
সৈয়দ এ. এফ. এম. মঞ্জুর-এ-খোদা
(গত সপ্তাহের পর)
৩য় সংস্কার
উদ্যোগ গ্রহণকারী: ২য় খলিফা হযরত উমর (রা.)
সময়: ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দ (১৭ হিজরি)
বিবরণ: মুসলিম জাহানের ২য় খলিফা হযরত উমর (রা.) [শাসনকাল: ৬৩৪-৬৪৪ খ্রি.]-এর খিলাফতকালে ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে (১৭ হিজরি) ৩য় বারের মতো মসজিদে নববি-এরসংস্কার করা হয়। মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকেরা খলিফা হযরত উমর (রা.)-কে মসজিদটি সম্প্রসারণের জন্য অনুরোধ করেন। ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে (১৭ হিজরি) হযরত উমর (রা.) হযরত জাফর ইবনে আবু তালেব (রা.)-এর একটি জমির অর্ধেক অংশ এক লক্ষ দিরহাম দিয়ে ক্রয় করে মসজিদটি দক্ষিণে প্রায়১৬.৪ ফুট, উত্তরে প্রায় ৪৯.২১ ফুট এবং পশ্চিমে প্রায় ৩২.৮ ফুট প্রসারিত করেন। ফলে মসজিদের আয়তনদাঁড়ায় প্রায় ৪৫,৫৪০ বর্গফুট (২৩০ ফুট১৯৮ ফুট)।তখন মসজিদের পশ্চিম সীমানা দেওয়াল মিম্বর থেকে ৭ কলাম দূরে ছিল। তবে এই সময় নির্মাণ কাজে খেজুর গাছের পরিবর্তে স্তম্ভ হিসাবে কাঠের খুঁটি ব্যবহার করা হয়। মসজিদের প্রবেশদ্বার ৩টি থেকে ৬টিতে উন্নীত করা হয়। পশ্চিম দেওয়ালে যে নতুন দরজা যুক্ত করা হয়েছিল, তা‘বাবে সালাম’ এবং পূর্ব দেওয়ালে যে দরজা যুক্ত করা হয়েছিল, তা ‘বাবে নিসা’ নামে পরিচিত। হযরত উমর (রা.) মসজিদের উত্তর দিকের সীমানার বাইরের খালি জায়গায় ‘জমজম’ নামক একটি কূপ খনন করেন। যা পরবর্তীতে মসজিদ সম্প্রসারণের কারণে ভরাট করে ফেলা হয়। তিনি মসজিদের মেঝেতে ‘হাছি’ নামক ঘাসের পরিবর্তে ফরাশ (মেঝেতে বিছানোর জন্য মোটা সুতায় বোনা চাদরবিশেষ)ব্যবহার করেন।
৪র্থ সংস্কার
উদ্যোগ গ্রহণকারী: ৩য় খলিফা হযরত উসমান (রা.)
