাঙা সংস্কারপন্থীর বড় নেতা হিসেবে। এ জন্য ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনরা তাকে জেলে দেয়নি।
আকাশপথের জন সম্প্রতি একদিন বলেছিলেন, ‘আমরা দখল করেছি লঞ্চঘাট, বাসস্টেশন, টেম্পু স্টেশন আর জামায়াতে ইসলামী দখল করেছে ইউনিভার্সিটি।’ আরও দু-এক দিন দায়িত্ব নিয়েই বলেছেন, তার দলের অনেক দায়িত্বশীল নেতারাই ‘র’ (RAW)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কথা শোনার পর আমি নিশ্চিত হয়েছি, আকাশপথের আমার প্রিয় মানুষটির ভাগ্যাকাশে আলো জ্বলবে না।
অথচ যিনি স্পিকার নিযুক্ত হয়েছেন, তিনিই ছিলেন দল ভেঙে বিএনএম গঠনের মূল কারিগর। এ কথা আমি দায়িত্ব নিয়েই বলছি; যেমনটি ইতোমধ্যে মিডিয়াতে বলেছেন ব্যারিস্টার (মেজর অব.) সারোয়ার হোসেন।
আন্দোলন-সংগ্রামের অকুতোভয় সৈনিক হাবিবুন নবী খান সোহেল চার শতাধিক মামলার আসামি হলেও চিরন্তন সত্য কথা (মিডিয়াতে দেখেছি), ‘ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাশে’ বলে নিজ ভাগ্যকে নিজেই ফিকে করে ফেলেছেন বলে তার শুভাকাক্সক্ষীরা মনে করে।
আন্দোলন-সংগ্রামের অপর নাম ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। দল থেকে তার বহিষ্কার ভাবতে পারিনি। তিনি বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, বালু দখল প্রভৃতি থেকে পদধারী বিএনপি নেতাদের ঠেকানো যাচ্ছে না; কেন্দ্রে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।’ রুমিন ফারহানার কথাগুলো তার প্রিয় দল পছন্দ করেনি, তবে এলাকাবাসী পছন্দ করেছে; যার প্রমাণ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে তার বিজয়। এতে শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী নয়, দেশবাসীও খুশি হয়েছেÑযার প্রমাণ ফেসবুকের বিভিন্ন জনের মতামত।
বিএনপির পাঁচবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য মেজর আখতার জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেওয়ার সময় বলেছেন, ‘বড় রাজনৈতিক দলে ব্যক্তিকে খুশি রাখতে হয়।’ ব্যক্তির সন্তুষ্টি যখন প্রাধান্য পায়, তখন গণতন্ত্র ঢুকে পড়ে গঠনতন্ত্রের পাতায়। তেলযুক্ত খাবার আর তেলযুক্ত কথা-দুটিই সুস্বাদু ও মিষ্টি; প্রথমটি নষ্ট করে শরীর, আর দ্বিতীয়টি নষ্ট করে সমাজ। এ কথা সর্বজনস্বীকৃত হলেও তৈলবাজদের জয়জয়কার থামেনি কোনো দিন। তবে যখন তৈলবাজদের তৈলবাজির দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তখন শুধরানোর কোনো সময় থাকে না; মূল্য বহন করতে হয় নিয়োগকর্তাকে।
মি. চুপ্পুর দেওয়া রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরু হলে বিরোধী দল তাকে ‘গাদ্দার’ বলে সংসদ ত্যাগ করে, যা সংসদীয় ইতিহাসের প্রথম ঘটনা। সংসদ নেতার ওই সময়ে চুপ থেকে মুচকি হাসি প্রমাণ করে-ঝামেলা এড়িয়ে ঠান্ডা মাথায় কীভাবে প্রতিশোধ নেওয়া যায়, তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
অপমানের পর অপমানিত হয়ে ঠান্ডা মাথায় কীভাবে ক্ষমতার চেয়ার আঁকড়ে রাখা যায়, তারও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো মি. চুপ্পু। কারণ রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত থাকাবস্থায় সরকারের বিভিন্ন দপ্তর থেকে তার ছবি সরিয়ে দিলেও তিনি অপমানবোধ করেননি। এসব ঘটনা প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার রচিত উপন্যাস ‘সংশপ্তক’ থেকে প্রখ্যাত নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুন নির্দেশিত টেলিভিশন নাটকের ‘কান কাটা রমজান’-এর চারিত্রিক ভূমিকাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

