ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন, “মসজিদ এবং বাসস্থান নির্মাণ পর্যন্ত হযরত রাসুল (সা.) হযরত আবু আইয়ুবআনসারি (রা.)-এরবাড়িতে অবস্থান করেন এবং মুসলমানদেরকে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করার জন্যহযরত রাসুল (সা.) নিজে নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণ করেন। হযরত রাসুল (সা.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে মুহাজির এবং আনসারগণও এ নির্মাণ কাজে যোগদান করেন।” এ প্রসঙ্গে জনৈক মুসলিম কবি বলেন, “আমরা বসে থাকবআর নবিজি (সা.) কাজ করবেন, আমাদের এ কর্ম হবে কেবলই বিভ্রান্তিকর।” নির্মাণকাজ চলাকালে মুসলমানেরা সমবেত কণ্ঠে আবৃত্তি করতেন, “পরকালের সুখই পরম সুখ, অন্য কিছু নয়। হে আল্লাহ্! রহম করো তুমি আনসার এবং মুহাজিরগণকে।” তখন হযরত রাসুল (সা.)-ও বলতেন, “পরকালের সুখই পরম সুখ, অন্য কিছু নয়। হে আল্লাহ! রহম করো মুহাজির আর আনসারগণকে।”
মসজিদে নববি নির্মাণকালে মুসলমানদের কেব্লা ছিল বায়তুল মোকাদ্দাস। তাই মসজিদে নববি-এর কেব্লা ছিল উত্তর দিকে অর্থাৎ বায়তুল মোকাদ্দাসমুখী। কেব্লা নিদের্শক হিসেবে দেওয়ালের গায়ে একটি পাথর স্থাপন করা হয়। মসজিদটির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে মক্কা থেকে আগত মুজাহির সাহাবিদের জন্য খেজুর পাতার ছাউনি দিয়ে একটি বারান্দা নির্মাণ করা হয়। এই স্থানটিকে বলা হয় ‘আল সুফফাহ’। আরবি ‘সুফফাহ’ শব্দের বাংলা অর্থ বারান্দা। এই স্থানে যে সকল সাহাবি বসবাস করতেন তাঁদেরকে আহলে সুফফাহ হিসেবে অভিহিত করা হয়। আবু নাঈম রচিত ‘আল হেলইয়া’ গ্রন্থে তাদের সংখ্যা ১০০-এরও অধিক বলে উল্লেখ রয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘আমি ৭০ জন সুফফা বাসিন্দাকে দেখেছি।’ (ওয়াফাহ আল ওয়াফাহ, ২য় খণ্ড; নূরুদ্দিন সামহুদী)
দরজাসমূহ
মসজিদে নববিতেপ্রবেশের জন্য সেসময় ৩টি দরজা ছিল। এগুলো হলো-
১. দক্ষিণ দিকের দরজা: এটি ছিল মসজিদে নববি-এর প্রধান প্রবেশ পথ। এই দরজা দিয়ে সাধারণ মুসল্লিরা মসজিদে প্রবেশ করত এবং বের হতো।
২. পশ্চিম দিকের দরজা: এই দরজাটির নাম ছিল ‘বাবে রহমত’ বা ‘বাব আল আতিক’।
৩. পূর্ব দিকের দরজা: এই দরজাটির নাম ছিল ‘বাব আল জিব্রাইল’। এই দরজা দিয়েই হযরত রাসুল (সা.) মসজিদে নববিতে প্রবেশ করতেন বিধায় একে ‘বাব উন নবি’-ও বলা হয়।
রোদের তাপের কষ্ট লাঘবের উদ্দেশ্যে উত্তরমুখী করে মসজিদের ছাদ নির্মাণ করা হয়। ছাদটি খেজুর গাছের কাণ্ডের স্তম্ভের উপর খেজুর পাতার ছাউনির সাথে কাদামাটির প্রলেপ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। বৃষ্টির পানি নামার জন্য ছাদটি কিছুটা ঢালু করে তৈরি করা হয়। প্রত্যেকটি সারিতে ১৮টি করে দুই সারিতে ৩৬টি স্তম্ভ ছিল। ছাদটি সর্বপ্রথম ২১ ফুট উচ্চতায় নির্মাণ করা হয়। এই সর্ম্পকে হযরত রাসুল (সা.) বলেন, ‘মসজিদের ছাদ মুসা (আ.)-এর ছাদের অনুরূপ ৭ গজ (২১ ফুট) উঁচু করে তৈরি করো।’
ওজুর সুবিধার্থে মসজিদের বাইরে একটি কূপ স্থাপন করা হয়। এভাবে দীর্ঘ ৭ মাস কাজ করার পর ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যভাগে মসজিদে নববি-এর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়।
আজানের প্রচলন
মসজিদে নববি-এর প্রথম পর্যায়ে আজানের প্রচলন ছিল না। পরবর্তীতে খাজরাজ গোত্রের হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ ইবনে আবদে রাব্বি (রা.)-কে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বপ্নযোগে সবুজ পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তির দ্বারা আজানের বাক্যগুলো বলে দেওয়া হয়। হযরত উমর (রা.)-ও স্বপ্নের মাধ্যমে আজানের বাক্যগুলো জানতে পারেন।এরপর হযরত রাসুল (সা.) আজানের মাধ্যমে নামাজের আহ্বান জানানোর নির্দেশ দেন। তৎকালীন মসজিদে কোনো মিনার না থাকায় হযরত রাসুল (সা.) মসজিদ সংলগ্ন একটি উঁচু বাড়ির ছাদ থেকে হযরত বিলাল (রা.)-কে আজান দেওয়ার নির্দেশ দেন, যেন দূর থেকে আজানের ধ্বনি শোনা যায়। পরবর্তীতে মসজিদের পূর্ব পাশে অবস্থিত হযরত হাফসা (রা.)-এর ঘরের পাশে একটি ছোটো স্থানে দাঁড়িয়ে হযরত বিলাল (রা.) আজান দিতেন।