সময়: ৬৫৩ খ্রিষ্টাব্দ (২৯ হিজরি)
বিবরণ: মুসল্লিদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় মুসলিম জাহানের ৩য় খলিফা হযরত উসমান (রা.) [শাসনকাল: ৬৪৪-৬৫৬ খ্রি.] তাঁর খেলাফতকালে ৬৫৩ খ্রিষ্টাব্দে (২৯ হিজরি) মসজিদে নববি-এর ৪র্থ সংস্কারকার্যক্রম সম্পন্ন করেন। মসজিদটির উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম এই তিন দিকে প্রায়১৬.৫ ফুটকরেসম্প্রসারিত করা হয়। ফলে মসজিদের আয়তন দাঁড়ায় প্রায়৫৬,৪১৩ বর্গফুট (২৬৩ ফুট২১৪.৫ ফুট)।ফলে মসজিদটি মিম্বর থেকে পশ্চিম দিকে ৮ কলাম পর্যন্ত প্রসারিত হয়। মসজিদের দক্ষিণ দেওয়ালটি আজও একই স্থানে রয়েছে এবং খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর সময় থেকে দক্ষিণ দিকে আর সম্প্রসারণ করা হয়নি।এছাড়াও খলিফা হযরত উসমান (রা.) মসজিদটি অলংকৃত বা খোদাইকৃত পাথর দিয়ে তৈরি করেন। সেই সময় নির্মাণ সামগ্রী হিসাবে চুনাপাথর ব্যবহৃত হয়েছিল। পাথর দ্বারা বিভিন্ন ফুল ও লতার নকশা করে মসজিদের কলাম ও দেওয়ালসমূহ সুসজ্জিত করা হয়।মসজিদেরদেওয়ালসমূহ পবিত্র কোরআনের আয়াত দ্বারা অলংকৃত করা হয়। সেগুন কাঠ দিয়ে ছাদনির্মাণ করা হয়। পূর্বের খেজুর গাছের স্তম্ভগুলি ফেলে দিয়ে অলংকৃত পাথর দ্বারা নতুন স্তম্ভ তৈরি করা হয়। এই কলামগুলির ভিতরের অংশ ফাঁকা ছিল। স্তম্ভগুলোকে আরও বেশি মজবুত করার জন্য এর মধ্যে লোহার টুকরো এবং গলিত সীসা দ্বারা পূর্ণ করা হয়। এসময় তিনি কেব্লার দেওয়ালের দিকে চলাচলের একটি রাস্তাও নির্মাণ করেন।দক্ষিণের দেওয়ালে তিনি ‘বাব আলে উমর’ নামে একটি প্রবেশদ্বার নির্মাণ করেন। যা দক্ষিণ দেওয়ালের পূর্বাংশে হযরত রাসুল (সা.)-এর মেহরাব ও হুজরা শরীফের মাঝে বিদ্যমান ছিল। এই নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হতে প্রায় ১০ মাস সময় লেগে যায়।
৫ম সংস্কার
উদ্যোগ গ্রহণকারী: উমাইয়া খলিফা ১ম ওয়ালিদ
সময়: ৭০৭-৭১০ খ্রিষ্টাব্দ (৮৮-৯১হিজরি)
বিবরণ:৫ম উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক (শাসনকাল: ৭০৫-৭১৫ খ্রি.) ৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে (৮৮হিজরি) তৎকালীন মদিনার গভর্নর উমর ইবনে আবদুল আজিজ-কে মসজিদে নববি পুনর্নির্মাণের দায়িত্ব দেন। এই সময় তিনি উমর ইবনে আবদুল আজিজ-কে নির্দেশ দেন- “মসজিদে নববি-এর আশপাশের সকল গৃহ ক্রয় করে নাও। যারা বিক্রয় করতে অস্বীকার করবে, তাদের গৃহ ভেঙে দিয়ে মূল্য পরিশোধকরে দাও। এতেও তারা অসম্মত হলে বলপূর্বক গৃহস্থান দখল করে নাও এবং মূল্য বাইতুল মালে জমা করে দাও। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাসস্থান (হুজরা শরীফ)-ও মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও।” (মদিনা শরীফের ইতিহাস, মৌলভী শেখ আবদুল জব্বার; পৃষ্ঠা ৭৪; ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)অতঃপর উমর ইবনে আবদুল আজিজ খলিফা ১ম ওয়ালিদ-এর নির্দেশে মসজিদ পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেন। সমগ্র মদিনাবাসীর প্রতিবাদ সত্ত্বেও যে দিন হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হুজরা শরীফগুলো ধ্বংস করে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, সেদিন যেন এক মহা প্রলয়কাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। সমগ্র মদিনায় কান্নার রোল পড়ে গিয়েছিল।
