
স্টাফ রিপোর্টার : ‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে’-এই প্রবচন দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি বুদ্ধিজীবীদের অমূল্য বাণী, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম বা আইন-বিচার সংক্রান্ত কোনো সভা হলেই ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চাই’ স্লোগানটি শুনতে শুনতে দেশবাসী হয়রান না হলেও আমি বিমুখ হয়ে পড়েছি। পেশাগতভাবে একজন আইনজীবী ছাড়াও ছাত্রাবস্থা থেকেই বারবার জেল খাটার অভিজ্ঞতার কারণেও এই ঠুনকো স্লোগানটির প্রতি আমি বীতশ্রদ্ধ।
শেষ বিচার অর্থাৎ মৃত্যুর পর রোজ হাশরে প্রতিটি কর্মের বিচারের কথা অবিশ্বাস করলে একজন মুসলমান তার ধর্ম থেকে খারিজ হয়ে যান। অন্যান্য ধর্মেও পরকাল ও কর্মফলের বিধান রয়েছে।
পৃথিবীর বিচারব্যবস্থা দৃশ্যমান। ‘মানুষ মানুষের বিচার করে’-কথাটির সঙ্গে বিচারক, বিচার ও অপরাধ-একটির সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। এখন প্রশ্ন হলো-বিচারক ও অপরাধীর সংজ্ঞা কী? যে আইন ভঙ্গ করে, সেই অপরাধী। আইনের দ্বারা নির্দেশিত কোনো কর্ম সম্পাদন থেকে বিরত থাকার কারণেও দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার জন্য একজন অপরাধী হতে পারেন। An offence is committed by way of omission & commission. একটি রাষ্ট্রে বিভিন্ন আইনের প্রচলন রয়েছে, যথা সমাজ থেকে সৃষ্ট আইন (Custom), পারিবারিক আইন (ধর্মীয় আইনভিত্তিক), রাষ্ট্রীয় আইন। রাষ্ট্রীয় আইন ভঙ্গকারীকে শাস্তির আওতায় অর্থাৎ জেল/জরিমানা করা যায়। রাষ্ট্রীয় আইনের ভিত্তি হলো রাষ্ট্রীয় কর্তার ইচ্ছার প্রতিফলন মাত্র। রাজা/বাদশাহ/প্রেসিডেন্ট/সুলতান/প্রধানমন্ত্রী বা যে নামেই হোক বা যে পদ্ধতিতেই হোক, রাষ্ট্রের কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির নির্দেশিত বিধি-বিধানই আইন। কিন্তু বিচারিক সিদ্ধান্ত কি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়া সমীচীন?
রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করে থাকে। বিচারক নিয়োগ, বেতন-ভাতা নির্ধারণসহ পদোন্নতি, বাসা বরাদ্দ, যানবাহন/ড্রাইভার/জ্বালানি প্রভৃতি সবকিছুই সরকার দ্বারা নির্ধারিত। তাই বলে বিচারিক সিদ্ধান্ত কি সরকার-নিয়ন্ত্রিত হতে হবে? অন্যদিকে দণ্ডবিধির (১৮৬০) ২১ ধারায় বর্ণিত সংজ্ঞা মোতাবেক বিচারক কি কেবল একজন সরকারি বা রাষ্ট্রের অন্যান্য বেতনভুক্ত কর্মচারীদের মতো একজন কর্মচারী? বিচারক যদি নিজেকে সরকার-নিয়ন্ত্রিত একজন কর্মচারী মনে করেন, তবে অবচেতন মনেও সরকার-প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধার প্রতি তার ন্যূনতম লোভ অথবা অনুরাগ-বিরাগভাজন হওয়ার ভয় থাকে। তবে বিচারিক সিদ্ধান্ত নিতে বিচারক নিজস্ব বিবেক কি খাটাবেন, নাকি সরকারপ্রধানের মুখের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকবেন? রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ অবচেতন মনে লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে নন। তবে ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করার মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ এখনো রাষ্ট্রে রয়েছে।
বিচারক শুধু কি শাসনকর্তা-প্রদত্ত আইন মোতাবেক বিচার করবেন? এ কথাটির সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত নই। কারণ, আইন ও ইক্যুইটি যদি সাংঘর্ষিক হয়, তবে ইক্যুইটিকে (equity) প্রাধান্য দেওয়া হলেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে-নতুবা বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদতেই থাকবে। তা ছাড়া জন্মগত অধিকার বা মৌলিক অধিকার কোনো আইন দ্বারা বাধাগ্রস্ত হলে সেটা আর আইন থাকে না; হয়ে যায় কালো আইন। এখন অনেক কালো আইন সংবিধানের উল্লেখিত মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত করেছে।
Law of Equity মানুষের সৃষ্টি কোনো আইন নয়। একজন বিবেকমান মানুষের নিরপেক্ষ, স্বাধীন, পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তির রুচির বহিঃপ্রকাশ থেকেই ইক্যুইটির জন্ম। মৌলিক অধিকার সর্বজনীন, এ প্রতিরোধের প্রচেষ্টা থেকেই জন্ম নেয় স্বৈরাচার। বিচার বিভাগের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া স্বৈরাচার সম্প্রসারিত হয় না, হতে পারে না।
বিবেক মানুষকে ধোঁকা দেয় না, যদি সে কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে থাকে। কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করে অনেক মানুষের নাম মহাজ্ঞানীর খাতায় লিপিবদ্ধ হয়েছে। অন্যদিকে কামনা-বাসনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতায় অনেক মহাজ্ঞানী মহাপুরুষ বিপরীত রূপে ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে।একজন প্রধান বিচারপতি (মি. সিনহা) on gun point দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন, আরেকজন প্রধান বিচারপতিকে (মি. খায়রুল হক) হত্যা মামলায় পুলিশ হাতে Hand Cup পরিয়ে কোর্টে নেয়, তার জামিন হয় না-এ বিষয়গুলো কি তাদের কর্মফলের Natural Justice, নাকি শাসনকর্তার ইচ্ছার প্রতিফলন। উত্তর যা-ই হোক, বিষয়টি বিচারাঙ্গনের জন্য দৃষ্টিকটু একটি নজির সৃষ্টি হলো, যার ভবিষ্যৎ ভবিষ্যই বলে দেবে। তবে ভবিষ্যতের জন্য সাধু সাবধান-এটাই হতে পারে একটি দিকনির্দেশনা। আইনপ্রণেতারা কি গণমানুষের স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য আইন প্রণয়ন করেন? নাকি নিজেদের স্বপদে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে টিকে থাকার জন্য শাসন/শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য আইন প্রণীত হয়? আইন প্রণয়নের পূর্বে এর নৈতিকতা ছাড়াও গণমানুষের ওপর এর প্রয়োগের বাস্তবতার ওপর আলোকপাত করা দরকার।আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিচারিক বৈষম্য দূর করতে হবে। বিচারক যদি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেন, অর্থাৎ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক স্যারের ভাষায় ‘হাওয়া বুঝে রায় দেন’, তবে তো শাসনকর্তার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সে সরকারই আইনকে তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে ব্যবহার করেছে। যেমন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ছিল গায়েবি মোকদ্দমা, ইউনূস সরকারের সময় শুরু হয়েছিল মামলা বাণিজ্য, নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে এখনো তা অব্যাহত আছে। গায়েবি মামলা ও ইউনূস আমলের মামলা বাণিজ্যের মধ্যে একটু তারতম্য রয়েছে।সরকারের নির্দেশে মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে গায়েবি মামলা দিত পুলিশ। এজাহারে নাম দেওয়া, না দেওয়ার জন্য নেতাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়েছে বিধায় সাংবাদিকদের কলমে হালে রুজু হওয়া মামলা ‘মামলা বাণিজ্য’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে বারবার, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হয়নি। রাজনৈতিক অভিলাষের কারণে এ ধরনের মামলার পৃষ্ঠপোষকতা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগও এর দায় অস্বীকার করতে পারবে না। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান তার অধীন জেলার পুলিশ সুপারের প্রতি এক লিখিত নির্দেশনা জারি করে আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন হলেই Shown Arrest এর মাধ্যমে পুনরায় গ্রেফতার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিথ্যা মামলাকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রযন্ত্র যখন রাজনৈতিক বা যেকোনো একজন মানুষকে আটক রাখার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তখনই বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে এবং ব্যাহত হয় আইনের শাসন।গ্রেফতারকৃত মামলার জামিন হওয়ার পর Shown Arrest করার পদ্ধতি পুলিশের ক্ষমতাকে চরমভাবে বৃদ্ধি করছে, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী। ২০০৪ সালে Shown Arrest সম্পর্কে High Court নিম্নবর্ণিত নির্দেশনা প্রদান করলেও পুলিশ সে নির্দেশনাকে তোয়াক্কা করছে না :
Preventing abuse of the process of Court-The Chief Metropolitan Magistrate/Metropolitan Magistrate is directed not to entertain any application for showing the petitioner arrested in other cases which shall be forthcoming and not to make any order for sending him on remand from jail custody or for authorizing his detention in police custody for a period of two months from date, so that the petitioner on being informed about any other cases can voluntarily surrender before the Court. Reported 57 DLR (2005) (HC) /513.
প্রধান বিচারপতি শুধু সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নন, বরং বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। ন্যায়বিচার বিঘ্নিত বা কেউ তার ন্যায্য অধিকার থেকে যাতে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়টি দেখভাল করা প্রধান বিচারপতির দায়িত্বের বাইরে নয়। ফলে গায়েবি মামলা বা মামলা বাণিজ্য প্রতিরোধ ব্যর্থতার দায় প্রধান বিচারপতি এড়াতে পারেন কি? গায়েবি মামলা বা মামলা বাণিজ্যের উৎস এবং সুবিধাভোগী সম্পর্কে তদন্ত করার জন্য The Commission of Inquirty Act, 1956 মোতাবেক যদি একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়, তবে থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়াসহ মামলাজটের অনেকটা নিরসন হতো। ‘বিচারালয় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল’-এ কথা যেমন মানুষ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, পাশাপাশি গণমানুষ এ কথাও মনে করে, ‘বিবেকই শ্রেষ্ঠ আদালত।’ স্বচ্ছতার সঙ্গে যে বিবেকসম্পন্ন বিচারিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে, তাকেই বিচারকের আসনে বসা বাঞ্ছনীয়।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বিচার বিভাগ ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাধীন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না মন-মগজ-চেতনা-মানসিকতায় ‘বিচারিক’ দায়িত্ব পালনে ‘বিচারক’ নিজেকে নিজে স্বাধীন মনে করেন। তাই শুধু ঠুনকো স্লোগান নয়, বরং ‘মানসিক দাসত্বমুক্ত বিচারব্যবস্থা’ প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রভাবমুক্ত বিচারাঙ্গন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।
লেখক : জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও কলামিস্ট।