মেহরাব
মসজিদে ইমামের নামাজ আদায়ের স্থানে আলাদাভাবে ঘেরাও করা স্থানকে মেহরাব বলা হয়। প্রথমাবস্থায় মসজিদে নববিতে হযরত রাসুল (সা.)-এর নামাজ আদায়ের স্থানে এই রকম কোনো মেহরাব ছিল না। পরবর্তীতে ৫ম উমাইয়া খলিফা ১ম ওয়ালিদ-এর সময়ে হযরত রাসুল (সা.)-এর নামাজ আদায়ের স্থানগুলোতে মেহরাব তৈরি করা হয়। হযরত রাসুল (সা.)-এর স্মৃতি বিজড়িত ২টি মেহরাব-এর বর্ণনা নিম্নে দেওয়া হলো-
০১) মেহরাব-এ-নববি: হযরত রাসুল (সা.) যে নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে নামাজের ইমামতি করতেন ঐ স্থানটিকে মেহরাব-এ-নববি বলা হয়। এই মেহরাবটি রিয়াজুল জান্নাত-এর মধ্যে এবং ‘উস্তায়ানায়ে আয়েশা/মোহাজেরিন’ নামক স্তম্ভের নিকটে অবস্থিত।
০২) তাহাজ্জুদের মেহরাব:হযরত রাসুল (সা.) হযরত ফাতেমা (রা.)-এর হুজরা শরীফের নিকটে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। উক্ত স্থানটি ‘তাহাজ্জুদের মেহরাব’ নামে পরিচিত। মেহরাব-এ তাহাজ্জুদ মসজিদে নববি-এর পূর্ব দিকে অবস্থিত বাব উন নবি-এর সমান্তরালে এবং হযরত রাসুল (সা.)-এর রওজা মোবারকের পিছনে অবস্থিত। এই মেহরাবটির স্থানে বর্তমানে একটি লাইব্রেরি করা হয়েছে।
বাসস্থান নির্মাণ
মসজিদে নববি-এর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হতে প্রায় ৭ মাস সময় অতিবাহিত হয়। এই ৭ মাস আল্লাহ্র রাসুল (সা.) হযরত আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বাড়িতেই অবস্থান করেন। মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে হযরত রাসুল (সা.)-এর জন্য দুটি কক্ষ নির্মাণ করা হয়। উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরা শরীফ ছিল মসজিদে নববি-এর পূর্ব দরজা বরাবর, যেখানে বর্তমানেহযরত রাসুল (সা.)-এর রওজা মোবারক অবস্থিত।আর উম্মুল মুমিনিন হযরত সাওদা (রা.)-এর হুজরা শরীফ ছিল মসজিদের দক্ষিণ দেওয়ালের দিকে।মসজিদের দেওয়াল ও ছাদের ন্যায় হুজরা শরীফেরদেওয়াল ও ছাদ নির্মাণ করা হয়। উল্লেখ্য যে,মদিনায় হিজরতের ৭ মাস পর হযরত মা সাওদা (রা.) হযরত রাসুল (সা.)-এর তিন কন্যা-সহ হযরত জায়েদ (রা.)-এর সাথে মদিনা শরিফে তশরিফ নেন। আর হযরত মা আয়েশা (রা.) তাঁর ভাই হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.)-এর সাথে মদিনায় আগমন করেন।
রিয়াজুল জান্নাত
হযরত রাসুল (সা.)-এর পবিত্র হুজরা শরীফ বা বর্তমান রওজা মোবারক থেকে তাঁর মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানকে হযরত রাসুল (সা.) বেহেশতের একটি বাগান বলে উল্লেখ করেছেন, যাকে ‘রিয়াজুল জান্নাত’ বলা হয়। এই অংশটি বর্তমানে সবুজ-সাদা রংয়ের গালিচা দ্বারা আচ্ছাদিত। এই সম্পর্কে হযরত রাসুল (সা.)বলেছেন, “আমার ঘর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান জান্নাতের বাগানগুলোর একটি বাগান আর আমার মিম্বর অবস্থিত আমার হাউজে কাউসার-এর উপরে।” (বোখারি শরীফ হাদিস নং ১১৯৬; মুসলিম শরীফ হাদিস নং ১৩৯১) (চলবে)
সৈয়দ এ. এফ. এম. মঞ্জুর-এ-খোদা : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
সম্পাদক: মো: রবিউল হক। প্রকাশক: মো: আশ্রাফ উদ্দিন ।
প্রকাশক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২, টয়েনবি সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে মুদ্রিত
দেলোয়ার কমপ্লেক্স, ২৬ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক (হাটখোলা), ওয়ারী, ঢাকা -১২০৩ থেকে প্রকাশিত ।
মোবাইল: ০১৭৯৮৬৫৫৫৫৫, ০১৭১২৪৬৮৬৫৪
ওয়েবসাইট : dailyjanadarpan.com , ই-পেপার : epaper.dailyjanadarpan.com