উমর বিন আবদুল আজিজ মসজিদে নববি-এরপশ্চিমে প্রায়৩৩ ফুট এবং পূর্বে প্রায় ৪৯ ফুট প্রসারিত করেছিলেন যার ফলে মসজিদের আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ৭৭,৮৪৮ বর্গফুট(২৬৩ ফুট২৯৬ ফুট)।উল্লেখ্য যে, এসময় মসজিদে নববি-এর পুনর্নির্মাণের জন্য সাহায্য চেয়ে খলিফা ওয়ালিদ তৎকালীন রোম সম্রাট ২য় জাস্টিনিয়ান-এর নিকট বার্তা পাঠান। রোম সম্রাট ২য় জাস্টিনিয়ান তখন ৪০ জন বিশেষজ্ঞ, ৪ হাজার রোমীয় কারিগর, ৪ হাজার কিবতি (মিশরের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়) কারিগর, ৮০হাজার দিনার, রূপার শিকল, প্রায় ১৭০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ এবং কাঁচের ফানুসে রক্ষিত অসংখ্য প্রদীপ মদিনায় প্রেরণ করেন।[হৃদয় তীর্থ মদীনার পথে, শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দেস দেহলভী (রহ.), পৃষ্ঠা ৮৫]এই নির্মাণকালে মসজিদের কলামগুলো লোহার বার এবং গলিত সীসা দিয়ে মজবুত করা হয়েছিল। মসজিদের ছাদ নতুন করে নির্মাণ করা হয় এবং ছাদটি ৪১ ফুট উচ্চতায় বর্ধিত করা হয়। প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে রক্ষা পেতে এই উপরের ছাদটির অল্প নিচে অপর একটি ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল। নিচের ছাদটি ছিল সেগুন কাঠের তৈরি।কলামের উপরের অংশ দরজার চৌকাঠ ও ছাদে স্বর্ণের কারুকার্য করা হয়। দেওয়ালের অভ্যন্তরের দিক মার্বেল পাথর দ্বারা সুসজ্জিত করা হয়েছিল। এই দেওয়ালগুলির বিভিন্ন অংশে বহু রঙিন পাথর দ্বারা অলংকৃত করা হয় এবং সোনালি পলিশ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া দরজার ফ্রেমের উপরেও সোনালি পলিশ করা হয়। মসজিদের দেওয়াল ও ছাদ কারুকার্যময় করা হয়।মসজিদের চার কোণে ৪টি মিনার এবং ২০টি প্রবেশদ্বার নির্মাণ করা হয়। মসজিদে নববি-এর এই সংস্করণেই সর্বপ্রথম ধনুকাকৃতিরমেহরাবনির্মাণ করা হয়। এই নির্মাণ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ৭০৭-৭১০ খ্রিষ্টাব্দ (৮৮-৯১ হিজরি) পর্যন্ত প্রায় ৩ বছর সময় লেগেছিল।
উমর বিন আবদুল আজিজ মসজিদে নববি-এরপশ্চিমে প্রায়৩৩ ফুট এবং পূর্বে প্রায় ৪৯ ফুট প্রসারিত করেছিলেন যার ফলে মসজিদের আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ৭৭,৮৪৮ বর্গফুট(২৬৩ ফুট২৯৬ ফুট)।উল্লেখ্য যে, এসময় মসজিদে নববি-এর পুনর্নির্মাণের জন্য সাহায্য চেয়ে খলিফা ওয়ালিদ তৎকালীন রোম সম্রাট ২য় জাস্টিনিয়ান-এর নিকট বার্তা পাঠান। রোম সম্রাট ২য় জাস্টিনিয়ান তখন ৪০ জন বিশেষজ্ঞ, ৪ হাজার রোমীয় কারিগর, ৪ হাজার কিবতি (মিশরের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়) কারিগর, ৮০হাজার দিনার, রূপার শিকল, প্রায় ১৭০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ এবং কাঁচের ফানুসে রক্ষিত অসংখ্য প্রদীপ মদিনায় প্রেরণ করেন।[হৃদয় তীর্থ মদীনার পথে, শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দেস দেহলভী (রহ.), পৃষ্ঠা ৮৫]এই নির্মাণকালে মসজিদের কলামগুলো লোহার বার এবং গলিত সীসা দিয়ে মজবুত করা হয়েছিল। মসজিদের ছাদ নতুন করে নির্মাণ করা হয় এবং ছাদটি ৪১ ফুট উচ্চতায় বর্ধিত করা হয়। প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে রক্ষা পেতে এই উপরের ছাদটির অল্প নিচে অপর একটি ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল। নিচের ছাদটি ছিল সেগুন কাঠের তৈরি।কলামের উপরের অংশ দরজার চৌকাঠ ও ছাদে স্বর্ণের কারুকার্য করা হয়। দেওয়ালের অভ্যন্তরের দিক মার্বেল পাথর দ্বারা সুসজ্জিত করা হয়েছিল। এই দেওয়ালগুলির বিভিন্ন অংশে বহু রঙিন পাথর দ্বারা অলংকৃত করা হয় এবং সোনালি পলিশ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া দরজার ফ্রেমের উপরেও সোনালি পলিশ করা হয়। মসজিদের দেওয়াল ও ছাদ কারুকার্যময় করা হয়।মসজিদের চার কোণে ৪টি মিনার এবং ২০টি প্রবেশদ্বার নির্মাণ করা হয়। মসজিদে নববি-এর এই সংস্করণেই সর্বপ্রথমধনুকাকৃতিরমেহরাবনির্মাণ করা হয়। এই নির্মাণ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ৭০৭-৭১০ খ্রিষ্টাব্দ (৮৮-৯১ হিজরি) পর্যন্ত প্রায় ৩ বছর সময় লেগেছিল।
মসজিদে নববি এরূপ অভিনব প্রণালিতে পরিবর্ধিত ও পরিবর্তিত হলে ৫ম উমাইয়া খলিফা ১ম ওয়ালিদ মদিনা নগরীতে আগমন করেন। তখনও নবিনন্দিনী হযরত ফাতেমা (রা.)-এর হুজরা শরীফটি মসজিদে নববি-এর পাশে অক্ষত অবস্থায় ছিল।উল্লেখ্য যে,ঐসময় সেইহুজরা শরীফটিতে ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বংশধরগণ তথা নবি পরিবারের সদস্যগণ বসবাস করতেন। মদীনার গভর্নর উমর বিন আবদুল আজিজ আহলে বাইত প্রেমিক ছিলেন বিধায় সেই হুজরা শরিফটি তখনো অধিগ্রহণ করেননি। খলিফা ১ম ওয়ালিদ মদিনায় প্রবেশ করে যখন দেখতে পেলেন যে, তার নির্দেশ মোতাবেক হযরত ফাতেমা (রা.)-এর হুজরা শরীফটি তখনো ভাঙা হয়নি এবং নবি পরিবারের সদস্যরা সেখানে বসবাস করছেন; তখন তিনি রাগান্বিত হয়ে যান।খলিফা ১ম ওয়ালিদ তৎক্ষণাৎ মদিনার গভর্নর উমর ইবনে আবদুল আজিজকে ডেকে পাঠালেন এবং বেয়াদবের মতো বললেন, “তুমি এদেরকে বিতাড়িত করে এদের বাসস্থানকে (হুজরা শরীফ) আজও মসজিদের অন্তর্ভুক্তকরোনি কেন? পুনরায় এদেরকে এই স্থানে দেখি, আমার এরূপইচ্ছা ছিল না। এদেরকে আমি এখানে আর দেখতে চাই না। এদের গৃহ ক্রয় করে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও”[মদিনা শরীফের ইতিহাস, মৌলভী শেখ আবদুল জব্বার, পৃষ্ঠা ৭৪-৭৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ; হৃদয় তীর্থ মদিনার পথে,মূল: জজবুল-কুলুব ইলা দিয়ারিল মাহবুব, শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দেস দেহলভী (রহ.), অনুবাদ- মুহিউদ্দীন খান, পৃষ্ঠা ৮৪]
তারপর খলিফা ১ম ওয়ালিদ হযরত ফাতেমা (রা.)-এর হুজরা শরিফটি ক্রয় করতে চাইলেন, কিন্তু নবি পরিবারের সদস্যগণ তা বিক্রয় করতে সম্মত হলেন না। তখন ওয়ালিদ চরম বেয়াদবের মতো তার লোকদেরকে আদেশ দিলো, “যদি এরা বাইরে না আসে তবে গৃহ এদের উপরইধসিয়ে দাও।গৃহের আসবাবপত্র এদের সম্মতি ছাড়াই বাইরে নিক্ষেপ করো। গৃহ উজাড় করে দাও।”[হৃদয় তীর্থ মদীনার পথে, শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দেস দেহলভী (রহঃ), অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান, পৃষ্ঠা ৮৪ ও ৮৫] খলিফার এই আদেশ পেয়ে তার লোকজন বলপূর্বক গৃহ থেকে তাঁদের জিনিসপত্র বাইরে ফেলে দিলো।অতঃপর নবি পরিবারের নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সকলে প্রকাশ্য দিবালোকে মদিনার বাইরে চলে যেতে বাধ্য হন। খলিফা ১ম ওয়ালিদের এরূপ বর্বরতার মাধ্যমে হযরত ফাতেমা (রা.)-এর এই হুজরা শরীফটিও ভেঙে ফেলে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
৬ষ্ঠ সংস্কার
উদ্যোগ গ্রহণকারী: ৩য় আব্বাসিয় খলিফা আল-মাহদি
সময়: ৭৭৯-৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দ (১৬১-১৬৫ হিজরি)
বিবরণ: ৩য় আব্বাসিয় খলিফাআবু আবদুল্লাহ্ আল-মাহদি (শাসনকাল: ৭৭৫-৭৮৫ খ্রি.) ৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দে (১৬১ হিজরি) মক্কায় হজ করতে আসেন।অতঃপর মদিনায় এসে তিনি জাফর ইবনে সোলাইমানকে মদিনার গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং মসজিদে নববি-এর সংস্কার করার নির্দেশ দেন। এই মহান কাজে সহযোগিতার জন্য তিনিআবদুল্লাহ্ বিন আজিম বিন উমর ইবনে আবদুল আজিজ এবং আবদুল মালেক ইবনে কাবিব গাসসানি-কে নিযুক্ত করেন।তিনি উত্তর দিকে কিছু সাহাবির বাড়ি ক্রয় করে শুধু এই দিকে মসজিদে নববি-কে ১৫০ ফুটপ্রসারিত করেন। এতে মসজিদে নববি-এর আয়তন হয় প্রায় ১,২২,২৪৮ বর্গফুট (৪১৩ ফুট২৯৬ ফুট)। তার প্রসারিত অংশের পরিমাণ ৪৪,৪০০বর্গফুট। তিনি নতুন ভবনটি মোজাইক দ্বারা তৈরি করেন এবং উমায়া খলিফা ১ম ওয়ালিদ-এর ন্যায় সুন্দর ও কারুকার্য খচিত করে উত্তর দিকে লোহার তৈরি ১০টি স্তম্ভ নির্মাণ করেন। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম দেওয়ালে ৮ টি করে ১৬টি এবং উত্তর দেওয়ালে ৪টি অর্থাৎ সর্বমোট আরও ২০টি দরজা নতুন করে সংযুক্ত করেন। মসজিদে নববি-এর এই সংস্কারের সময়কাল ছিল ৪ বছর (৭৭৯-৭৮৩ খ্রি./১৬১-১৬৫ হি.)। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে ৭ম আব্বাসিয় খলিফা আল মামুনও ৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে (২০২ হিজরি) মসজিদে নববি-এর সামান্য সংস্কার করেন।
৭ম সংস্কার
উদ্যোগ গ্রহণকারী: ১০ম আব্বাসিয় খলিফা জাফর আল মোতাওয়াক্কিল
সময়: ৮৬০-৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ (২৪৫-২৪৬ হিজরি)
বিবরণ:৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে ১০ম আব্বাসিয় খলিফা জাফর আল মোতাওয়াক্কিল (শাসনকাল: ৮৪৭-৮৬১ খ্রি.) মসজিদে নববি-এর সংস্কারের জন্য বাগদাদ থেকে দক্ষ কারিগর এবং প্রচুর পরিমাণে মোজাইক পাথর প্রেরণ করেন। তিনি হযরত রাসুল (সা.)-এর রওজা মোবারকের বাইরের অংশে মার্বেল পাথর দ্বারা অলংকৃত করেন। ৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদ সংস্কার ও অলংকরণের কাজ শেষ হয়।
৮ম সংস্কার
উদ্যোগ গ্রহণকারী: ৩৬তম আব্বাসিয় খলিফা আল নাসির
সময়: ১২২৩ খ্রিষ্টাব্দ (৬১৯ হিজরি)
বিবরণ:১২২৩ সালে আব্বাসিয় খলিফা আল নাসির (শাসনকাল: ১১৮০-১২২৫ খ্রি.) মসজিদের উন্মুক্ত চত্বরে গম্বুজ আকৃতির ছাদ বিশিষ্ট একটিকক্ষ নির্মাণ করেন। এরপর ১২৫৬ খ্রি. (৬৫৪ হিজরি) পর্যন্ত প্রায় ৩৩ বছর মসজিদে নববি-এর কোনো পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা হয়নি।
ভূমিকম্পে মসজিদে নববি-এর ক্ষতিসাধন[১২৫৬ খ্রি. (৬৫৪ হিজরি)]
হযরত রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, “ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না হিজাজ ভূমি থেকে একটি অগ্নি প্রকাশিত হবে; যা বুসরায় অবস্থানরত উটের গলা পর্যন্ত আলোকিত করবে (অর্থাৎ সেই আগুনের আলোতে রাতের বেলাতেও লোকেরা উটের গলা দেখতে পাবে)।” (মুসলিম শরীফ, হাদিস একাডেমি, হাদিস নং ২৯০২)
আল্লাহ্র রাসুল (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণিত করে ১২৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ মে (৩ জমাদিউল আউয়াল, ৬৫৪ হিজরি) বুধবার রাতেমদিনার দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত হিজাজের ‘হাররাত রাহাত’ নামক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে, যার লাভা চারদিকে ২৩ কিলোমিটার-এর ও বেশি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। লাভার সর্বোচ্চ বিস্তৃতি থেকে মসজিদে নববি মাত্র ৮.২ কি.মি. দূরে ছিল। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত মদিনা থেকে প্রায় ১০০০ কি.মি. দূরে অবস্থিত সিরিয়ার ‘বুসরা’ অঞ্চল থেকেও দেখা যাচ্ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে ঐদিন ১৮ বার ভূ-কম্পন অনুভূত হয়। প্রচণ্ড ভূমিকম্পের ফলে মসজিদ ভবন কম্পিত হতে থাকে এবং মসজিদের ছাদ ও একটি মিনার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মসজিদে নববিতে ১ম অগ্নিকাণ্ড [১২৫৬ খ্রি. (৬৫৪ হিজরি)]
‘হাররাত রাহাত’-এর অগ্ন্যুৎপাতের প্রায় ৩ মাস পর ১২৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২২ সেপ্টেম্বর (১ রমজান, ৬৫৪ হিজরি) মসজিদে নববিতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়। মসজিদে নববি-এর উত্তর-পশ্চিম কোণের তৈলের বাতি থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। এই অগ্নিকাণ্ডের কারণে মসজিদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আগুনের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, হযরত রাসুল (সা.)-এর রওজা মোবারকের দেওয়ালের কিছু অংশ ধসে পড়ে এবং পূর্বের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মিনারটি ধ্বংস হয়ে যায়। (চলবে)
সৈয়দ এ. এফ. এম. মঞ্জুর-এ-খোদা : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

